আজ (রোববার, ১০ মে) বিকেল সাড়ে ৩টায় জেলা প্রশাসন উদ্যোগে জেলা প্রশাসকের সভাকক্ষে এক আলোচনা শেষে ক্যালেন্ডার প্রকাশ করেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম।
এসময় জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোছা. হোমায়রা মন্ডল বক্তব্য রাখেন। সেখানে সাপাহার ও পোরশা উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও কৃষি অফিসার, আম চাষি ও ব্যবসায়িরা, উদ্যোক্তা এবং সংবাদকর্মীরাও উপস্থিত ছিলেন।
প্রকাশিত ক্যালেন্ডার থেকে জানা যায়, আগামী ২২ মে গুটি আম পাড়ার মধ্য দিয়ে আম নামানো শুরু হবে। এরপর পর্যায়ক্রমে ৩০ মে গোপালভোগ, ২ জুন ক্ষিরসাপাত/হিমসাগর, ৫ জুন নাকফজলি, ১০ জুন ল্যাংড়া/হাড়িভাঙ্গা, ১৫ জুন আম্রপালি, ২৫ জুন ফজলি ও ব্যানানা ম্যাংগো। এছাড়া দেরিতে পরিপক্ব হওয়া আম ৫ জুলাই আশ্বিনা/বারি-৪/বারি-১১/গড়মতি/কাটিমন আম সংগ্রহ করা যাবে।
নওগাঁ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, জেলায় ৩০ হাজার ৩১০ হেক্টর জমিতে আম বাগান রয়েছে, যা থেকে প্রায় ৪ লাখ ২২ হাজার টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। জেলায় ১৮ হাজার ৫২২ হেক্টর জমি আম্রপালি আম বাগান রয়েছে। এছাড়া ২ হাজার ৪৭০ হেক্টর জমিতে বারি-৪, আশ্বিনা ২ হাজার ৩২৩ হেক্টর, ল্যাংড়া ১ হাজার ৫৬০ হেক্টর, খিরসাপাত ১ হাজার ৪৭৬ হেক্টর এবং নাকফজলি ৯০০ হেক্টর। এছাড়া বিদেশি কিছু জাত রয়েছে।
পোরশা উপজেলার বন্ধুপাড়ার তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা রায়হান আলম বলেন, ‘২২০ বিঘা জমিতে বাগান আছে। এর মধ্যে রপ্তানিযোগ্য আমের জন্য আমার ২ লাখ পিস ফ্রুট ব্যাগিং প্রয়োজন। সেখানে পাওয়া গেছে ৫০ হাজার। বাকি ফ্রুট ব্যাগিং কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। এতে করে আমাদের বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছে।
উপজেলার সরাইগাছী গ্রামের আমচাষী ইসমাইল হোসনে বলেন, ‘২০ বিঘা জমিতে বাগান রয়েছে। এর মধ্যে ১০ বিঘা আম্রপালি ও ১০ বিঘা বারি-৪ আম। এ বছর আমের ফলন ভালো হয়েছে। গাছে আমের পরিমাণ কম থাকলেও নিয়মিত বৃষ্টি হওয়ায় আকারে বড় হয়েছে। রোগ-বালাই তেমন নেই বললেই চলে। তবে আমের ভালো দাম পেলে লাভবান হওয়া যাবে।’ আমের ওজনের বিষয়ে প্রশাসনের সুদৃষ্টিও কামনা করেন তিনি।
আরও পড়ুন:
সাপাহার উপজেলার ইসলামপুর গ্রামের আমচাষি আজগর হোসেন বলেন, ‘২২০ বিঘা জমিতে আমের বাগান রয়েছে। যার অধেক আম্রপালি। এবার আবহাওয়া মৌসুমের শুরু থেকে অনুকুলে আছে। শুরুতে আমের মুকুল যেমন ভালো ছিলো। আমও ভালো হয়েছে। নিয়মিত বৃষ্টি হওয়ায় বাগানে পানি সেচ খরচ কম হয়েছে, আমের সাইজ ভালো হয়েছে।’
সাপাহার আম আড়ৎদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক ইমাম হোসেন রিফাত বলেন, ‘আমের মৌসুমে সারা দেশ থেকে ৬০০ বেশি ট্রাক ও পিকআপসহ বিভিন্ন যানবাহন সাপাহারে আসে। জ্বালানি (ডিজেল) যেন পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকে সে ব্যাপারে প্রশাসের সহযোগিতা কামনা করছি। এছাড়া শনিবার ব্যাংক খোলা রাখার অনুরোধ করা হচ্ছে। জেলায় ৩টি বৃহৎ মোকাম। সাপাহার, নোচনাহার ও মিনাবাজার। আমের কোয়ালিটি ঠিক না থাকায় ব্যবসায়িরা ৫০ কেজির বেশিতে মণ কিনে থাকে।’
তিনি বলেন, ‘এক্ষেত্রে কৃষকরা তাদের নিজেদের স্বার্থে ব্যবসায়ীর সঙ্গে চুক্তি করে। তবে পাশে জেলাগুলোতে যদি ৪০ কেজি মণে আম বিক্রি হয়, তাহলে আমাদের এখানেও একই দর হবে। আর যদি অন্য জেলায় ৪০ কেজির বেশিতে আম বিক্রি হয় তাহলে ব্যবসায়ীরা নওগাঁয় আম কিনতে আসবে না। এতে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।’
নওগাঁ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোছা. হোমায়রা মন্ডল বলেন, ‘অপরিপক্ব আম বাজারে না আসতে পারে জন্য আম পাড়ার ক্যালেন্ডার প্রকাশ করা হয়েছে। এতে পর্যায়ক্রমে পরিপক্ব আম বাজারে আসবে। এ ব্যাপারে আমরা সবাই সচেতন থাকবো। একটা বিষয় অভিযোগ থাকে ৪০ কেজির পরিবর্তে আড়ৎদার ৫০ থেকে ৫২ কেজিতে মণ আম কিনে থাকে— এটা করা যাবে না। অনেকসময় চাষীরা নিজেদের স্বার্থে আম গড় করে ওজনে বেশি দিয়ে থাকে। এক্ষেত্রে কৃষক এবং ব্যবসায়ী দুইজনকে সচেতন হতে হবে। জেলায় ১৬ জাতের আম উৎপাদন হয়ে থাকে। জেলায় এ বছর প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার আম বাণিজ্য হওয়ার সম্ভবনা রয়েছে।’
নওগাঁ জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আম ব্যবসায়ীদের বিষয়ে যানবাহন সচল রাখতে পর্যায় জ্বালানি (ডিজেল) সরবরাহ এবং শনিবার ব্যাংক খোলার বিষয়ে সবার সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। এ ব্যাপারে সবার সহযোগিতা চাই। এছাড়া অপরিপক্ব আম যেন বাজারে না আসে, সে ব্যাপারে উপজেলা প্রশাসনকে নির্দেশনা দেয়া আছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘নির্ধারিত সময় অনুযায়ী আম সংগ্রহ করতে জেলাজুড়ে প্রচারণা চালানো হবে। যদি আমে কেমিক্যাল দেয়ার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়, তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
জেলার আমের সুনাম যাতে ক্ষুণ্ন না হয়, এজন্য আমচাষি ও ব্যবসায়ীদের প্রতি আহ্বান জানান জেলা প্রশাসক।
উল্লেখ্য, বরেন্দ্রভূমি হিসেবে পরিচিত জেলার সাপাহার, পোরশা, নিয়ামতপুর ও পত্নীতলা উপজেলার আংশিক এলাকা। জেলায় যে পরিমাণ আম বাগান রয়েছে তার ৭০ শতাংশ রয়েছে এসব উপজেলায়। যেখানে আম্রপালি, গোপালভোগ, ক্ষিরসাপাত, হিমসাগর, ফজলি, ল্যাংড়া, হাঁড়িভাঙা, আশ্বিনা ও বারী-৪সহ প্রায় ১৬ জাতের আম উৎপাদন হয়। এ জেলার আম অত্যন্ত সুস্বাদু ও সুমিষ্ট। এসব আম ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ হয়ে থাকে। এমনকি দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও বেশ সুনাম কুড়িয়েছে।




 weapon at Eglin Air Force Base, Florida-320x167.webp)
