কংগ্রেস-বামফ্রন্ট-তৃণমূল পশ্চিমবঙ্গের বর্ণময় রাজনৈতিক ইতিহাসের তিন তুরুপের তাস। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর থেকে পশ্চিম বাংলার রাজনীতিতে পালাক্রমে সর্বেসর্বা হয়ে ওঠে এই তিন রাজনৈতিক দল। স্বাধীনতার পর প্রথম ৬৪ বছরে প্রথমে কংগ্রেস আর পরে বামফ্রন্টের জয়জয়কার দেখা গেলেও, গেল ১৫ বছর পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতার ভরকেন্দ্রে তৃণমূল কংগ্রেস।
১৯৪৭ সাল থেকে ক্ষমতার পালাবদলে মোট ৮ জন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। স্বাধীনতার পর পশ্চিমবঙ্গের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হন প্রফুল্ল চন্দ্র সেন। এছাড়াও, রেকর্ড ২৩ বছর ১৩৭ দিন এ দায়িত্ব সামলেছেন সিপিআইএমের জ্যোতি বসু। আর পশ্চিমবঙ্গের প্রথম মহিলা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
১৯৪৭ থেকে ১৯৭৭কে বলা হয় কংগ্রেস জমানা। স্বাধীনতার পর প্রথম কয়েক দশক পশ্চিমবঙ্গ ছিলো জাতীয় কংগ্রেসের শক্ত ঘাঁটি। বিধানচন্দ্র রায়ের হাত ধরে আধুনিক পশ্চিমবঙ্গের শিল্প ও পরিকাঠামোর ভিত্তি স্থাপিত হয়। ১৯৬৭ সালের চতুর্থ সাধারণ নির্বাচনে কংগ্রেস একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালে বিরোধীরা মিলে জোট সরকার গঠন করে। এটিই ছিলো পশ্চিমবঙ্গের প্রথম অ-কংগ্রেস সরকার যা যুক্তফ্রন্ট নামেও পরিচিত।
প্রফুল্ল চন্দ্র সেন ও অজয় মুখোপাধ্যায় এই সময়ে পশ্চিমবঙ্গের নেতৃত্বে ছিলেন। তবে ষাটের দশকের শেষভাগে খাদ্য আন্দোলন এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার ফলে কংগ্রেসের আধিপত্য কমতে শুরু করে।
১৯৭৭ সালে জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে ক্ষমতায় আসে বামফ্রন্ট, এবং তারা ক্ষমতায় ছিলো প্রায় ৩৪ বছর। যা বিশ্বের সংসদীয় ইতিহাসে অন্যতম দীর্ঘতম শাসনকাল। পঞ্চায়েত ব্যবস্থার মাধ্যমে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং ‘অপারেশন বর্গার’ মাধ্যমে ভূমি সংস্কার ছিলো বাম আমলের সবথেকে বড় সাফল্য। ২০০০-এর দশকের শেষ দিকে সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামে শিল্পায়নের জন্য জমি অধিগ্রহণ নিয়ে বিরোধ শুরু হয়। এর ফলে বাম শাসনের জনভিত্তি টালমাটাল হয়ে পড়ে।
আরও পড়ুন:
২০১১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘ বাম শাসনের অবসান ঘটে। লাইম লাইটে আসে তৃণমূল কংগ্রেস। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মূলত তার রাজনৈতিক জীবন শুরু করেছিলেন কংগ্রেস থেকে। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন শাসকদল সিপিআইএমের বিরুদ্ধে কংগ্রেসের নরম মনোভাবের বিপক্ষে ছিলেন মমতা। এরজেরে, ১৯৯৮ এর ১ জানুয়ারি, কংগ্রেস ত্যাগ করে নিজের নতুন দল তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করেন তিনি।
তৃণমূল গঠনের পর রাজ্যে বামফ্রন্টকে ক্ষমতাচ্যুত করতে তিনি বিজেপির নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স বা এনডিএ-তে যোগ দেন। ১৯৯৯ সালে বাজপেয়ী সরকারে রেলমন্ত্রী হন মমতা। ২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে তিনি স্থায়ীভাবে বিজেপির সঙ্গ ত্যাগ করেন এবং কংগ্রেসের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে ২০১১ সালে ঐতিহাসিক জয় হাসিল করেন।
২০১১ সালের ২০ মে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটে এবং তৃণমূল কংগ্রেসের যাত্রা শুরু হয়। মা-মাটি-মানুষ স্লোগান এবং প্রান্তিক মানুষের জন্য তৈরি বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প নিয়ে রাজনীতি শুরু করে মমতার দল।
৩ বছরের শাসনামলে কন্যাশ্রী, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, সবুজ সাথী এবং স্বাস্থ্যসাথীর মতো প্রকল্পগুলো গ্রামীণ ও পিছিয়ে পড়া মানুষের কাছে তৃণমূলের ভিত শক্ত করেছে। বিশেষ করে নারী ভোটারদের মধ্যে মমতার জনপ্রিয়তা এই শাসনের অন্যতম প্রধান শক্তি।
তবে সারদা, রোজ ভ্যালির মতো চিটফান্ড মামলা, সাম্প্রতিককালে নিয়োগ দুর্নীতি বা সন্দেশখালির মতো ঘটনা মমতা প্রশাসনের ভাবমূর্তিকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। বিরোধী দল হিসেবে বিজেপির উত্থান এই জমানায় পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণও তৈরি করেছে।




