ইরানের তেলের মজুত কী ফুরিয়ে আসছে; উৎপাদন কমাতে বাধ্য হবে তেহরান?

খার্গ দ্বীপ, যার মধ্য দিয়ে ইরানের ৯০ শতাংশ তেল রপ্তানি হয়।
খার্গ দ্বীপ, যার মধ্য দিয়ে ইরানের ৯০ শতাংশ তেল রপ্তানি হয়। | ছবি: সংগৃহীত
0

হরমুজ প্রণালি ও ইরানের বন্দরগুলোতে ১৩ এপ্রিল থেকে জারি করা মার্কিন নৌ-অবরোধের ফলে তেহরান এক কঠিন সংকটের মুখে পড়েছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, ইরানের অপরিশোধিত তেল মজুত করার সক্ষমতা দ্রুত ফুরিয়ে আসছে এবং এর ফলে দেশটি তেল উৎপাদন কমিয়ে দিতে বাধ্য হতে পারে। আল জাজিরার বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

ডেটা ও অ্যানালিটিকস কোম্পানি ‘কেপলার’-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই অবরোধ অব্যাহত থাকলে আগামী ১২ থেকে ২২ দিনের মধ্যে ইরানের তেলের মজুত রাখার জায়গা শেষ হয়ে যাবে। গত সপ্তাহে মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট দাবি করেছিলেন, ইরানের প্রধান রপ্তানি কেন্দ্র খার্গ আইল্যান্ডের মজুত সক্ষমতা ‘কয়েক দিনের মধ্যেই’ পূর্ণ হয়ে যাবে।

হরমুজ প্রণালির বর্তমান পরিস্থিতি
পারস্য উপসাগর ও খোলা সমুদ্রের সংযোগস্থল এই সরু প্রণালিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধের আগে বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এই পথ দিয়ে পরিবহন করা হতো। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের পক্ষ থেকে প্রণালিটি ‘বন্ধ’ ঘোষণা করা হয়। বর্তমানে ইরান কোনো বিদেশি জাহাজকে এই পথ দিয়ে যেতে দিচ্ছে না। ইরানের প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ রেজা আরিফ স্পষ্ট জানিয়েছেন, ‘হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা বিনামূল্যে পাওয়া যাবে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘হয় সবার জন্য তেলের বাজার উন্মুক্ত থাকবে, নতুবা সবাইকেই বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে হবে।’

মার্কিন দাবি ও ইরানের সক্ষমতা
যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য হলো ইরানের তেলের আয় বন্ধ করে দেওয়া। গত মার্চে ইরান দৈনিক ১৮ লাখ ৪০ হাজার ব্যারেল তেল রপ্তানি করেছিল। কিন্তু এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে মার্কিন অবরোধের কারণে এই তেলের সিংহভাগ এখন রপ্তানির বদলে মজুত করতে হচ্ছে। স্কট বেসেন্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ লিখেছেন, ‘কয়েক দিনের মধ্যে খার্গ আইল্যান্ডের মজুত পূর্ণ হয়ে যাবে এবং ইরানের নাজুক তেলকূপগুলো বন্ধ করে দিতে হবে।’

স্যাটেলাইট তথ্য বলছে, অবরোধের পর থেকে ইরানের মজুত আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। কলাম্বিয়া সেন্টার অন গ্লোবাল এনার্জি পলিসি (সিজিইপি) জানিয়েছে, ২০ এপ্রিল পর্যন্ত খার্গ আইল্যান্ডের মজুত সক্ষমতার ৭৪ শতাংশ পূর্ণ হয়ে গেছে। সাধারণত নিরাপত্তার খাতিরে কোনো দেশই মজুত ক্ষমতার ৮০ শতাংশের বেশি পূর্ণ করে না। তবে এর আগে করোনা মহামারির সময় ইরান ৯০ শতাংশ পর্যন্ত মজুত করেছিল। এ ছাড়া ইরানের হাতে ‘ফ্লোটিং ট্যাংক’ বা সাগরে ভাসমান জাহাজে প্রায় ১২ কোটি ৭০ লাখ ব্যারেল তেল মজুত রাখার সক্ষমতা রয়েছে।

উৎপাদন কি কমাতে হবে?
কেপলারের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক মুয়ু জু আল জাজিরাকে জানান, অবরোধের কারণে ইরান শেষ পর্যন্ত উৎপাদন কমাতে বাধ্য হতে পারে। তবে এই প্রক্রিয়াটি মে মাসের দিকে ত্বরান্বিত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। সিজিইপির ফেলো অ্যান্টোইন হালফ মনে করেন, ইরান এখনই বড় ধরনের উৎপাদন বন্ধ না-ও করতে পারে। তবে কৌশলগত কারণে তারা উৎপাদন কমিয়ে মজুত খালি রাখার চেষ্টা করতে পারে যাতে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে দ্রুত কাজ শুরু করা যায়।

কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ?
বিশেষজ্ঞদের মতে, তেল উৎপাদন হুট করে বন্ধ করে দিলে ভূগর্ভস্থ রিজার্ভারের চাপ কমে যায় এবং সেখানে পানি বা গ্যাস ঢুকে পড়ার ঝুঁকি থাকে। এতে পরবর্তী সময়ে তেল উত্তোলন করা অনেক বেশি ব্যয়বহুল ও কঠিন হয়ে পড়ে। এ ছাড়া উৎপাদন পুনরায় শুরু করা একটি ধীর ও ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, তেল রপ্তানি বন্ধ থাকলেও সাগরে ভাসমান ১৬-১৭ কোটি ব্যারেল তেল থেকে আগামী কয়েক মাস ইরানের আয় অব্যাহত থাকতে পারে।

এএম