হেফাজতে যুবকের মৃত্যু: পুলিশ বলছে ‘স্ট্রোক’, পরিবারের দাবি ‘নির্যাতন’

নিহত যুবক
নিহত যুবক | ছবি: এখন টিভি
0

ফরিদপুরে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হেফাজতে থাকা অবস্থায় মির্জা ইশতিয়াক আহমেদ প্রান্ত (২৪) নামে এক যুবকের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। আজ (রোববার, ২২ জুন) ভোর সাড়ে ৫টার দিকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। পুলিশের দাবি, ওই যুবক উচ্চ রক্তচাপ ও স্ট্রোকজনিত কারণে মারা গেছেন। তবে নিহতের পরিবারের অভিযোগ, ডিবি পুলিশ আটক করার সময় এবং হেফাজতে নিয়ে বেধড়ক নির্যাতন করায় তার মৃত্যু হয়েছে।

মারা যাওয়া মির্জা ইশতিয়াক আহমেদ প্রান্ত ফরিদপুর আইন মহাবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং মধুখালী পৌরসভার গোন্দারদিয়া এলাকার মৃত মির্জা এসকেন্দারের পুত্র। সম্প্রতি বাবার মৃত্যুর পর তিনি মধুখালী চিনিকলে চাকরি করে মা ও চার মাসের ছোট ভাইকে নিয়ে সংসার চালিয়ে আসছিলেন।

জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) জানায়, গতকাল (শনিবার, ২১ জুন) সন্ধ্যায় গোন্দারদিয়া গ্রাম থেকে ১০০ গ্রাম গাঁজাসহ প্রান্তকে আটক করে ডিবির একটি টিম। প্রথমে তাকে মধুখালী থানায় নেয়া হয়। পরে মাদক-সংক্রান্ত আরও অভিযান শেষ করে ভোর ৪টার দিকে প্রান্তসহ চারজন আসামিকে ফরিদপুর ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে আসা হয়।

জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আলমগীর হোসেন নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেন, প্রান্ত শ্বাসকষ্টজনিত কারণে এবং ব্রেইন স্ট্রোক করে মারা গেছেন। তিনি বলেন, ‘ভোর ৪টায় তাকে অন্য আসামিদের সঙ্গে ডিবির কক্ষে রাখা হয়। কক্ষটিতে বৈদ্যুতিক পাখার ব্যবস্থা ছিলো। ছেলেটি সেখানে ফজরের নামাজও আদায় করে। এরপর ও নিজেই অন্যদের জানায়, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। তাৎক্ষণিক তাকে ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতালে এবং পরে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।’

ফরিদপুরের পুলিশ সুপার মো. নজরুল ইসলাম জানান, প্রাথমিকভাবে জানা গেছে উচ্চ রক্তচাপ ও স্ট্রোকজনিত কারণে তার মৃত্যু হয়েছে এবং প্রান্তর শরীরে আঘাতের কোনো চিহ্ন নেই। এছাড়া তার বিরুদ্ধে মাদক আইনে দুটি মামলা রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

অন্যদিকে প্রান্তর পরিবার ও স্বজনদের দাবি, তিনি মাদকের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না এবং তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে।

নিহতের চাচি নাসরিন জামান সাংবাদিকদের বলেন, ‘গতকাল বিকালে মিল থেকে এসে ও রাস্তায় দাঁড়িয়েছিল। তখনই ডিবি পরিচয়ে কয়েকজন এসে তাকে মারধর করতে থাকে। ঘরের ভেতরে এনেও মারে, কিন্তু ওর কাছে কিছুই পায়নি। একপর্যায়ে তারা বলে, ও রাজনীতি করে, নিয়ে চল। এরপর সকালে আমাদের ফোন করে জানায় ও মেডিকেলে আছে। আমাদের লোকজন গিয়ে দেখে ও মারা গেছে।’

আরও পড়ুন:

নিহতের মা মির্জা খাদিজা আক্তার নিপা অভিযোগ করে বলেন, ‘প্রান্তকে আমার সামনে থেকেই বেধড়ক মারপিট করতে করতে নিয়ে যায়। আমার ছেলেকে নির্যাতন করেই হত্যা করা হয়েছে।’ তিনি এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচার দাবি করেছেন।

ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রান্তর রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি তামজিদুল রশিদ চৌধুরী রিয়ান ফেসবুকে প্রান্তর সঙ্গে একটি ছবি পোস্ট করে তাকে ‘মধুখালি উপজেলা ছাত্রলীগ নেতা’ দাবি করেছেন এবং ঘটনার সঠিক তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। এছাড়া কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের বিভিন্ন নেতারাও ফেসবুকে তাকে নিজেদের কর্মী বলে প্রচার করছেন।

তবে নিহতের পরিবার ও স্বজনরা জানিয়েছেন, প্রান্ত অতীতে সংগঠনটির কার্যক্রমে জড়িত থাকলেও, বর্তমানে তার কোনো দলীয় পদ ছিল না।

পুলিশ সুপার মো. নজরুল ইসলাম জানিয়েছেন, নিহত যুবক কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মী কি না, সেই বিষয়টিও পুলিশের পক্ষ থেকে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে।

এসএইচ