ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের সাত মাস পার হলেও নেত্রকোনার সরকারি দপ্তরের ওয়েবসাইটগুলোতে এখনও রয়েছে ফ্যাসিবাদ চিত্র। এতদিনেও কেন ওয়েবসাইটগুলো সংস্কার হয়নি তাই এখন প্রশ্ন জনমনে।
এই যেমন জেলার পরিবার পরিকল্পনা, জেলা বীজ প্রত্যয়ন অফিস, উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো, জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন অফিস, উপ-কর কমিশনারের কার্যালয়, জেলা রেজিস্টারের কার্যালয়, বন বিভাগসহ একাধিক সরকারি ওয়েবসাইটে রয়েছে শেখ হাসিনার ছবি। একই অবস্থা উপজেলাভিত্তিক সরকারি অফিসগুলোর মধ্যে দুর্গাপুর, মোহনগঞ্জ, কেন্দুয়া মদনসহ প্রায় সব কয়টি উপজেলার বেশিরভাগ ওয়েবসাইটের।
এতো গেল ছবির কথা। দীর্ঘ ১৬ বছর আওয়ামী লীগ সরকার ডিজিটালের নামে জেলা থেকে উপজেলা প্রায় সবগুলো সরকারি দপ্তরকে ওয়েবসাইটের আওতায় আনে। তবে এসব ওয়েবসাইটে তথ্য কবে কখন বা কারা আপডেট করেছেন তার কোনো কিছুই জানেন না সরকারি অফিসের লোকজন। যার ফলে চার-পাঁচ বছর আগে সরকারি কর্মকর্তা বদলি হলেও তার নাম ফোন নম্বর এখনও রয়ে গেছে।
তালিকায় নাম থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে একটি নেত্রকোণা রেলওয়ে স্টেশন। স্টেশন মাস্টার দুই বছর আগে পরিবর্তন হলেও এখনও তার নাম ও ফোন নাম্বার রয়ে গেছে। ফলে এই নাম্বারে ফোন দিয়ে যেমন গ্রাহক বিভ্রান্ত হচ্ছেন তেমনি বিব্রত হচ্ছেন কর্মকর্তা নিজেও।
নেত্রকোনার সাবেক স্টেশন মাস্টার মো. নাজমুল হক খান বলেন, 'ভাই এই নম্বরটা এখন নেত্রকোণা স্টেশন মাস্টারের না। আমাকে প্রায় সময়েই রাত বিরাতে কল দিয়ে কষ্ট দেয়। আমি দুই বছরের উপরে চলে আসছি ওখান থেকে।'
নেত্রকোনার স্টেশন মাস্টার আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, 'এটা আমাদের রেলের কোনো বিষয় না। এটা সম্পূর্ণ ডিসি অফিসের ব্যাপার। সরকারি ওয়েবসাইটে এটা আমরা একটা ডকুমেন্টারি পাইছি, আমরা যাবো, গিয়ে আপডেট করবো।'
এদিকে সরকার কোটি টাকা ব্যয়ে দৃষ্টিনন্দন জেলা ডাকঘর নির্মাণ করলেও সরকারি ওয়েবসাইটে নেই কোনো কর্মকর্তার নাম ও নম্বর। নামে মাত্র ওয়েবসাইট থাকলেও অনলাইন থেকে গ্রাহকরা কোনো তথ্যই পাচ্ছেন না।
নেত্রকোনার সহকারী পোস্ট মাস্টার মির্জা রিফাত বেগ বলেন, 'সকল কর্মচারীর তথ্য, মোবাইল নম্বর যেন দ্রুত আপলোড হয়, সেজন্য আমরা সবকিছু ময়মনসিংহ পাঠিয়েছি। তারা আপলোড দিয়েছিল, কোনো কারণে হয়তো হয়নি। প্রক্রিয়া চলমান, যেকোনো সময় হয়ে যাবে।'
এদিকে বেশিরভাগ সরকারি অফিসেই অফিস চলাকালে কর্মকর্তাদের পাওয়া যায়নি। কী কারণে ওয়েবসাইটগুলোর তথ্য পরিবর্তন হয়নি তাও জানা যায়নি। যেমন জেলা সদরের বন বিভাগ। তিনজন কর্মকর্তার মধ্যে কাউকেই অফিসে পাওয়া যায়নি। অনলাইনে থাকা নম্বরে ফোন করলে জানা যায় এক বছর আগেই তার বদলি হয়েছে টাঙ্গাইলে।
এছাড়াও হাসপাতালে সমাজসেবা কর্মকর্তা চার বছরে তিনজন পরিবর্তন হলেও এখনও তারা আটকে রয়েছেন ২০২১ সালে। সদর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রয়েছে শেখ পরিবারের ছবি। আর সদর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের কোনো তথ্য নেই।
সদর উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. আহসান কবীর বলেন, 'ওগুলো ফলোআপ না করাতে এটা হয়ে গেছে। আমি অতিদ্রুত কথা বলে এটা আপডেট করার চেষ্টা করবো।'
সদর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আতিকুর রহমান খান বলেন, 'সব আপডেট দিয়ে দিয়েছি। সমস্যা হলো সব অফিসে পর্যাপ্ত সংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী না থাকার কারণে কিছু ক্ষেত্রে আপডেট করতে আমাদের কিছু সমস্যা হয়েছে।'
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র প্রতিনিধি ও রাজনৈতিক দলের নেতারা বলছেন, গণঅভ্যুত্থানের পর সরকারি দপ্তরে পরিবর্তন আনা প্রয়োজন ছিল। তবে কী কারণে এখনও পরিবর্তন হয়নি তা খোঁজ নিয়ে দেখার কথা বলেছেন তারা।
জেলা ছাত্রদলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সারোয়ার আলম এলিন বলেন, 'তাদের বিভিন্ন ওয়েবসাইটে এবং তাদের কার্যক্রমগুলোতে এখনও তাদের কার্যক্রম অব্যাহত আছে। আমরা আমাদের জায়গা থেকে দাবি জানাচ্ছি, খুব দ্রুত যেন তাদের অপসারণ করা হয় এ জায়গা থেকে।'
সবকিছুই ডিজিটালাইজেশন করা হলেও তা থেকে কতটুকু সুবিধা পাচ্ছে না জনগণ তাই নিয়ে প্রশ্ন সুশীল সমাজের।
স্থানীয় একজন বলেন, 'আমি নিজেও দেখেছি কিছু ওয়েবসাইট। এগুলো আপডেট করতে সর্বোচ্চ পাঁচ থেকে দশ মিনিট সময় লাগবে।'
জেলা প্রশাসক বলছেন, প্রতি মাসেই সরকারি ওয়েবসাইটগুলোর তথ্য আপডেট ও পরিবর্তনের জন্য সকল কর্মকর্তাকে বলা হলেও তা করা হয়নি। তবে দ্রুত এসব ওয়েবসাইট আপডেট না হলে দায়িত্বরতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান তিনি।
নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক বনানী বিশ্বাস বলেন, 'একটি জেলায় কয়েকশ' ওয়েবসাইট রয়েছে। আমরা মিটিংয়েও বলে দিয়েছি যার যার ওয়েবসাইট হালনাগাদ করতে। কেউ যদি না করে থাকে তাহলে আমি এখন সরকারিভাবে পত্র জারি করে দিবো যেন তারা খুব দ্রুততার সাথে ওয়েবসাইটগুলো হালনাগাদ করে।'
জেলা প্রশাসকের সরকারি ওয়েবসাইটের সাথে বিভিন্ন দপ্তরের ওয়েবসাইট রয়েছে ৭৪টি। এছাড়াও দশটি উপজেলা, পাঁচটি পৌরসভাসহ সব মিলিয়ে জেলায় মোট সরকারি ওয়েবসাইটের সংখ্যা প্রায় ৪৫৬টি।