আগামীকাল (শুক্রবার, ১৯ জুন) সুইজারল্যান্ডে শুরু হতে যাওয়া ৬০ দিনের বিস্তৃত আলোচনা পর্বের পথ সুগম করেছে এই চুক্তি। রয়টার্সের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
‘ইসলামাবাদ মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং বিটুইন দ্য ইউনাইটেড স্টেটস অব আমেরিকা অ্যান্ড দ্য ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান’ (যুক্তরাষ্ট্র ও ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের মধ্যে ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক) শিরোনামের পূর্ণাঙ্গ দলিলের বিবরণ নিচে দেয়া হলো:
১. এই সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষরের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান ও বর্তমান যুদ্ধে তাদের মিত্ররা লেবাননসহ সব ফ্রন্টে অবিলম্বে ও স্থায়ীভাবে সামরিক অভিযান বন্ধের ঘোষণা দিচ্ছে। এখন থেকে একে অপরের বিরুদ্ধে কোনো যুদ্ধ বা সামরিক অভিযান শুরু না করার, হুমকি দেয়া বা বলপ্রয়োগ থেকে বিরত থাকার এবং লেবাননের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে তারা। লেবাননসহ সব ফ্রন্টে স্থায়ীভাবে যুদ্ধ বন্ধ এবং এই অনুচ্ছেদের অন্যান্য শর্ত চূড়ান্ত চুক্তিতে নিশ্চিত করা হবে।
২. যুক্তরাষ্ট্র ও ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান একে অপরের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি শ্রদ্ধা দেখানোর এবং একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে।
৩. যুক্তরাষ্ট্র ও ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান আলোচনা চালিয়ে যেতে এবং সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, যা পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে বাড়ানো যেতে পারে।
৪. এই সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষরের পরপরই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে তাদের নৌ অবরোধ এবং যেকোনো ধরনের ব্যাঘাত বা বাধা অপসারণ শুরু করবে এবং ৩০ দিনের মধ্যে সম্পূর্ণভাবে নৌ অবরোধ তুলে নেবে। এই সময়ের মধ্যে ইরান যুদ্ধপূর্ব অবস্থার আনুপাতিক হারে নৌযান চলাচল স্বাভাবিক করবে। এছাড়া চূড়ান্ত চুক্তির ৩০ দিনের মধ্যে ইরানের আশপাশ থেকে নিজেদের বাহিনী সরিয়ে নেয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।
৫. সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষরের পর ইরান পারস্য উপসাগর থেকে ওমান সাগর এবং বিপরীত দিকে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপদ চলাচলের জন্য বিনা মাশুলে কেবল ৬০ দিনের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা দিয়ে ব্যবস্থা নেবে। বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচল অবিলম্বে শুরু হবে। কারিগরি ও সামরিক বাধা এবং ইরানের মাইন অপসারণের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করে তা ৩০ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হবে। আন্তর্জাতিক আইন এবং হরমুজ প্রণালির উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌম অধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পারস্য উপসাগরের অন্যান্য উপকূলীয় রাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ প্রশাসন ও সামুদ্রিক সেবার রূপরেখা নির্ধারণে ওমানের সঙ্গে আলোচনা করবে ইরান।
৬. ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অন্তত ৩০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি সুনির্দিষ্ট ও পারস্পরিকভাবে সম্মত পরিকল্পনা তৈরি করতে আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হিসেবে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হবে। প্রাসঙ্গিক আর্থিক লেনদেনের জন্য প্রয়োজনীয় সব লাইসেন্স, ছাড় এবং অনুমতি যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দেয়া হবে।
৭. চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হিসেবে সম্মত হওয়া সময়সূচি অনুযায়ী, ইরানের বিরুদ্ধে সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এর মধ্যে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব, আইএএইএ (IAEA) বোর্ড অব গভর্নরসের প্রস্তাব এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক সব একতরফা নিষেধাজ্ঞা অন্তর্ভুক্ত থাকবে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র উপর্যুক্ত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়টির চরম গুরুত্ব স্বীকার করে এবং পারস্পরিক ঐকমত্য অর্জনে আলোচনায় অবিলম্বে এসব বিষয় সমাধানের ইচ্ছা প্রকাশ করছে।
৮. ইরান পুনরায় নিশ্চিত করছে যে তারা পারমাণবিক অস্ত্র সংগ্রহ বা তৈরি করবে না। যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান মজুত করা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বিষয়ে পারস্পরিক সম্মত প্রক্রিয়ায় সমাধানের বিষয়ে একমত হয়েছে। ৭ নম্বর অনুচ্ছেদে উল্লিখিত সময়সূচি অনুযায়ী, আইএইএ-এর তত্ত্বাবধানে সংশ্লিষ্ট স্থানে ‘ডাউনব্লেন্ডিং’-এর মাধ্যমে এটি করা হবে। চূড়ান্ত চুক্তিতে একটি সন্তোষজনক কাঠামোর ভিত্তিতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ এবং ইরানের পারমাণবিক চাহিদা সম্পর্কিত অন্যান্য পারস্পরিক সম্মত বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করতেও উভয় পক্ষ রাজি হয়েছে। চূড়ান্ত চুক্তিতে এই অনুচ্ছেদের শর্তগুলো নিশ্চিত করা হবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান এসব পারমাণবিক বিষয়ের চরম গুরুত্ব স্বীকার করে এবং পারস্পরিক ঐকমত্য অর্জনে আলোচনায় অবিলম্বে এসব বিষয় সমাধানের ইচ্ছা প্রকাশ করছে।
৯. চূড়ান্ত চুক্তির আগপর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান বর্তমান অবস্থা বজায় রাখতে সম্মত হয়েছে। ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির বর্তমান অবস্থা বজায় রাখবে এবং যুক্তরাষ্ট্র নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে না বা এই অঞ্চলে অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন করবে না।
১০. যুক্তরাষ্ট্র প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে যে, এই সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষরের পরপরই এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত, মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ ইরানের অপরিশোধিত তেল, পেট্রোলিয়াম পণ্য ও ডেরিভেটিভস এবং এর সঙ্গে যুক্ত ব্যাংকিং লেনদেন, বিমা, পরিবহনসহ সব আনুষঙ্গিক পরিষেবা রপ্তানির ক্ষেত্রে ছাড় দেবে।
১১. ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের জব্দ করা বা সীমিত করা তহবিল ও সম্পদ ব্যবহারের জন্য সম্পূর্ণভাবে উন্মুক্ত করে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এই সমঝোতা স্মারক বাস্তবায়নের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান আলোচনার সময় এসব তহবিল ছাড়ের পদ্ধতির বিষয়ে পারস্পরিকভাবে সম্মত হবে। মূল হিসাবে রাখা হোক বা স্থানান্তর করা হোক, এ ধরনের তহবিল ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক নির্ধারিত যেকোনো চূড়ান্ত সুবিধাভোগীকে পরিশোধের জন্য পুরোপুরি ব্যবহারযোগ্য করে দেয়া হবে। যুক্তরাষ্ট্র সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সব লাইসেন্স এবং অনুমোদন দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে।
১২. এই সমঝোতা স্মারকের সফল বাস্তবায়ন এবং চূড়ান্ত চুক্তির ভবিষ্যৎ শর্ত পালন পর্যবেক্ষণের জন্য একটি নির্বাহী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সম্মত হয়েছে।
১৩. এই সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষরের পর এবং এর ১, ৪, ৫, ১০ ও ১১ নম্বর অনুচ্ছেদের বাস্তবায়ন শুরু হওয়া সাপেক্ষে এবং এসব পদক্ষেপের অব্যাহত বাস্তবায়নের ভিত্তিতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একান্তভাবে অন্যান্য অনুচ্ছেদের ওপর চূড়ান্ত চুক্তির বিষয়ে আলোচনা শুরু করবে।
১৪. চূড়ান্ত চুক্তিটি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের একটি বাধ্যতামূলক প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদিত হবে।





