জাতীয় সংসদ বা নিম্নকক্ষ (Lower House)
সরাসরি জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত সদস্যদের নিয়ে গঠিত হবে এই নিম্নকক্ষ বা ‘জাতীয় সংসদ’। এটিই হবে রাষ্ট্রের মূল চালিকাশক্তি।
- সদস্য সংখ্যা: নির্বাচিত ৩০০ জন এবং সংরক্ষিত নারী আসনের ৫০ জন।
- ক্ষমতা: বাজেট (National Budget) এবং অর্থ সংক্রান্ত সকল বিল পাশের একচ্ছত্র ক্ষমতা থাকবে নিম্নকক্ষের হাতে।
আরও পড়ুন:
উচ্চকক্ষ বা সিনেট (Upper House/Senate)
নিম্নকক্ষের প্রথম অধিবেশন বসার ২১০ দিনের মধ্যে উচ্চকক্ষ গঠিত হবে। এই কক্ষের মূল কাজ হবে নিম্নকক্ষ থেকে পাশ হওয়া বিলগুলোকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করা, যা একটি ‘দ্বিতীয় চিন্তার’ (Second Thought) সুযোগ তৈরি করবে।
সদস্য সংখ্যা ও পদ্ধতি: মোট সদস্য হবেন ১০০ জন। এটি গঠিত হবে সংসদ নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যানুপাতে (Proportional Representation - PR Method)। অর্থাৎ, কোনো দল যদি ৪০% ভোট পায়, তবে উচ্চকক্ষে তারা ৪০টি আসন পাবে।
মেয়াদ: উচ্চকক্ষের মেয়াদ থাকবে নিম্নকক্ষের শেষ কার্যদিবস পর্যন্ত।
সংসদের কার্যপ্রণালি ও আইন পাস (Legislative Process)
দ্বিকক্ষবিশিষ্ট ব্যবস্থায় আইন প্রণয়ন প্রস্তাব বিল আকারে উত্থাপিত হবে। অর্থবিল ছাড়া অন্য যেকোনো বিল পাশের ক্ষেত্রে উভয় কক্ষের সমন্বয় প্রয়োজন। তবে সংবিধান সংশোধন (Constitutional Amendment) করতে হলে নিম্নকক্ষের দুই-তৃতীয়াংশ (Two-thirds majority) এবং উচ্চকক্ষের সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠের (Simple majority) ভোট বাধ্যতামূলক।
চ্যালেঞ্জ ও সমালোচনা (Challenges & Criticisms)
বিশ্লেষকরা এই ব্যবস্থার কিছু সীমাবদ্ধতাও তুলে ধরেছেন:
আর্থিক চাপ: নতুন ১০০ জন সদস্যের বেতন-ভাতা ও প্রশাসনিক কাঠামোর জন্য রাষ্ট্রের ওপর বড় আর্থিক চাপ তৈরি হবে।
বিলম্ব: দুই স্তরের পর্যালোচনার কারণে জরুরি প্রয়োজনে দ্রুত আইন পাশ ব্যাহত হতে পারে।
রাজনৈতিক পুনর্বাসন: উচ্চকক্ষ শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিকভাবে পরাজিত ব্যক্তিদের ‘পুনর্বাসন কেন্দ্র’ (Rehabilitation center) হয়ে ওঠার আশঙ্কা রয়েছে।
আরও পড়ুন:
কেন এই সংস্কার? (Importance of Reform)
সংস্কার কমিশনের মতে, এই ব্যবস্থা জাতীয় রাজনীতিতে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবে এবং কোনো একক দলের স্বেচ্ছাচারিতা (Autocracy) বন্ধে ‘চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স’ হিসেবে কাজ করবে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি গণভোটে (Referendum) জনগণের রায় পেলে এই রূপরেখাটি চূড়ান্তভাবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হবে।
বিচারের মাপকাঠি নিম্নকক্ষ (জাতীয় সংসদ) উচ্চকক্ষ (সিনেট/পরিষদ) গঠন পদ্ধতি জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত। প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যানুপাতে (PR Method) মনোনীত। সদস্য সংখ্যা ৩০০ (নির্বাচিত) + ৫০ (সংরক্ষিত নারী) = ৩৫০ জন। মোট ১০০ জন। অর্থ বিল ও বাজেট একচ্ছত্র ক্ষমতা। কোনো ক্ষমতা নেই, কেবল পর্যালোচনা। আইন প্রণয়ন বিল উত্থাপন ও প্রাথমিক পাস। বিলের ভুলভ্রান্তি যাচাই ও পুনর্বিবেচনা। সংবিধান সংশোধন দুই-তৃতীয়াংশ (২/৩) সদস্যের ভোট প্রয়োজন। সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের ভোট প্রয়োজন। মেয়াদকাল ৪ বছর। ৪ বছর (নিম্নকক্ষের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ)।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন – ২০২৬ লাইভ আপডেট দেখতে ,ক্লিক করুন।
আরও পড়ুন:
সংসদের উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষ: অর্থবিল থেকে সংবিধান সংশোধন, কার ক্ষমতা কোথায় বেশি?সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও উত্তর-FAQ
প্রশ্ন: বাংলাদেশের নতুন সংসদীয় কাঠামো কয়টি কক্ষ নিয়ে গঠিত হবে?
উত্তর: বাংলাদেশের নতুন সংসদীয় কাঠামো দুটি কক্ষ নিয়ে গঠিত হবে: নিম্নকক্ষ (জাতীয় সংসদ) এবং উচ্চকক্ষ (সিনেট বা বিশেষ পরিষদ)।
প্রশ্ন: নিম্নকক্ষ ও উচ্চকক্ষের সদস্য সংখ্যা কত হবে?
উত্তর: নিম্নকক্ষে সদস্য থাকবেন ৩৫০ জন (৩০০ নির্বাচিত + ৫০ সংরক্ষিত নারী আসন) এবং উচ্চকক্ষে সদস্য থাকবেন ১০০ জন।
প্রশ্ন: নিম্নকক্ষের প্রধান কাজ ও ক্ষমতা কী?
উত্তর: নিম্নকক্ষ রাষ্ট্রের প্রধান চালিকাশক্তি। দেশের বাজেট এবং অর্থ সংক্রান্ত সব বিল পাশের একচ্ছত্র ক্ষমতা কেবল নিম্নকক্ষের হাতেই থাকবে।
প্রশ্ন: উচ্চকক্ষ বা দ্বিতীয় কক্ষ কেন তৈরি করা হচ্ছে?
উত্তর: উচ্চকক্ষ প্রধানত নিম্নকক্ষ থেকে পাশ হওয়া বিলগুলোকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করবে। এটি কোনো একক দলের স্বেচ্ছাচারিতা বন্ধে ‘দ্বিতীয় চিন্তার’ (Second Thought) সুযোগ তৈরি করবে।
প্রশ্ন: উচ্চকক্ষের সদস্যরা কীভাবে নির্বাচিত হবেন?
উত্তর: উচ্চকক্ষ গঠিত হবে সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হারে (Proportional Representation)। অর্থাৎ, যে দল যত শতাংশ ভোট পাবে, উচ্চকক্ষে তাদের ততটি আসন থাকবে।
প্রশ্ন: উচ্চকক্ষ কি অর্থবিল বা বাজেট আটকে দিতে পারবে?
উত্তর: না, অর্থবিল এবং বাজেট পাশের পূর্ণ ক্ষমতা নিম্নকক্ষের। উচ্চকক্ষ কেবল সাধারণ আইন বা বিল পর্যালোচনা করতে পারবে।
প্রশ্ন: সংবিধান সংশোধন করতে হলে কার অনুমতি লাগবে?
উত্তর: সংবিধান সংশোধনের জন্য নিম্নকক্ষের দুই-তৃতীয়াংশ (২/৩) সদস্যের ভোট এবং উচ্চকক্ষের সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোট বাধ্যতামূলক।
প্রশ্ন: উচ্চকক্ষ কি রাজনৈতিকভাবে পরাজিত ব্যক্তিদের পুনর্বাসন কেন্দ্র হবে?
উত্তর: এটি একটি বড় বিতর্ক। সমালোচকরা মনে করেন, নির্বাচনে হেরে যাওয়া বা দলের অনুগত ব্যক্তিদের এখানে পদ দেওয়া হতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতে বিশেষজ্ঞ ও সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হবে।
প্রশ্ন: উচ্চকক্ষ গঠনের সময়সীমা কত দিন?
উত্তর: নিম্নকক্ষের প্রথম সংসদ অধিবেশন শুরু হওয়ার ২১০ দিনের মধ্যে উচ্চকক্ষ গঠন সম্পন্ন করতে হবে।
প্রশ্ন: দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের মেয়াদ কত বছর হবে?
উত্তর: প্রস্তাবিত নতুন নিয়ম অনুযায়ী, উভয় কক্ষের মেয়াদকাল হবে ৪ বছর।
প্রশ্ন: অর্থবিল ছাড়া অন্য বিল পাশের নিয়ম কী?
উত্তর: অর্থবিল ছাড়া অন্য যেকোনো বিল পাশের ক্ষেত্রে নিম্নকক্ষ ও উচ্চকক্ষ—উভয় কক্ষের সমন্বয় ও অনুমোদনের প্রয়োজন হবে।
প্রশ্ন: উচ্চকক্ষ তৈরির ফলে কি রাষ্ট্রীয় ব্যয় বাড়বে?
উত্তর: হ্যাঁ, নতুন ১০০ জন সদস্যের বেতন-ভাতা, নতুন ভবন এবং প্রশাসনিক কাঠামোর কারণে রাষ্ট্রের ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি হবে।
প্রশ্ন: উচ্চকক্ষে কি কোনো নারী বা বিশেষজ্ঞ কোটা থাকবে?
উত্তর: হ্যাঁ, উচ্চকক্ষ গঠনের আইনে বিশেষজ্ঞ, নারী বা সংখ্যালঘু প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে বিশেষ মনোনয়ন ব্যবস্থার সুযোগ রাখা হতে পারে।
প্রশ্ন: কোরাম (Quorum) কী এবং এটি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
উত্তর: একটি বৈধ অধিবেশন চালানোর জন্য ন্যূনতম সদস্যের উপস্থিতিকে কোরাম বলে। নতুন কাঠামোতে উভয় কক্ষেই আলাদা আলাদা কোরামের নিয়ম থাকবে।
প্রশ্ন: এই দ্বিকক্ষবিশিষ্ট ব্যবস্থা কি চূড়ান্তভাবে কার্যকর হয়েছে?
উত্তর: ১২ ফেব্রুয়ারির গণভোটে (Referendum) জনগণের রায় এবং পরবর্তী সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমেই এই রূপরেখাটি চূড়ান্তভাবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত ও কার্যকর হবে।



