রাজস্ব আদায়ের ঘাটতি, বাজেটের বাড়তি চাপ; লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারবে এনবিআর?

জাতীয় রাজস্ব ভবন
জাতীয় রাজস্ব ভবন | ছবি: বাসস
0

চলতি অর্থবছরের শেষভাগে এসেও রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা থেকে ১ লাখ কোটি টাকার বেশি পিছিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। লক্ষ্যমাত্রায় বিশাল ঘাটতির মধ্যই প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাজেট অনুযায়ী এনবিআরকে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা যোগান দিতে হবে। এদিকে দেশে দিনদিন কোটিপতির সংখ্যা বাড়লেও সে হিসেবে বাড়ছে না কর-জিডিপি অনুপাত। করজাল থাকার পরও রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা কি তবে কেবলই কাল্পনিক?

দেশের অর্থনীতির জন্য বড় সতর্ক সংকেত হিসেবে ঘুরপাক খাচ্ছে ২ অংকের মূল্যস্ফীতি। এরই মধ্য প্রতি বছরই বাড়ছে বাজেটের আকার। সেইসাথে রাজস্ব আদায়ের বিপুল ঘাটতি। এমন বাস্তবতায় রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছুতে না পারা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড- এনবিআরের ওপর কর আদায়ের গুরু দায়িত্ব।

যদিও বিগত বছরগুলোর হিসেব-নিকেশে বারবার ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। কোনো অর্থবছরই রাজস্ব আদায়ের মূল লক্ষ্যমাত্রা শতভাগ পূরণ করতে পারেনি সংস্থাটি। চলতি অর্থবছরের শেষপথে এসে ৩ লাখ কোটি টাকার কিছু বেশি অর্থ আদায় হলেও ঘাটতি ১ লাখ কোটি টাকার বেশি।

প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার মধ্যে এনবিআরকে ৮৭ শতাংশ অর্থ যোগান দিতে হবে। এজন্য করজাল সম্প্রসারণের পাশাপাশি বেশকিছু পরিবর্তন আনছে সরকার। কিন্তু রাজস্ব খাতে সংস্কার আর অটোমেশন ছাড়া এই লক্ষ্য বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব?

অর্থনীতিবিদ মামুন রশীদ বলেন, ‘৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা আদায় করতে গেলে হয় একদিকে খুবই নিষ্ঠুর হতে হবে, অথবা চরম ভালো সংস্কার নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। এ সংস্কার যদি করে তবুও হয়তো এ পরিমাণ অর্থ আদায় হবে না, কিন্তু কাছাকাছি চলে যেতে পারে।’

করহার ও কর নীতির যৌক্তিকীকরণ এবং রাজস্ব খাতে সংস্কার না হলে বিশাল লক্ষ্য অর্জন অধরাই থেকে যাবে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, লক্ষ্যমাত্রা কাল্পনিক নয়, বরং দেশের অর্থনীতির আকার অনুযায়ী এটি যৌক্তিক।

আরও পড়ুন:

সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘বিভিন্ন রকম পেশাজীবী গোষ্ঠী রয়েছে এনবিআরের অধীনে, যারা কর ফাঁকি দেন, কর এড়িয়ে যান। এটা হচ্ছে কারণ, এই পেশাজীবী গোষ্ঠী যে ট্যাক্স ফাইলটি জমা দিচ্ছেন, এটি আসলে মিথ্যা তথ্য দিয়ে পূর্ণ। এনবিআরের ভেতরে যারা রয়েছেন, যারা ফিল্ড লেভেলে কাজ করেন, তারা নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থে এই ডিজিটালাইজেশন চান না।’

দেশে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে কর ফাঁকি বা কর জালের অভাব নেই। দিনদিন কোটিপতির সংখ্যা বাড়লেও কর-জিডিপির অনুপাত এখনো দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন পর্যায়ে। সাধারণ মানুষকে ভ্যাট-ট্যাক্সের আওতায় আনা গেলেও অনেক কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান প্রকৃত কর দেয়া থেকে দূরে থেকে যাচ্ছে। এতে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের লিয়াজোঁ কতটুকু দায়ী ? রাজস্ব লক্ষ্য অর্জন না হলে অর্থের যোগানে টান পড়ার পাশাপাশি ব্যয় সামলাতে হিমসিম খাবে সরকার। নির্ভরতা বাড়বে ঋণের ওপর।

কর বিশেষজ্ঞ স্নেহাশীষ বড়ুয়া বলেন, ‘রেটের দিক থেকে কোনো গঠনগত সংস্কার পাইনি, ন্যূনতম কর ছাড়া। যদি গঠনগত বা পলিসির দিক থেকে বা অপারশনাল কাজে যদি কোনো পরিবর্তন না হয়, তাহলে এক্ষেতে শুধু মাঠপর্যায়ে তদারকি করে ২ লাখ কোটি অতিরিক্ত আহরণ করা, এটা অবশ্যই একটি চ্যালেঞ্জ।’

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এনবিআরের কার্যক্রমকে সম্পূর্ণ আধুনিকায়ন এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা না গেলে বিগত সময়ের মতো ২০২৬-২৭ অর্থবছরেও রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি মেনে নিতে হবে। এতে সাধারণ জনগণের কাঁধে চেপে বসবে পরোক্ষ করের বাড়তি বোঝা।

অর্থনীতি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এনবিআর কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থ থেকে বেরিয়ে আসা এবং করজালের যথাযথ বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরকারের বেঁধে দেয়া রাজস্ব আয়ের বড় লক্ষ্যে পৌঁছানো অসম্ভব কিছু নয়।

এসএইচ