শীর্ষ ইরানি কর্মকর্তারা এই চুক্তিকে বিজয়ের প্রতীক হিসেবে বর্ণনা করছেন। পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, ইরান ‘চূড়ান্ত বিজয়ের দিকে একটি বড় পদক্ষেপ’ নিয়েছে। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এই সমঝোতাকে ‘পরিবর্তনশীল’ বলে আখ্যা দিয়েছেন এবং দাবি করেছেন, এটি মধ্যপ্রাচ্য ও ইরানে ‘একটি ভিন্ন বিশ্ব’ তৈরি করতে পারে। গালিবাফের এই সমর্থন প্রমাণ করে যে, চুক্তিটি ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এবং শক্তিশালী কট্টরপন্থি গোষ্ঠীগুলোর অনুমোদন পেয়েছে।
সরকার এই চুক্তিকে বিজয় বলার প্রধান যুক্তি হিসেবে দেখাচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল তাদের মূল লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। তারা ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে পারেনি, সরকার পতন ঘটাতে পারেনি, পরমাণু কর্মসূচি ধ্বংস করতে পারেনি এবং হিজবুল্লাহর সঙ্গে ইরানের সম্পর্কও ছিন্ন করতে পারেনি। উল্টো ইরান এখন আলোচনার টেবিলে বসে লেবাননকে চুক্তির আওতায় এনেছে এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দর-কষাকষি করছে।
তবে দেশের ভেতরেই এই সরকারি বয়ান প্রশ্নের মুখে পড়েছে। একজন কট্টরপন্থি পার্লামেন্ট সদস্য এই খসড়া চুক্তিকে ‘ইরানকে মার্কিন উপনিবেশে পরিণত করার দলিল’ বলে তীব্র সমালোচনা করেছেন। তার অভিযোগ, হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখার বিষয়ে সর্বোচ্চ নেতার নির্দেশ অমান্য করেছেন আলোচকরা। এই সমালোচনা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি খোদ জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির ভেতর থেকে এসেছে। কট্টরপন্থিরা মনে করেন, ট্রাম্প প্রশাসন আলোচনাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়েছিল, তাই তাদের বিশ্বাস করা ঠিক হবে না।
তবুও এই মুহূর্তে ইরানি সরকারের কাছে চুক্তি করা ছাড়া খুব বেশি বিকল্প নেই। যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা, জাহাজ চলাচলে বাধা এবং প্রচণ্ড মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষ ও অর্থনীতি চরম বিপর্যস্ত। অনেক পরিবারের কাছে এই চুক্তি ‘বিজয়’ কি না তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো, এটি তাদের নিত্যপণ্যের দাম কমাবে কি না এবং নতুন যুদ্ধের ভয় দূর করবে কি না। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছেন, ইরান তাদের প্রতিশ্রুতি পালন করলে শত শত কোটি ডলারের আটকে থাকা সম্পদ ব্যবহারের সুযোগ পাবে।
আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে এই চুক্তি সই হওয়ার কথা রয়েছে। তবে এর সবচেয়ে জটিল বিষয়গুলো—যেমন সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ, হরমুজ প্রণালি এবং লেবানন ইস্যু—এখনো অমীমাংসিত। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহু সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে তারা লেবানন থেকে সেনা সরাবেন না। অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরাইলের এই আগ্রাসী নীতির কড়া সমালোচনা করেছেন। এই টানাপোড়েনকে ইরান তাদের পক্ষে কাজে লাগানোর চেষ্টা করলেও চুক্তির ভবিষ্যৎ এখনো খুবই ভঙ্গুর।
বিবিসি ফার্সির পাঠকদের প্রতিক্রিয়া থেকেও ইরানি সমাজের বিভক্তি স্পষ্ট। কেউ বলছেন, তারা এই চুক্তিকে সাময়িক স্বস্তি হিসেবে দেখছেন। আবার সরকারবিরোধীদের অনেকেই বলছেন, এই যুদ্ধ শুধু সাধারণ মানুষের ভোগান্তিই বাড়িয়েছে, সরকারের কোনো পরিবর্তন আনেনি। মূলত, ইরান সরকার এই চুক্তিকে ‘বিজয়’ হিসেবে বিক্রি করার চেষ্টা করছে কারণ তারা সরাসরি একে নিজেদের ‘বাধ্যবাধকতা’ বা ‘অসহায়ত্ব’ হিসেবে স্বীকার করতে রাজি নয়।





