Recent event

যেভাবে পরিচালিত হয় বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ

জাতীয় সংসদ ভবন
জাতীয় সংসদ ভবন | ছবি: এখন টিভি
1

বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রজাতন্ত্রের আইন প্রণয়নের সার্বভৌম ক্ষমতা ন্যস্ত রয়েছে জাতীয় সংসদের (National Parliament) ওপর। এটি কেবল আইন তৈরির কেন্দ্র নয়, বরং সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার সর্বোচ্চ প্ল্যাটফর্ম। ৩০০ জন নির্বাচিত এবং ৫০ জন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্যসহ (Member of Parliament) মোট ৩৫০ জন প্রতিনিধির সমন্বয়ে গঠিত এই এককক্ষ বিশিষ্ট আইনসভা রাষ্ট্রের ভাগ্য নির্ধারণ করে।

বিষয় (Category) বিস্তারিত বিবরণ (Key Functions) সাংবিধানিক ভিত্তি (Basis)
আইন প্রণয়ন বিলের তিনটি রিডিং ও রাষ্ট্রপতির সম্মতি সংবিধানের ৬৫ অনুচ্ছেদ
অধিবেশন বিরতি দুই অধিবেশনের মাঝে সর্বোচ্চ ৬০ দিন বিরতি সংবিধানের ৭২(১) অনুচ্ছেদ
জবাবদিহিতা প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের প্রশ্নোত্তর পর্ব সংসদীয় কার্যপ্রণালি বিধি
বাজেট অনুমোদন সরকারি অর্থ ব্যয়ের একচ্ছত্র বৈধতা প্রদান অর্থ বিল (Money Bill)
তদারকি সংসদীয় স্থায়ী কমিটির মন্ত্রণালয় পরিদর্শন কমিটি সিস্টেম (Committees)
সংবিধান পরিবর্তন দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের ভোটের প্রয়োজনীয়তা সংবিধান সংশোধন (Amendment)

আরও পড়ুন:

সংসদ অধিবেশন ও সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা (Parliament Session & Constitutional Obligations)

রাষ্ট্রপতি সংসদ অধিবেশন আহ্বান করেন। সংবিধানের ৭২(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, এক অধিবেশনের সমাপ্তি ও পরবর্তী অধিবেশনের সূচনার মধ্যে বিরতি কোনোভাবেই ৬০ দিনের বেশি হতে পারবে না। এই বাধ্যবাধকতার কারণে বছরে সাধারণত তিনটি প্রধান অধিবেশন বসে:

  • শীতকালীন অধিবেশন (Winter Session): বছরের শুরুতে রাষ্ট্রপতির ভাষণের মাধ্যমে শুরু হয়।
  • বাজেট অধিবেশন (Budget Session): জুন মাসে জাতীয় বাজেট অনুমোদনের জন্য বসে।
  • শরৎকালীন অধিবেশন (Autumn Session): বছরের শেষভাগে জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে বসে।

সংসদ পরিচালনার মূল স্তম্ভসমূহ (Core Pillars of Parliamentary Proceedings)

১. আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া (Law Making Process)

সংসদের প্রধান কাজ হলো নতুন আইন (New Legislation) তৈরি বা পুরোনো আইন সংশোধন। যেকোনো প্রস্তাবকে 'বিল' (Bill) বলা হয়। কোনো মন্ত্রী এটি উত্থাপন করলে তা সরকারি বিল (Government Bill) এবং সাধারণ সদস্য উত্থাপন করলে তা বেসরকারি বিল (Private Member's Bill) হিসেবে গণ্য হয়। তিনটি রিডিং ও রাষ্ট্রপতির সম্মতির পর বিলটি আইনে পরিণত হয়।

২. সরকারের জবাবদিহিতা ও সংসদীয় কমিটি (Accountability & Standing Committees)

সংসদীয় গণতন্ত্রে নির্বাহী বিভাগ সংসদের কাছে দায়ী থাকে। প্রতিদিনের শুরুতেই থাকে প্রশ্নোত্তর পর্ব (Question Hour), যেখানে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীরা সরাসরি জবাব দেন। এছাড়া প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের কাজের নজরদারিতে রয়েছে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি (Parliamentary Standing Committees), যাদের বলা হয় ‘সংসদের চোখ ও কান’।

৩. আর্থিক নিয়ন্ত্রণ ও বাজেট (Financial Control & Budget)

জাতীয় সংসদকে বলা হয় ‘রাষ্ট্রের মানিব্যাগ’। সংসদের অনুমোদন ছাড়া সরকার কোনো কর আরোপ বা ব্যয় করতে পারে না। প্রতিবছর অর্থমন্ত্রী কর্তৃক পেশকৃত জাতীয় বাজেট (National Budget) দীর্ঘ আলোচনার পর সংসদেই পাস হয়।

৪. সংবিধান সংশোধন ও অভিশংসন (Constitutional Amendment & Impeachment)

সংবিধানের কোনো পরিবর্তনের জন্য সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের ভোটের (Two-thirds majority) প্রয়োজন হয়। এছাড়া গুরুতর অপরাধে সংসদ রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসন (Impeachment) করার ক্ষমতা রাখে।

৫. জনস্বার্থ ও বিতর্ক (Public Interest & Debates)

যেকোনো জাতীয় সংকটে সদস্যরা মুলতবি প্রস্তাব (Adjournment Motion) আনতে পারেন। স্পিকারের (Speaker) দক্ষ পরিচালনায় সরকারি ও বিরোধী দলের গঠনমূলক বিতর্কই একটি জীবন্ত গণতন্ত্রের প্রাণ।

আরও পড়ুন:


জাতীয় সংসদ পরিচালনা সংক্রান্ত জিজ্ঞাসা ও সমাধান (FAQ)

প্রশ্ন: বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ কয় কক্ষবিশিষ্ট?

উত্তর: বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ এককক্ষ বিশিষ্ট (Unicameral) একটি আইনসভা। এটি ৩০০ জন সরাসরি নির্বাচিত এবং ৫০ জন সংরক্ষিত নারী সদস্যসহ মোট ৩৫০ জন সদস্যের সমন্বয়ে গঠিত।

প্রশ্ন: সংসদের স্পিকারের প্রধান কাজ কী? (Role of the Speaker)

উত্তর: স্পিকার সংসদের অভিভাবক ও সভাপতি। তিনি সংসদ অধিবেশন পরিচালনা করেন, শৃঙ্খলা বজায় রাখেন এবং কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী ভোটাভুটি ও বিল পাসের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন।

প্রশ্ন: সংসদ অধিবেশন কে আহ্বান করেন? (Who calls the Session)

উত্তর: বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি (President) সংসদ অধিবেশন আহ্বান করেন। সাধারণত প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে তিনি এই দায়িত্ব পালন করেন।

প্রশ্ন: কোরাম (Quorum) বলতে কী বোঝায়? কত সদস্য থাকলে অধিবেশন চলে?

উত্তর: সংসদের বৈঠক পরিচালনার জন্য ন্যূনতম সদস্যের উপস্থিতিকে কোরাম বলে। বাংলাদেশের সংবিধানে ৬০ জন সদস্যের উপস্থিতি থাকলে কোরাম পূর্ণ হয় এবং অধিবেশন চালানো যায়।

প্রশ্ন: একটি বিল (Bill) কীভাবে আইনে পরিণত হয়?

উত্তর: যেকোনো আইনের প্রস্তাবকে বিল বলে। সংসদে তিনটি রিডিং শেষে সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটে বিল পাস হয়। এরপর রাষ্ট্রপতি এতে সম্মতি দিয়ে স্বাক্ষর করলে তা গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়ে আইনে (Act) পরিণত হয়।

প্রশ্ন: প্রধানমন্ত্রীকে কি সংসদের কাছে জবাবদিহি করতে হয়? (PM’s Accountability)

উত্তর: হ্যাঁ, বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর মন্ত্রিসভা যৌথভাবে সংসদের কাছে দায়ী থাকেন। নির্দিষ্ট দিনে 'প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্ব' অনুষ্ঠিত হয়।

প্রশ্ন: সংসদীয় স্থায়ী কমিটি কী? (Standing Committees)

উত্তর: প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের কাজের তদারকি করার জন্য সংসদ সদস্যদের নিয়ে গঠিত ক্ষুদ্র দলই হলো স্থায়ী কমিটি। তারা মন্ত্রণালয়ের অনিয়ম তদন্ত এবং কাজের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে।

প্রশ্ন: দুই অধিবেশনের মধ্যে বিরতি কতদিন হতে পারে? (Session Gap)

উত্তর: সংবিধান অনুযায়ী, এক অধিবেশনের সমাপ্তি ও পরবর্তী অধিবেশনের সূচনার মধ্যে বিরতি কোনোভাবেই ৬০ দিনের বেশি হতে পারবে না।

প্রশ্ন: বাজেট অধিবেশন (Budget Session) কখন বসে?

উত্তর: সাধারণত প্রতি বছর জুন মাসে বাজেট অধিবেশন বসে। অর্থমন্ত্রী আগামী অর্থবছরের বার্ষিক আয়-ব্যয়ের হিসাব এই অধিবেশনে পেশ করেন।

প্রশ্ন: বিরোধী দলীয় নেতার (Leader of the Opposition) মর্যাদা কী?

উত্তর: বিরোধী দলীয় নেতা একজন পূর্ণ মন্ত্রীর (Cabinet Minister) পদমর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন। সরকারের সমালোচনা ও গঠনমূলক বিকল্প প্রস্তাব দেওয়া তার প্রধান কাজ।

প্রশ্ন: প্রশ্নকাল বা প্রশ্নোত্তর পর্ব (Question Hour) কী?

উত্তর: সংসদ অধিবেশনের প্রতিদিনের প্রথম ঘণ্টাকে প্রশ্নোত্তর পর্ব বলা হয়। এ সময় সংসদ সদস্যরা বিভিন্ন জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের প্রশ্ন করেন।

প্রশ্ন: অর্থ বিল (Money Bill) কী?

উত্তর: কর আরোপ, সরকারের ঋণ গ্রহণ বা ব্যয় সংক্রান্ত বিলগুলোকে অর্থ বিল বলা হয়। এই বিল কেবল সরকারি পক্ষ থেকে (মন্ত্রী কর্তৃক) উত্থাপিত হতে পারে।

প্রশ্ন: মুলতবি প্রস্তাব (Adjournment Motion) কেন আনা হয়?

উত্তর: যখন কোনো অতি জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় (যেমন: প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা জাতীয় সংকট) সামনে আসে, তখন নিয়মিত কার্যসূচি স্থগিত রেখে আলোচনার জন্য এই প্রস্তাব আনা হয়।

প্রশ্ন: সংসদ সদস্যের পদ কখন শূন্য হয়?

উত্তর: কোনো সদস্য বিনা অনুমতিতে একটানা ৯০টি কার্যদিবস অনুপস্থিত থাকলে, দলত্যাগ করলে কিংবা নিজ দলের বিপক্ষে ভোট দিলে (সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী) তাঁর পদ শূন্য হয়।

প্রশ্ন: সংবিধান সংশোধন করতে কত ভোট লাগে? (Constitutional Amendment)

উত্তর: সংবিধানের কোনো ধারা পরিবর্তন বা সংশোধন করতে হলে জাতীয় সংসদের মোট সদস্য সংখ্যার অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ (Two-thirds majority) সদস্যের ভোটের প্রয়োজন হয়।


এসআর