মোহাম্মদপুরের অপরাধ-সন্ত্রাস দমনে পুলিশের অসহায়ত্ব; বাহিনীর শক্তি বৃদ্ধিই কি সমাধান?

মোহাম্মদপুরের অপরাধ-সন্ত্রাসের সাম্প্রতিক চিত্র
মোহাম্মদপুরের অপরাধ-সন্ত্রাসের সাম্প্রতিক চিত্র | ছবি: এখন টিভি
0

আবারও মোহাম্মদপুরের অপরাধ জগতের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে শীর্ষ সন্ত্রাসীরা। সক্রিয় হয়ে উঠেছে ৬৭টির বেশি কিশোর ও সন্ত্রাসী গ্যাং। অথচ এদের বেশিরভাগের ব্যাপারেই তথ্য নেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে। জনবল সংকট ও নানা প্রতিবন্ধকতায় অপরাধ দমনে অসহায় পুলিশ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শক্তি বৃদ্ধির পাশাপাশি অপরাধ দমনে প্রযুক্তি ব্যবহারের তাগিদ বিশেষজ্ঞদের।

গেলো দেড় বছরে প্রায় শতাধিক অভিযানে রাজধানীর ‘অপরাধের আতুরঘর’ মোহাম্মদপুর থেকে গ্রেপ্তার করা হয় অন্তত ৮ হাজার অপরাধীকে। যাদের বেশিরভাগই, চুরি-ছিনতাই, কিশোর গ্যাংয়ের হোতা ও সদস্য; এমনকি খুনের মতো অপরাধের সঙ্গে জড়িত। গ্রেপ্তার করা হয় বেশ কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসীকেও—আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দেয়া তথ্যে উঠে এসেছে এলাকার অপরাধ জগতের এমনই ভয়াবহ চিত্র।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এমন অভিযানে গেলো রমজান থেকে হঠাৎ-ই আন্ডারগ্রাইন্ডে চলে যায় মোহাম্মদপুরের অপরাধীরা। কমে যায় চুরি ছিনতাইয়ের ঘটনা। কিন্তু ১২ এপ্রিল বদলে যায় প্রেক্ষাপট; আবারও অস্ত্রের ঝনঝনানিতে কেঁপে ওঠে মোহাম্মদপুর।

এ দিন দিনেরবেলা রায়েরবাজার বধ্যভূমি এলাকায় কুপিয়ে হত্যা করা হয় সন্ত্রাসী এলেক্স গ্রুপের প্রধান ইমনকে। এর মাত্র ৩ দিনের মাথায় একই কায়দায় হত্যা করা হয় সাদেকুল ইসলাম ওরফে লম্বু সাদেককে। এখন প্রশ্ন হলো হাজারও অভিযান ও গ্রেপ্তার দিয়ে কতটাই বা নির্মুল করা গেল মোহাম্মদপুরের অপরাধ?

পুলিশের বলছে, গেলো বছরের টানা অভিযানে এলাকাটিতে তুলনামূলকভাবে কমেছে অপরাধ। গ্রেপ্তার হয়েছে অনেক আলোচিত গ্যাংয়ের মুল হোতা। তবে বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা।

ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের এডিসি মো. জুয়েল রানা বলেন, ‘মোহাম্মদপুর, আদাবরের দিকে চাঁদাবাজি, ছিনতাই, সন্ত্রাসী বা কিশোর গ্যাং লিড দিতো; আলোচিত সবাই এখন ধরেন যে পুলিশি হেফাজতে জেলখানায় আছে অথবা এলাকার বাইরে।’

সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রকাশিত গোয়েন্দা প্রতিবেদনে মোহাম্মদপুরে মাত্র ১৬টি সক্রিয় গ্যাংয়ের তথ্য থাকলেও অনুসন্ধান বলছে, বাস্তবে তার সংখ্যা প্রায় ৬৭টি। এর বাইরেও মোহাম্মদপুরের মধ্যাংশের প্রতিটি গলিতেই আছে শিশু কিশোরদের একাধিক গ্যাং। সব থেকে ভয়ঙ্কর ব্যাপার এসব গ্রুপের তথ্য নেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে।

নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক একটি গ্রপের সদস্য বলেন, ‘কিশোর গ্যাং আছে প্রায় ৬৭টি মোহাম্মদপুরে। এটা হচ্ছে রায়েরবাজার, চন্দ্রিমা, বসিলা, মডেল টাউন, ঢাকা উদ্যানসহ আরও কয়েকটি এরিয়া মিলিয়ে।’

আরও পড়ুন:

অনুসন্ধান বলছে গ্যাংগুলোকে প্রণোদনা দিচ্ছে কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসী। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দেশে কোন অস্তিত্ব খুজে না পেলেও মোহাম্মদপুর জুড়ে আধিপত্য বিস্তার আছে শীর্ষ সন্ত্রাসী অলি, ক্যাপ্টেন ইমন ও কিলার বাদলের।

যদিও সবাইকে টেক্কা দিয়ে এখন রাজত্ব চলছে সন্ত্রাসী ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলালের। যার আওতায় আছে ২০টির অধিক গ্যাংয়ের অন্তত ১৩০ জনের বেশি কিশোর অপরাধী ও সন্ত্রাসী। আর এলাকাভিত্তিক ডান হাত আছে ৮ জন । যাদের বেশিরভাগই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পরিচয় বহন করে।

এছাড়া ২০টির বেশি গ্যাংয়ে নেই কারও আধিপত্য। নিজেদের জানান দিতে হার হামেশায় বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে এসব গ্যাং। ব্যবহার হচ্ছে ভাড়াটে অপরাধী হিসেবে। কয়েকটি গ্যাং শুধু নির্মানাধীন ভবনের চাদাবাজিতেই ব্যবহার হচ্ছে।

নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক একটি গ্রপের সদস্য বলেন, ‘ইমামুল হাসান হেলাল, এটাই সেই পিচ্চি হেলাল। এখানে রাজনীতির সঙ্গে ওনার একটা সংশ্লিষ্টতা আছে। মোহাম্মদপুরে প্রায় অনেকগুলো সংগঠনই তার সঙ্গে সম্পৃক্ত আছে।’

৮০ দশক ধরে চলে আসা মোহাম্মপুরের অপরাধ দমনে এক প্রকার অসহায় পুলিশ— জনবল সংকট যার বড় কারণ। সামাজিক সচেতনতার মাধ্যমে অপরাধ কমিয়ে আনার আহ্বান জোনটির ডেপুটি কমিশনারের।

এডিসি জুয়েল রানা বলেন, ‘এই পুরো কারখানাটা ধ্বংস না করা পর্যন্ত আসলে মোহাম্মদপুরে প্রকৃত অর্থে পুরোপুরি নিরাপদ করাটা খুব চ্যালেঞ্জিং। কারখানা ধ্বংস করাতে পুলিশের ভূমিকা আসলেই খুব কম।’

ডিএমপির উপ পুলিশ কমিশনার (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস) এন এম নাসিরুদ্দিন বলেন, ‘এখানে যেমন ঘনবসতি, কম আয়ের মানুষের বসবাস—সেরকম একটা শহরে কম সংখ্যক পুলিশ দিয়ে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং দমন করা কষ্টসাধ্য।’

অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের বিদ্যমান আইনে খুব সহজেই জেল থেকে ছাড়া পায় অপরাধীরা। এছাড়া রাজনৈতিক প্রভাবে অপরাধীকে শুধু অপরাধী হিসেবে বিবেচনাও বড় চ্যালেঞ্জ। তাই অপরাধ দমন সহজেই সম্ভব নয়, তবে কমানো সম্ভব। আইনশৃঙ্থলা বাহিনীর সক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রযুক্তির ব্যবহার এখন হতে পারে বড় শক্তি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘পুলিশের কার্যক্রমের সঙ্গে আমরা যদি প্রযুক্তিকে সম্পৃক্ত করতে না পারি, শুধু সংখ্যা বাড়িয়ে কাজ হবে না। সুতরাং প্রযুক্তিকে সম্পৃক্ত করতে হবে। এর মাধ্যমে অপরাধীদের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করতে এবং যারা আইন ভঙ্গ করবে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

তবে মোহাম্মদপুরের বাসিন্দরা ভয়ে কেউ মুখ না খুললেও সেখানকার অপরাধ জগৎ থেকে মুক্তি চান সকলেই।

এসএইচ