একনজরে স্পিকারের সাংবিধানিক পদমর্যাদা ও ক্ষমতা
বিষয় (Topic) বিস্তারিত তথ্য (Details) সাংবিধানিক অনুচ্ছেদ অনুচ্ছেদ ৭৪ ও ৭৫ পদমর্যাদা (Rank) রাষ্ট্রপতির পরেই দ্বিতীয় (ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স অনুযায়ী) বিশেষ ক্ষমতা কাস্টিং ভোট (Casting Vote) ও অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নির্বাচনের সময় নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম বৈঠক
আরও পড়ুন:
আসন্ন অধিবেশনকে কেন্দ্র করে স্পিকারের নির্বাচন প্রক্রিয়া (Selection Process of Speaker) এবং তাদের সাংবিধানিক ক্ষমতা (Constitutional Powers) নিয়ে জনমনে নানা কৌতূহল রয়েছে। সংবিধান ও সংসদীয় কার্যপ্রণালি বিধির আলোকে এই বিষয়গুলো তলিয়ে দেখা যাক।
নির্বাচন প্রক্রিয়া ও সাংবিধানিক বিধান (Election Process and Constitutional Provisions)
বাংলাদেশের সংবিধানের ৭৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জাতীয় সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা হয়। একটি নতুন সংসদ গঠিত হওয়ার পর প্রথম অধিবেশনের প্রথম বৈঠকেই এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া বাধ্যতামূলক। সাধারণত সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল, যা এবারের প্রেক্ষাপটে বিএনপি ও তাদের মিত্ররা, তাদের পছন্দের প্রার্থীর নাম প্রস্তাব করে।
যদি একক কোনো নাম প্রস্তাব করা হয় এবং অন্য কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকে, তবে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। আর যদি একাধিক প্রার্থী থাকেন, তবে সংসদ সদস্যদের ভোটে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হন। নির্বাচিত হওয়ার পর তারা রাষ্ট্রপতির কাছে শপথ গ্রহণ করেন এবং তাৎক্ষণিকভাবে কার্যভার গ্রহণ করেন। রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদাক্রম (Warrant of Precedence) অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পরেই স্পিকারের অবস্থান। এমনকি প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতির চেয়েও প্রটোকলে স্পিকারের অবস্থান ওপরে।
স্পিকারের ক্ষমতা ও কার্যাবলি (Powers and Functions of the Speaker)
সংসদ অধিবেশন পরিচালনার ক্ষেত্রে স্পিকারের ক্ষমতাই চূড়ান্ত। ‘বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি’ (Rules of Procedure of Bangladesh Parliament) এবং সংবিধান তাকে ব্যাপক ক্ষমতা দিয়েছে। সংসদে কে কথা বলবেন, কতক্ষণ বলবেন এবং কোন বিষয় আলোচনার জন্য গৃহীত হবে—সবটাই স্পিকার নির্ধারণ করেন। তাঁর অনুমতি ছাড়া কোনো সদস্য ফ্লোর বা কথা বলার সুযোগ পান না। স্পিকার কোনো নির্দিষ্ট দলের টিকিটে এমপি নির্বাচিত হলেও, স্পিকারের আসনে বসার পর তিনি দলমত নির্বিশেষে ‘নিরপেক্ষ’ অবস্থানে থাকেন। কোনো সদস্য অসংসদীয় ভাষা ব্যবহার করলে স্পিকার তা কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়ার নির্দেশ দিতে পারেন।
এমনকি কেউ বিশৃঙ্খলা করলে তিনি তাকে সতর্ক করতে পারেন বা অধিবেশন কক্ষ থেকে বের করে দেওয়ার ক্ষমতাও রাখেন। এছাড়া কোনো বিল ‘অর্থ বিল’ (Money Bill) কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে সংবিধানের ৮১(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী স্পিকারের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত এবং তিনি বিলে সনদ প্রদান করেন।
আরও পড়ুন:
কাস্টিং ভোট ও বিশেষ ক্ষমতা (Casting Vote and Special Powers)
সাধারণত কোনো বিল পাসের সময় বা কোনো প্রস্তাবে স্পিকার ভোট দেন না; তিনি নিরপেক্ষ থাকেন। তবে সংবিধানের ৭৫(১)(খ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, যদি সংসদে কোনো বিষয়ে সরকারি ও বিরোধী পক্ষের ভোট সমান সমান হয়ে যায়, কেবল তখনই স্পিকার একটি ভোট দিতে পারেন। একে ‘নির্ণায়ক ভোট’ বা ‘কাস্টিং ভোট’ (Casting Vote) বলা হয়, যা অচলাবস্থা নিরসনে ব্যবহৃত হয়।
স্পিকারের আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক দায়িত্ব রয়েছে। সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে কিংবা অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব পালনে অক্ষম হলে, স্পিকার অস্থায়ীভাবে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব (Duties of the President) পালন করেন। নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত বা রাষ্ট্রপতি সুস্থ হয়ে না ফেরা পর্যন্ত তিনি এই দায়িত্বে থাকেন।
ডেপুটি স্পিকারের ভূমিকা (Role of the Deputy Speaker)
ডেপুটি স্পিকার মূলত স্পিকারের সহযোগী হিসেবে কাজ করেন। স্পিকার যখন অসুস্থ থাকেন, বিদেশে অবস্থান করেন কিংবা রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন, তখন ডেপুটি স্পিকার সংসদের সভাপতিত্ব করেন এবং স্পিকারের সব ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন। তবে স্পিকার যখন সভাপতিত্ব করেন, তখন ডেপুটি স্পিকার একজন সাধারণ সংসদ সদস্যের মতোই আচরণ করেন। তিনি আলোচনায় অংশ নিতে পারেন এবং ভোট দিতে পারেন।
আরও পড়ুন:
পদ শূন্য হওয়ার কারণ (Vacation of Office)
সংবিধানের ৭৪(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কয়েকটি কারণে স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকারের পদ শূন্য হতে পারে। যদি তিনি সংসদ সদস্য না থাকেন, মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পান, পদত্যাগ করেন কিংবা সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের ভোটে তাকে অপসারণের প্রস্তাব পাস হয়—তবে তার পদ শূন্য হবে। তবে কোনো কারণে সংসদ ভেঙে গেলেও পরবর্তী স্পিকার দায়িত্ব না নেওয়া পর্যন্ত বর্তমান স্পিকার স্বপদে বহাল থাকেন। এটি রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা রক্ষার স্বার্থেই করা হয়।
আগামী ১২ মার্চ ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং সংসদীয় গণতন্ত্রের যাত্রা শুরুর প্রথম ধাপ। অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশগুলো আইনে পরিণত করা এবং দেশের প্রয়োজনীয় সংস্কারগুলো এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে নতুন স্পিকারের ভূমিকা হবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংসদকে কার্যকর রাখতে এবং বিরোধী মতকে গুরুত্ব দিতে একজন দক্ষ ও নিরপেক্ষ স্পিকারের কোনো বিকল্প নেই।
বিষয় (Subject) বিস্তারিত তথ্য (Details) নির্বাচন প্রক্রিয়া (Election Process) সংবিধানের ৭৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রথম অধিবেশনের প্রথম বৈঠকে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় নির্বাচিত হন। পদমর্যাদা (Rank) ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স (Warrant of Precedence) অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির পরেই তার স্থান। অধিবেশন পরিচালনা (Conducting Session) কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী কে কথা বলবেন এবং কোন বিষয় আলোচিত হবে তা নির্ধারণের চূড়ান্ত ক্ষমতা। কাস্টিং ভোট (Casting Vote) সংবিধানের ৭৫(১)(খ) অনুযায়ী সরকারি ও বিরোধী দলের ভোট সমান হলে স্পিকার নির্ণায়ক ভোট দেন। বিশেষ দায়িত্ব (Special Duty) সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির অনুপস্থিতিতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। পদ শূন্য হওয়া (Vacation of Office) সংসদ সদস্য না থাকলে, পদত্যাগ করলে বা অনাস্থা ভোটে অপসারিত হলে পদ শূন্য হয় (অনুচ্ছেদ ৭৪-২)। ডেপুটি স্পিকারের ভূমিকা (Deputy Speaker) স্পিকারের অনুপস্থিতিতে সভাপতিত্ব করা এবং তার সকল ক্ষমতা প্রয়োগ করা।
আরও পড়ুন:
স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন: প্রশ্ন ও উত্তর (Q&A)
প্রশ্ন: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন কবে শুরু হবে?
উত্তর: আগামী ১২ মার্চ, ২০২৬ তারিখে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন (13th Parliament First Session) শুরু হবে।
প্রশ্ন: স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন কখন অনুষ্ঠিত হয়?
উত্তর: সংবিধানের ৭৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নতুন সংসদ গঠিত হওয়ার পর প্রথম অধিবেশনের প্রথম বৈঠকেই (First meeting of the first session) এই নির্বাচন করা বাধ্যতামূলক।
প্রশ্ন: স্পিকার নির্বাচনে কারা ভোট দিতে পারেন?
উত্তর: নবনির্বাচিত সকল সংসদ সদস্য (Members of Parliament) তাঁদের ভোটের মাধ্যমে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করেন।
প্রশ্ন: বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় স্পিকার নির্বাচিত হওয়ার প্রক্রিয়া কী?
উত্তর: যদি সংসদে স্পিকার পদের জন্য কেবল একজনের নাম প্রস্তাব করা হয় এবং অন্য কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকে, তবে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় (Uncontested election) নির্বাচিত হন।
প্রশ্ন: স্পিকার নির্বাচনে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী থাকলে জয়ী হওয়ার শর্ত কী?
উত্তর: একাধিক প্রার্থী থাকলে সংসদ সদস্যদের ভোটের সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার (Simple majority) ভিত্তিতে স্পিকার নির্বাচিত হন।
প্রশ্ন: নির্বাচিত হওয়ার পর স্পিকারকে কে শপথ পড়ান?
উত্তর: নবনির্বাচিত স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে রাষ্ট্রপতি (The President) শপথ বাক্য পাঠ করান।
প্রশ্ন: রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদায় স্পিকারের অবস্থান কত নম্বরে?
উত্তর: রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদাক্রম (Warrant of Precedence) অনুযায়ী স্পিকারের অবস্থান রাষ্ট্রপতির পরেই। অর্থাৎ তিনি প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতির ওপরে অবস্থান করেন।
প্রশ্ন: স্পিকারের ‘কাস্টিং ভোট’ (Casting Vote) কী?
উত্তর: সংসদে কোনো বিষয়ে ভোটাভুটিতে যদি সরকারি ও বিরোধী পক্ষের ভোট সমান হয়ে যায়, তবে অচলাবস্থা নিরসনে স্পিকার যে নির্ণায়ক ভোট দেন, তাকেই কাস্টিং ভোট বলে।
প্রশ্ন: স্পিকার কি দলীয় পরিচয় বজায় রাখেন?
উত্তর: তিনি একটি দলের টিকিটে এমপি নির্বাচিত হলেও স্পিকারের আসনে বসার পর তাকে দলমত নির্বিশেষে সম্পূর্ণ ‘নিরপেক্ষ’ (Neutral) থাকতে হয়।
প্রশ্ন: স্পিকার কখন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন?
উত্তর: সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে বা তিনি অসুস্থ থাকলে স্পিকার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব (Acting President) পালন করেন।
প্রশ্ন: অর্থ বিল (Money Bill) নির্ধারণে স্পিকারের ক্ষমতা কতটুকু?
উত্তর: কোনো বিল অর্থ বিল কি না, তা নিয়ে বিতর্ক দেখা দিলে স্পিকারের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত এবং তিনি বিলে প্রয়োজনীয় সনদ (Certificate) প্রদান করেন।
প্রশ্ন: ডেপুটি স্পিকারের প্রধান কাজ কী?
উত্তর: স্পিকারের অনুপস্থিতিতে সংসদ অধিবেশন পরিচালনা করা এবং স্পিকারের সকল সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগ করা।
প্রশ্ন: স্পিকারের পদ কখন শূন্য হতে পারে?
উত্তর: যদি তিনি সংসদ সদস্য না থাকেন, মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পান, পদত্যাগ করেন বা সংসদের অনাস্থা ভোটে অপসারিত হন।
প্রশ্ন: সংসদ ভেঙে গেলে কি স্পিকারের পদ চলে যায়?
উত্তর: না, সংসদ ভেঙে গেলেও পরবর্তী স্পিকার কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত বর্তমান স্পিকার স্বপদে বহাল থাকেন।
প্রশ্ন: সংসদ অধিবেশনে শৃঙ্খলা রক্ষায় স্পিকারের ভূমিকা কী?
উত্তর: অধিবেশনে কে কথা বলবেন তা নির্ধারণ করা, অসংসদীয় ভাষা (Unparliamentary language) বাদ দেওয়া এবং প্রয়োজনে বিশৃঙ্খলাকারী সদস্যকে কক্ষ থেকে বের করে দেওয়ার ক্ষমতা স্পিকারের আছে।
আরও পড়ুন:





