আঙ্কারায় শুরু ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলন: নজরে ট্রাম্প ও প্রতিরক্ষা ব্যয়

উচ্চ পর্যায়ের প্রতিরক্ষা ঘোষণার সময় বক্তব্য দিচ্ছেন ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটে
উচ্চ পর্যায়ের প্রতিরক্ষা ঘোষণার সময় বক্তব্য দিচ্ছেন ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটে | ছবি: রয়টার্স
0

তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় মঙ্গলবার ও বুধবার অনুষ্ঠিত হচ্ছে ন্যাটো নেতাদের শীর্ষ সম্মেলন। প্রতিরক্ষা ব্যয় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন করে চাপ প্রয়োগের মধ্যেই এই সম্মেলন শুরু হয়েছে। ইউরোপীয় দেশগুলো এই সম্মেলনে নতুন সামরিক চুক্তির মাধ্যমে শত শত কোটি ডলার ব্যয়ের ঘোষণা দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

গত বছর অনুষ্ঠিত ন্যাটো সম্মেলনে সদস্য দেশগুলো তাদের প্রতিরক্ষা ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করতে সম্মত হয়। এর মধ্যে ২০৩৫ সালের মধ্যে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ সামরিক ব্যয় এবং ১ দশমিক ৫ শতাংশ নিরাপত্তাসংক্রান্ত প্রয়োজনে ব্যয় করার কথা রয়েছে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।

কারা যোগ দিচ্ছেন, কী রয়েছে আলোচনায়?
তুরস্কে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে ন্যাটোর ৩২টি সদস্য দেশের নেতারা অংশ নিচ্ছেন। জোটের বাইরের দুই রাষ্ট্রপ্রধান-ইউক্রেনের ভলোদিমির জেলেনস্কি এবং দক্ষিণ কোরিয়ার লি জায়ে-মিয়ংও সম্মেলনে থাকছেন। অস্ট্রেলিয়া, জাপান ও নিউজিল্যান্ড তাদের প্রতিরক্ষা বা পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের পাঠাচ্ছে। ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যুদ্ধে প্রভাবিত উপসাগরীয় দেশ বাহরাইন, কুয়েত, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতও একইভাবে প্রতিনিধি পাঠাচ্ছে। সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার সম্মেলনে যোগ দেয়ার কথা না থাকলেও আঙ্কারায় ট্রাম্পের সঙ্গে তার দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হবে।

ন্যাটো মিত্রদের কাছে ট্রাম্পের চাওয়া
প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনি প্রচারণা থেকেই ন্যাটোর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ট্রাম্প। তার যুক্তি, যুক্তরাষ্ট্র জোটের ব্যয়ের অন্যায্য অংশ বহন করছে। ওই সময় মাত্র পাঁচটি দেশ প্রতিরক্ষায় জিডিপির ২ শতাংশ ব্যয় করত। যৌথ প্রতিরক্ষা দায়িত্ব নিয়ে ট্রাম্পের এসব প্রশ্ন সাম্প্রতিক বছরগুলোয় জোটের ভেতর কিছু ফল দিয়েছে; সদস্য দেশগুলো তাদের প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

জার্মান মার্শাল ফান্ডের তুরস্কবিষয়ক আঞ্চলিক পরিচালক ওজগুর উনলুহিসারচিকলি মনে করেন, এবারের সম্মেলনে ন্যাটো গত বছরের প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেবে। তিনি বলেন, ‘ন্যাটোর মিত্ররা গত বছর হেগে তাদের প্রতিরক্ষা ব্যয় ৫ শতাংশে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং ইউরোপীয় মিত্ররা তাদের প্রতিরক্ষাশিল্পকে উন্নত করতে পদক্ষেপ নিয়েছে। এবার আঙ্কারায় আলোচনার বিষয় হবে, কীভাবে এই ব্যয়কে সক্ষমতায় রূপান্তর করা যায়। তাই এটি গত বছরের চেয়ে শক্তিশালী।’

তবে ‘গ্লোবাল পলিসি ইনস্টিটিউটের’ প্রেসিডেন্ট পাওলো ভন শিরাখ উল্লেখ করেন, বর্ধিত ব্যয় থেকে সক্ষমতা অর্জনে বহু বছর লাগবে। বেশি অর্ডার মানে বেশি সামরিক সরঞ্জাম—তবে তা পাওয়া যাবে সময়ের সঙ্গে। তার ভাষায়, ‘আপনি অনেক ব্যয় করেও খুব বেশি কিছু নাও পেতে পারেন।’

সম্মেলন থেকে ইউক্রেনের চাওয়া
বুধবার ট্রাম্পের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। ইউক্রেন ন্যাটোর সদস্য নয়। রুশ হামলা তীব্র হয়ে ওঠায় জেলেনস্কি মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকে অতিরিক্ত প্যাট্রিয়ট বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অনুরোধ জানাবেন। সোমবার সকালে রাজধানী কিয়েভে এক ড্রোন হামলায় অন্তত ১১ জন নিহত হয়েছেন।

রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক জ্যাক ওয়াটলিং বলেন, ইউক্রেন জোটের সদস্যদের কাছ থেকে চলমান রাজনৈতিক ও সামরিক-প্রযুক্তিগত সহায়তা চাইছে, যাতে রাশিয়াকে এই বার্তা দেয়া যায় যে ‘এই সহায়তা অব্যাহত থাকবে।’ তার ভাষায়, ‘আগামী ১২ থেকে ২৪ মাসে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা যে কমবে না, তা রাশিয়াকে দেখানোই এর মূল উদ্দেশ্য।’ ওয়াটলিং আরও বলেন, ‘ইউক্রেনকে সরবরাহ করা ইন্টারসেপ্টরের সংখ্যা এবং রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ক্ষয়ক্ষতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।’

ইউরোপীয় দেশগুলো কী অর্জনের চেষ্টা করছে
সম্মেলনে ইউরোপীয় দেশগুলোর ঘোষণা দিতে যাওয়া শত শত কোটি ডলারের চুক্তিকে অনেক বিশ্লেষক ট্রাম্প প্রশাসনকে সন্তুষ্ট করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন। ইউরোপীয় দেশগুলো ইরানের ওপর যুদ্ধে অংশ না নেয়ার পর ট্রাম্প বলেছিলেন, তিনি তাদের অর্থ চান না, শুধু ‘আনুগত্য’ চান। তিনি আরও বলেছিলেন, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান স্বাগতিক না হলে হয়তো তিনি সম্মেলনেই যেতেন না। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় তুরস্ক শুধু প্রতিরক্ষা ব্যয়ই বাড়ায়নি, একই সঙ্গে ন্যাটোর অন্যতম বৃহৎ সামরিক রপ্তানিকারকেও পরিণত হয়েছে।

আপাতত প্রতিরক্ষা ব্যয় নিয়ে আলোচনার সুর তীক্ষ্ণই রয়েছে। সম্মেলনের প্রাক্কালে ট্রাম্প জার্মানির প্রতিরক্ষা ব্যয়কে ‘হাস্যকর’ বলে অভিহিত করেছেন। জবাবে চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস তার দেশের বাজেটের পক্ষে বলেছেন, ‘এটি আমাদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা শক্তিশালী করার জন্য এযাবৎ কালের সবচেয়ে বড় প্রচেষ্টা।’ এদিকে বাগ্‌যুদ্ধের এক ধাপ এগিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটো দেশগুলো থেকে ধাপে ধাপে যুদ্ধবিমান, ডেস্ট্রয়ার ও সাবমেরিন প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে।

ওয়াটলিং বলেন, ‘ইউরোপ থেকে কম মার্কিন পদাতিক বা সাঁজোয়া বাহিনী প্রত্যাহারের বার্তাগত প্রভাব থাকলেও অন্য কিছুতে সেটার প্রভাব সামান্য।’ তবে তিনি যোগ করেন, ‘মার্কিন বিমানশক্তি প্রত্যাহারের প্রভাব অনেক বেশি বাস্তবিক।’ বাগ্‌যুদ্ধ ও প্রত্যাহারের মধ্যেও জোট ঐক্যের ছবি তুলে ধরতে পারবে কি না—এটিই এখন মূল প্রশ্ন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

গ্লোবাল পলিসি ইনস্টিটিউটের ভন শিরাখ বলেন, ‘এই সম্মেলনের মূল মূল্য রাজনৈতিক। এটি দেখাচ্ছে যে মিত্ররা এখনো কথা বলছে, বৈঠক করছে এবং ঐক্যের ছবি তুলে ধরার চেষ্টা করছে—যদিও ভেতরের মতপার্থক্য ও সংশয় দূর হয়নি।’ তার মতে, ‘আঙ্কারা মূলত আশ্বাস ও ইঙ্গিত দেয়ার সম্মেলন; মাঠপর্যায়ে তাৎক্ষণিক কোনো বড় পরিবর্তনের সম্মেলন নয়।’

এএম