তাঁতের বুনন-শতাব্দীর ঐতিহ্য। নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় গড়া এই শিল্প বাঙালির আত্মপরিচয় ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশও বটে। এই আবহমান বাংলায় তাঁতের বুননে এসেছে আধুনিক সংস্করণ। সময়ের সাথে হ্যান্ডলুম থেকে পাওয়ারলুমে তৈরি হচ্ছে রঙিন বসন।
তবে সম্প্রতিক জ্বালানি সংকটে ভুগছে তাঁত শিল্পও। লোডশেডিংয়ে ব্যাহত হচ্ছে বুনন। ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে বেশিরভাগ সময়ই বন্ধ থাকছে উৎপাদন। চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ না পাওয়ায় বেশকিছু তাঁত কারখানা বন্ধ হওয়ার উপক্রম।
নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদীর বেশকয়েকটি তাঁত কারখানা ঘুরে দেখা যায়, ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত উৎপাদন। দীর্ঘ সময় মেশিন বন্ধ থাকায় কমেছে গামছা, শাড়ি-লুঙ্গির উৎপাদন।
মালিকরা বলছেন, একদিকে লোডশেডিং, সাথে সুতার দাম বৃদ্ধি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে এই খাতে। উৎপাদন কমে যাওয়ায় চাহিদামতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারায় পড়ছেন লোকসানে।
এদিকে, সরবরাহ সংকটে পাইকারি বাজারে কমেছে তাঁতপণ্যের বেচাকেনা। পাইকাররা বলছেন, অর্ডার দিয়েও মিলছে না তাঁতের শাড়ি-লুঙ্গি-গামছা।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তাঁত শিল্প উদ্যোক্তাদের সহায়তা করা জরুরি। লোডশেডিংয়ের কারণে লোকসান কাটিয়ে উঠতে সরকারকে বিশেষ প্রণোদনা দেয়ার তাগিদ দেন তারা।
অর্থনীতিবিদ ড. মাহফুজ কবীর বলেন, ‘এখন যে পরিস্থিতি হয়েছে, দেয়ালে কিন্তু তাদের পিঠ ঠেকে গেছে। খেলাপি হয়েছে অনেকে, অনেক কারখানা বন্ধ হয়েছে; বন্ধ কারখানা চালু করা— এটার জন্য প্রায়োরিটি ঠিক করতে হবে। এখানে আমাদের যে ইনসেন্টিভগুলো আছে, বিশেষ করে ৬০ হাজার কোটি টাকার ইনসেন্টিভ প্যাকেজ, সেটা কীভাবে এই তাঁতশিল্পের সঙ্গে জড়িত যেসব এসিমিগুলো আছে, তারা প্রায়োরিটি বেইজ করে পেতে পারে। আবার যারা মোটামুটি একটু বড়, তারাও যে সংকটের মধ্যে আছে, এই সংকট যেন তারা কাটিয়ে উঠতে পারে, সেটাও আমাদের দেখতে হবে।’
বাংলাদেশে তাঁত বোর্ডের পরিসংখ্যান বলছে, সারা দেশে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে প্রায় ১৫ লাখ মানুষ তাঁত শিল্পের সাথে জড়িত। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের অভাবে যাদের বেশির ভাগই ভুক্তভোগী। এ অবস্থায় বোর্ড বলছে, সংকট কাটাতে সোলার প্যানেল স্থাপনের পাশপাশি জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহারে জোর দেয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. জাকির হোসেন সিদ্দিকী বলেন, ‘বিদ্যুতের সংকটে সারা দেশের মতো তাঁতিরাও ভুগছেন। এতে তাদের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে। কারণ জেনারেটরের মাধ্যমে ডিজেলচালিত তাঁতে উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে যায়। তবে আশার কথা হলো, বর্তমান সরকার একটা সময়োপযোগী উদ্যোগ নিয়েছেন— পুরো তাঁত উৎপাদনটাকে সৌরবিদ্যুতের আওতায় আনা। এটা করা গেলে আশা করা যায় যে, তাঁত উৎপাদন খরচ কমে আসবে।’
দেশিয় তাঁতশিল্প ও তাঁতিদের বাঁচাতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করে বিনিয়োগ বান্ধব পরিবেশ তৈরিতে সরকারের নজরদারির তাগিদ খাত সংশ্লিষ্টদের।





