যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক জলসীমায় মার্কিন ড্রোন ভূপাতিত করাসহ ইরানের ‘আগ্রাসী পদক্ষেপের’ জবাবে তারা এই ‘আত্মরক্ষামূলক’ হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, দক্ষিণ ইরানে হামলার জন্য ব্যবহৃত যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে তারা এই পাল্টা আঘাত হেনেছে।
এদিকে কুয়েত জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘শত্রুভাবাপন্ন’ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের মোকাবিলা করেছে। কুয়েতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পরে এক বিবৃতিতে ইরানের ‘বর্বর ও ধারাবাহিক’ হামলার তীব্র নিন্দা জানায়।
আজ (সোমবার, ১ জুন) সকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে সমালোচকদের ‘আরাম করে বসার’ পরামর্শ দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত সব ঠিক হয়ে যাবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ইরান সত্যিই একটি চুক্তি করতে চায় এবং এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ভালো একটি চুক্তি হবে।’
কয়েক মাস ধরে চলা যুদ্ধ বন্ধের চুক্তিতে পৌঁছানোর আলোচনা সপ্তাহান্তে কোনো অগ্রগতি ছাড়াই শেষ হওয়ার পরই এই পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটলো। মার্কিন গণমাধ্যম জানিয়েছে, ট্রাম্প ওই চুক্তির শর্তে কিছু পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছেন। মার্কিন সম্প্রচারমাধ্যম সিবিএস নিউজ জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের পথ এবং উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম অপসারণের বিষয়ে এই পরিবর্তনের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। তবে এ বিষয়ে হোয়াইট হাউস কোনো মন্তব্য করেনি।
আজ (সোমবার, ১ জুন) ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানান, যুক্তরাষ্ট্র ‘ক্রমাগত তাদের মত বদলাচ্ছে এবং নতুন বা সাংঘর্ষিক দাবি তুলছে’, যার ফলে স্বাভাবিকভাবেই ‘আলোচনা দীর্ঘায়িত হবে’। এর আগে রোববার ইরানের প্রধান আলোচক বলেছিলেন, ইরানিদের অধিকার পুরোপুরি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তেহরান কোনো চুক্তিতে রাজি হবে না।
আরও পড়ুন:
মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, শনি ও রোববার তারা ইরানের দক্ষিণ উপকূলের গোরুক শহর এবং হরমুজ প্রণালির কেশম দ্বীপে ‘ইরানি রাডার এবং ড্রোন কমান্ড ও কন্ট্রোল স্থাপনায় আত্মরক্ষামূলক হামলা’ চালিয়েছে। এক্সে (সাবেক টুইটার) দেয়া এক পোস্টে সেন্টকম জানায়, মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলো ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, একটি গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশন ও দুটি ড্রোন ধ্বংস করেছে, যা ‘আঞ্চলিক জলসীমায় চলাচলকারী জাহাজের জন্য স্পষ্ট হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিল’। এতে কোনো মার্কিন সেনা হতাহত হননি বলে জানানো হয়।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেন, ‘এই হামলা যুদ্ধবিরতির স্পষ্ট লঙ্ঘন।’ অন্যদিকে আইআরজিসি জানিয়েছে, উপসাগরীয় অঞ্চলের সিরিক দ্বীপে একটি টেলিযোগাযোগ টাওয়ারে হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্র যে ঘাঁটি ব্যবহার করেছিল, তারা সেখানে আঘাত হেনেছে। সিরিক দ্বীপটি ইরানের দক্ষিণ উপকূল থেকে প্রায় ৬৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। ইরানের আধা সরকারি সংবাদমাধ্যম ফারস নিউজের বরাতে আইআরজিসি জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি ‘আগ্রাসনের পুনরাবৃত্তি’ করে, তবে ইরানের জবাব হবে ‘সম্পূর্ণ ভিন্ন’।
সোমবার ভোরে কুয়েতের সামরিক বাহিনী জানায়, তারা ‘শত্রুদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা মোকাবিলা করছে’। দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম কুনা জানায়, ওই সময় কুয়েতজুড়ে সতর্কতামূলক সাইরেন বেজে ওঠে। পরে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে কুয়েতের ওপর সরাসরি আঘাত ও বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরির জন্য ইরানের ‘বর্বর ও ধারাবাহিক হামলার কঠোরতম ভাষায়’ নিন্দা জানায়। বিবৃতিতে বলা হয়, এ ধরনের হামলা অঞ্চলে উত্তেজনা কমানোর চেষ্টাকে ‘বাধাগ্রস্ত করে’। আত্মরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় যেকোনো ব্যবস্থা নেয়ার অধিকার কুয়েতের রয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়।
এর আগে গত সপ্তাহেও যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলার জবাবে কুয়েতের একটি বিমানঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছিল তেহরান। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি ছিল, ইরানি নৌযান ও ক্ষেপণাস্ত্র যেন জাহাজ চলাচলের পথে মাইন বিছাতে না পারে, সেটি ঠেকাতেই তারা ওই হামলা চালিয়েছিল।
গত ৮ এপ্রিল থেকে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও ট্রাম্প বারবার ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি স্থায়ী চুক্তির কাছাকাছি রয়েছে এবং আলোচনা এগোচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি হয়নি।
আরও পড়ুন:
যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর রূপরেখা নিয়ে একটি ‘চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত’ নিতে ট্রাম্প ও তার শীর্ষ সহযোগীরা গত শুক্রবার বৈঠকে বসেন। তবে পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে কোনো স্পষ্ট সিদ্ধান্তে না পৌঁছাতেই বৈঠকটি শেষ হয়। পরে জানা যায়, প্রেসিডেন্ট চুক্তির খসড়ায় কিছু পরিবর্তন চেয়েছেন।
সিবিএস নিউজ জানিয়েছে, নতুন শর্তের মধ্যে রয়েছে ৬০ দিনের জন্য সহিংসতা বন্ধ রাখা এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দেয়ার আহ্বান। বৈশ্বিক তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে পরিবহন করা হয় এবং এটি বন্ধ থাকায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু হু করে বাড়ছে।
খবরে বলা হয়েছে, এই চুক্তিতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরুর একটি রূপরেখাও রয়েছে, যদিও তেহরান দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে যে তাদের এই কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ। তবে সোমবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই পারমাণবিক ইস্যুটি চুক্তির আলোচনায় থাকার কথা অস্বীকার করেছেন। সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘পারমাণবিক ফাইলের বিস্তারিত বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। এই মুহূর্তে যুদ্ধ বন্ধ করাই আমাদের অগ্রাধিকার।’
তিনি আরও বলেন, ‘যেকোনো চুক্তির জন্য লেবাননে যুদ্ধ বন্ধ হওয়াটা একটি ‘‘অপরিহার্য শর্ত’’ এবং ওয়াশিংটন ও তেহরান এখনো কোনো ‘চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে’ পৌঁছাতে পারেনি।’
সোমবার এক্সে দেয়া এক পোস্টে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিও একই কথার প্রতিধ্বনি করে লেখেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি বলতে লেবাননসহ সব রণাঙ্গনে যুদ্ধবিরতিকেই বোঝায়।’ তিনি আরও বলেন, ‘যেকোনো শর্ত লঙ্ঘনের পরিণতির জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলই দায়ী থাকবে।’
গত ২ মার্চ যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে লেবানন। ইসরাইলি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর প্রতিশোধ হিসেবে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ ইসরাইলে রকেট হামলা চালায়। এর জবাবে লেবাননজুড়ে বিমান হামলা ও স্থল অভিযান শুরু করে ইসরাইল।




