আরব আমিরাতের ওপেক ছাড়ার সময়টা বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। তবে ইরান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের চলমান যুদ্ধই এই সিদ্ধান্তের প্রধান কারণ নয়। আমিরাতের দেয়া আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ উল্লেখ না থাকায় প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে জল্পনাকল্পনা চলছে। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘এই সিদ্ধান্ত সংযুক্ত আরব আমিরাতের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত ও অর্থনৈতিক রূপকল্প এবং পরিবর্তনশীল জ্বালানি পরিস্থিতির প্রতিফলন।
অভ্যন্তরীণ জ্বালানি উৎপাদনে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং বিশ্ব জ্বালানি বাজারে একটি দায়িত্বশীল ও নির্ভরযোগ্য ভূমিকা পালনের প্রতিশ্রুতি থেকেই এই পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। উৎপাদন নীতি ও সক্ষমতার ব্যাপক পর্যালোচনার পর জাতীয় স্বার্থ ও বাজারের জরুরি চাহিদা মেটাতেই এই সিদ্ধান্ত।’
মূলত বেশ কয়েকটি কারণ এই বিদায়ের পেছনে কাজ করেছে। বছরের পর বছর ধরে ওপেকের ওপর অসন্তুষ্ট ছিল আমিরাত। জোটের অঘোষিত নেতা সৌদি আরবের নির্দেশনায় তাদের তেল উৎপাদন সীমিত রাখতে হয়েছে। কিন্তু তেল উৎপাদন ও আঞ্চলিক রাজনীতি—উভয় ক্ষেত্রেই রিয়াদের চেয়ে আবুধাবির অগ্রাধিকার ভিন্ন।
সৌদি আরব তাদের ‘ভিশন ২০৩০’ বাস্তবায়নে অর্থনীতি বহুমুখী করার ওপর জোর দিচ্ছে। ফলে তেলের দাম বেশি রাখতে তারা উৎপাদন কমানোর পক্ষে। আর এই কোটা মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে আমিরাতসহ অন্য সদস্য দেশগুলো। কিন্তু আমিরাত তেলের দামের চেয়ে বেশি পরিমাণে তেল বিক্রিতে আগ্রহী। এই মতানৈক্যের কারণে গত এক দশক ধরেই দুই দেশের মধ্যে চাপা উত্তেজনা চলছিল। সম্প্রতি সুদান ও ইয়েমেনের ছায়াযুদ্ধে সেই দ্বন্দ্ব আরও প্রকাশ্যে আসে।
ইরানের সঙ্গে সাম্প্রতিক যুদ্ধ এই ফাটলকে আরও স্পষ্ট করেছে। আরব দেশগুলোর মধ্যে আমিরাতই সবচেয়ে সোচ্চারভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে সামরিকভাবে ইরানকে পরাজিত করার আহ্বান জানিয়েছে। অন্যদিকে, সৌদি আরব মধ্যস্থতার জন্য পাকিস্তানকে যুক্ত করেছে। মূলত ইসরাইলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা (আমিরাতে আইডিএফ সেনা ও আয়রন ডোম মোতায়েন) এবং ইরানের প্রতি কট্টর অবস্থানের কারণে উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে আমিরাতকেই সবচেয়ে বেশি মূল্য চোকাতে হয়েছে। এ কারণেই যুদ্ধের পর তারা প্রকাশ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সহায়তা চাইছে।
আরও পড়ুন:
যুদ্ধের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে আমিরাত যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ‘কারেন্সি সোয়াপ’ বা মুদ্রা বিনিময়ের সুবিধা চেয়েছে। এর মাধ্যমে তারা ওয়াশিংটনকে বার্তা দিতে চায় যে, দাবি না মানলে তারা চীনা মুদ্রায় (ইউয়ান) তেল বিক্রি বা মার্কিন ট্রেজারি বন্ড বিক্রির মতো বিকল্প পথে হাঁটতে পারে, যা হোয়াইট হাউস পছন্দ করবে না। একই সঙ্গে ওপেক ছাড়ার মাধ্যমে আমিরাত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে একটি রাজনৈতিক বিজয় উপহার দিতে চাইছে। কারণ ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই এই জোটের কট্টর সমালোচক এবং তিনি তেলের বাজারে মুক্তবাজার অর্থনীতির পক্ষপাতী।
কয়েক দশক ধরেই ওপেকের প্রভাব কমছে। একসময় বিশ্বের অর্ধেক তেল রপ্তানি করতো এই জোট, যা এখন ৪০ শতাংশে নেমে এসেছে। জোটের তৃতীয় বৃহত্তম তেল রপ্তানিকারক দেশ আমিরাত বেরিয়ে যাওয়ায় ওপেকের সক্ষমতা আরও ১৫ শতাংশ কমবে এবং বিশ্ববাজারে তাদের হিস্যা ৩০ শতাংশের কাছাকাছি নেমে আসবে।
তবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকা এবং ইরানের হামলায় অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বর্তমানে আমিরাতসহ অন্য দেশগুলোর উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশ নিচে রয়েছে। তাই চাইলেও তারা এখনই উৎপাদন বাড়াতে পারবে না। ফলে স্বল্প মেয়াদে বিশ্ববাজারে এর কোনো প্রভাব পড়বে না। তবে দীর্ঘ মেয়াদে সক্ষমতা ফিরে পেলে আমিরাত নিজেদের ইচ্ছামতো উৎপাদন বাড়াতে পারবে।
এখানে জ্বালানি বাজারের একটি বড় পরিবর্তনও ভূমিকা রাখছে। গত এক দশকে যুক্তরাষ্ট্রের তেল রপ্তানি বহুগুণ বেড়েছে। পাশাপাশি ইসরাইলের প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানিও লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে, যা তাদের জ্বালানি আমদানির নির্ভরতা অনেকটাই কমিয়েছে। মিসর ও জর্ডানও এখন ইসরাইলি গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাসের মজুত থাকা আরব আমিরাত এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে মিলে ওপেকের প্রতিদ্বন্দ্বী একটি জ্বালানি জোট গঠনের দিকে এগোচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিষয়টির সঙ্গে কেবল জ্বালানিই নয়, গভীর রাজনৈতিক মেরুকরণও জড়িত। সৌদি আরব ও আমিরাতের মধ্যে বিভেদ মূলত আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ব্যবস্থা নিয়ে তাদের ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির কারণে। রিয়াদ সব সময় স্থিতিশীলতা এবং বিদ্যমান সরকার ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার পক্ষে।
আরও পড়ুন:
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলনামূলক নতুন খেলোয়াড় আমিরাত অনেক বেশি হিসেবি, কম রক্ষণশীল এবং নিজেদের প্রভাব বিস্তারের জন্য যেকোনো নতুন পথে হাঁটতে প্রস্তুত। ইরান যুদ্ধের পর এই পার্থক্য আরও প্রকট হয়েছে। যখন সৌদি আরবসহ বেশির ভাগ দেশ বুঝতে পেরেছে যে যুক্তরাষ্ট্র একটি অবিশ্বস্ত মিত্র এবং ইসরাইল এই অঞ্চলের জন্য হুমকি, ঠিক তখনই আমিরাত সর্বাত্মকভাবে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল জোটের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে।
ইরান ইস্যুতে শক্ত অবস্থান না নেয়ায় অন্যান্য আরব দেশের কড়া সমালোচনা করেছে আমিরাত। অন্যদিকে সৌদি আরব, পাকিস্তান, মিসর ও তুরস্ককে সঙ্গে নিয়ে কূটনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজছে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে আমিরাত সম্প্রতি পাকিস্তানের কাছে পাওনা সাড়ে তিন বিলিয়ন ডলার ফেরত চেয়েছে, যা পাকিস্তানের অর্থনীতিকে বড় ধরনের সংকটে ফেলে দেয়। তবে তাৎক্ষণিকভাবে সৌদি আরব তিন বিলিয়ন ডলার দিয়ে পাকিস্তানকে সহায়তা করে। এই ঘটনা থেকে স্পষ্ট, সৌদি আরব এখন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর একক নির্ভরশীলতা কমিয়ে নিজেদের নিরাপত্তা বলয় বহুমুখী করার দিকে এগোচ্ছে।
এর পাশাপাশি আমিরাত ও ইসরাইল উভয়েই ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করছে। এসব নতুন মেরুকরণ মধ্যপ্রাচ্যে একধরনের স্নায়ুযুদ্ধের আভাস দিচ্ছে। তবে সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান ভালো করেই জানেন, এই যুদ্ধে ইরানের পতন হবে না এবং রিয়াদকে দীর্ঘ মেয়াদে তেহরানের সঙ্গে প্রতিবেশী হিসেবেই টিকে থাকতে হবে।
তিনি এও বুঝতে পেরেছেন, ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর হঠকারী সিদ্ধান্তে ইরান হয়তো আগের চেয়ে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে এবং তাদের পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের সম্ভাবনা বেড়ে যাবে। এই সমীকরণে আমিরাত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ওপর বাজি ধরে অনেকটা ভুল পথেই হেঁটেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। তা সত্ত্বেও উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (জিসিসি) টিকে থাকবে।
আমিরাত কখনোই সৌদি আরব বা অন্য কোনো আরব দেশের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে জড়াবে না। প্রকাশ্যে তারা সব সময় ‘ভ্রাতৃত্বপূর্ণ ঐক্যের’ ভাবমূর্তিই ধরে রাখার চেষ্টা করবে। তবে ওপেক থেকে আমিরাতের বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তটি নিঃসন্দেহে সৌদি আরবের সঙ্গে তাদের ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতারই একটি বড় ইঙ্গিত।





