খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার খর্নিয়া বাজার পেরিয়ে কিছুটা সামনে এগোলেই চোখে পড়বে ইট তৈরির বিশাল কর্মযজ্ঞ। মেসার্স নূরজাহান ব্রিকস নামের এই ভাটায় দেদারসে নিম্নমানের কয়লার সাথে কাঠের গুড়া মিশিয়ে সনাতন পদ্ধতিতে পোড়ানো হচ্ছে ইট।
নদী তীরবর্তী, কৃষি জমি ও লোকালয়ে হওয়ায় অনেক ভাটাকে ছাড়পত্র দেয়নি পরিবেশ অধিদপ্তর। কিন্তু এসব ভাটার মালিক প্রভাবশালী হওয়ায় ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে অবাধে চালিয়ে যাচ্ছেন ব্যবসা। বিগত সরকারের সাবেক ভূমিমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ ছিলেন খুলনা ইটভাটা মালিক সমিতির সভাপতি। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে এখন তার ভাটা বন্ধ। তবে মন্ত্রীর ঘনিষ্ট হওয়ায় অনেক ইটভাটার বিরুদ্ধে নেয়া হয়নি ব্যবস্থা।
স্থানীয় একজন বলেন, 'ধোঁয়ায় অনেক ক্ষতি হয়। আশেপাশের গাছপালাগুলো বাঁচে না। প্রভাবশালী লোকদের জন্য আমরা আসলে কিছু করতে পারি না।'
ভাটাগুলোতে কাঠ ও মাটি পুড়িয়ে সনাতন পদ্ধতিতে ইট তৈরি হওয়ায় বিপন্ন হচ্ছে পরিবেশ, স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ভাটায় কর্মরত শ্রমিক ও স্থানীয়রা। তবে জীবিকার তাগিদে স্বাস্থ্যের কথা ভুলতে বাধ্য হয়েছেন হাজারও শ্রমিক।
একজন শ্রমিক বলেন, 'শরীরে তো অনেকরকমের রোগই দেখা দেয়। কষ্ট করে করতে হয়। এই কাজ করে কোনোভাবে সংসার চলে।'
বাংলাদেশের পরিবেশ দূষণ বা জনস্বাস্থ্যের ক্ষতিকর দিক নিয়ে ভাবতে গেলে উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলোর মধ্যে অন্যতম একটি কারণ ইটের ভাটা। এই ইটের ভাটাগুলো তিলে তিলে মানুষের শরীরে রোগের আবাসস্থান তৈরি করছে। শত বছরের পুরোনো পদ্ধতিতে ভাটা পরিচালনাই এই ক্ষতির মূল কারণ।
ইট তৈরিতে জ্বালানি হিসেবে কাঠের ব্যবহার ভাটা স্থাপন আইনে স্পষ্ট নিষেধ হলেও তাও মানা হচ্ছে না। এছাড়া নিম্নমানের কয়লা পোড়ানোর কারণে পরিবেশে যুক্ত হচ্ছে পার্টিকুলেট ম্যাটার, কার্বন মনোঅক্সাইড, সালফার অক্সাইড ও কার্বন ডাইঅক্সাইডের মতো ক্ষতিকর উপাদান। এছাড়া কৃষি জমির ওপরও পড়ছে ক্ষতিকর প্রভাব।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ হারুন চৌধুরী বলেন, 'মানুষ কিন্তু এগুলো তার শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে গ্রহণ করে, বিভিন্ন ধরনের শারীরিক অসুখ হয়ে থাকে। আর সবচেয়ে বড় কথা যেটা- সেটা হচ্ছে, এই ইটভাটাগুলোর কারণে আশপাশের কার্বনের পরিমাণ কিন্তু বেড়ে যাচ্ছে।'
পরিবেশ অধিদপ্তরের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, খুলনা বিভাগের দশ জেলায় এক হাজার ১৮টি ইটভাটা রয়েছে। এর মধ্যে ৭৯০টি ইটভাটারই নেই পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদন। বিভাগে সব থেকে বেশি ইটভাটা রয়েছে কুষ্টিয়ায়। যেখানে মোট ইটভাটার পরিমাণ ১৮৪টি। তবে এর মধ্যে ১৬৩টি ইটভাটারই নেই পরিবেশ ছাড়পত্র।
এদিকে অবৈধ ইটভাটা বন্ধে অভিযানে নেমেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। গেলো জানুয়ারি মাসে পরিবেশ অধিদপ্তরের অভিযানে ১৯টি ইটভাটা আংশিক এবং ১২টি ভাটা গুড়িয়ে দেয়া হয়। এছাড়া বেশকিছু ভাটা বন্ধ করে দেয়ার পাশাপাশি দেয় হয় অর্থদণ্ড।
খুলনা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক পারভেজ আহম্মেদ বলেন, 'এটা আমাদের রুটিন ওয়ার্ক। এটা নিয়মিত পর্যায়ক্রমে পরের উপজেলায় অভিযান করবো। দরকার পরলে আবারো একই জায়গায় অভিযান পরিচালনা করবো। আমরা কোনো ক্রমেই অবৈধ ইটভাটাকে চলতে দিবো না।'
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু ইটভাটা বন্ধ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। ইট তৈরিতে নতুন পদ্ধতির উদ্ভাবন ও কংক্রিট ব্লক ব্যবহারে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার তাগিদ তাদের।