সাব এজেন্ট বা মধ্যস্বত্বভোগী ধরে বিদেশ যাত্রা ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় রিক্রুটিং এজেন্সিকে বেছে নেন অনেকেই। চলতি বছর দেশে নতুন লাইসেন্স পেয়েছে ২১৬টি রিক্রুটিং এজেন্সি। কিন্তু অতিরিক্ত অর্থ আদায় করেও বিদেশে কাজের নিশ্চয়তা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে সরকারের লাইসেন্সধারী এসব এজেন্সি। রাজধানী জুড়ে এক হাজারের বেশি রিক্রুটিং এজেন্সি থাকলেও অর্ধেকেরও কম প্রতিষ্ঠান সরাসরি শ্রম অভিবাসনে ভূমিকা রাখছে। অভিযোগ আছে, অপ্রয়োজনীয় লাইসেন্স বাড়ার কারণে বেড়েছে ভিসা বিক্রি ও প্রতারণা।
শ্রমিক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিবেশী দেশ ভারত, শ্রীলঙ্কা ও নেপাল থেকে তুলনামূলক বেশি রিক্রুটিং এজেন্সি বাংলাদেশে। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর সবশেষ তথ্য মতে, দেশে রিক্রুটিং এজেন্সি ২ হাজার ৮৪১টি। এরমধ্যে সক্রিয় ২ হাজার ১৭৫টি ও লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে ২৯৭টির।
ওয়্যারবী ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান সৈয়দ সাইফুল হক বলেন, ‘রিক্রুটিং এজেন্সি লাইসেন্স দিলেই যে রিক্রুটমেন্ট ফেয়ার অ্যান্ড ইথিক্যাল হবে তা তো না। যারা রিক্রুটিং এজেন্সি লাইসেন্সধারী, তারা সবাই কিন্তু মার্কেটিং করে না। তারা বিদেশে কিন্তু লোক সেভাবে পাঠায় না। আমরা যেভাবে পুরনো কথা বলে আসছি—যারা ভিসা ট্রেডিংয়ের মাধ্যমে ভিসা কিনে এনে এখানে লোক পাঠায়, সেই কাজে নিয়োজিত। দ্যাট ইজ, তারাও ওয়ান কাইন্ড অফ মিডলম্যান।’
লাইসেন্সধারী রিক্রুটিং এজেন্সির মধ্যে বায়রার সদস্য প্রায় আড়াই হাজার প্রতিষ্ঠান। সৌদি আরব ও মালয়েশিয়ার তালিকাভুক্তির প্রতিযোগিতা থাকলেও অধিকাংশ এজেন্সি কাজ করে মূলত সাব এজেন্টের।
বায়রার সাবেক যুগ্ম সম্পাদক মিজানুর রহমান বলেন, ‘দেড় থেকে ২০০ রিক্রুটিং এজেন্সি সৌদি আরবে সরাসরি রিক্রুটমেন্টের সাথে জড়িত। এখন আমাদের লাইসেন্স সংখ্যা বাড়ার কারণে সেটি হয়তো ৩০০ এর মধ্যে গিয়ে পড়বে। বায়রারকে আমরা একটা পরিবার বলে থাকি। বায়রার কোনো একজন লোকের কাছে যদি ডিমান্ড আসে, সেই ডিমান্ডের মানে পরিবারের সদস্য হিসেবে ডিমান্ডের হক সবারই থাকে। এজন্য সবাই সবাইকে সহায়তা করে, আমরা বিষয়টাকে ওভাবেই দেখি।’
লাইসেন্সধারী অনেক এজেন্সির বিরুদ্ধেও রয়েছে প্রতারণার ফাঁদ পাতার অভিযোগ। তাই মেয়াদ নবায়নের আগে প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম যাচাই বাছাইয়ের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত গোলাম মসিহ বলেন, ‘যদি সরকার টাফ থাকে এবং তারা যদি চেক করে যে এই রিক্রুটিং লাইসেন্সের নামে কোনো কমপ্লেইন নাই, বা এক বছরে সে ১০০ লোক মিনিমাম পাঠিয়েছে, তাদের লাইসেন্সগুলি রিনিউ করা উচিত। এবং যেগুলো তারা লোক পাঠায় নি, এগুলো ক্লোজ করে দিলেই অটোমেটিক লাইসেন্স কমে আসবে।’
অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারের সমন্বয়হীনতার কারণেই এজেন্সিগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। প্রতারণার এড়াতে কাজের মূল্যায়নের পাশাপাশি যত্রতত্র লাইসেন্স দেয়া বন্ধ করতে হবে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনির বলেন, ‘এতগুলো রিক্রুটিং এজেন্সি হওয়ার কারণে সেটা অনলাইন হোক আর অফলাইন হোক, সেগুলো মনিটর করা কিন্তু সরকারের পক্ষে কঠিন। যেটা ইমিডিয়েটলি করা দরকার—যে এক ধরনের একটা মূল্যায়ন করা দরকার, যে এতগুলো রিক্রুটিং এজেন্সি আসলেই তারা সক্রিয়ভাবে কাজ করছে কিনা। যারা খুবই তাদের পারফরম্যান্স খারাপ, তাদেরকে একটা আলাদা তালিকায় ফেলে রাখা যেতে পারে। যে এদেরকে খুব বেশি অনুমোদন দেয়া যাবে না বা এদের ব্যাপারে আসলেই খুব নজরদারি বেশি রাখতে হবে। আর যারা ভালো কাজ করছে, তাদের সাথে হয়তো আরও নিয়মিতভাবে কাজ করা যায়।’
ভিসা বিক্রি, অতিরিক্ত অর্থ আদায় ও প্রতারণার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে ব্যবস্থার কথা বলছেন বিএমইটির এই কর্মকর্তা।
বিএমইটির অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. আশরাফ হোসেন বলেন, ‘যদি আমরা এরকম সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ পাই যে রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে গিয়েছে কিন্তু সে কাজ পাচ্ছে না, তাহলে অভিযোগ পাইলে আমরা অবশ্যই ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারি।’
নিরাপদ শ্রম অভিবাসন ও কর্মীদের কাজের নিরাপত্তা দিতে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে আরও বেশি জবাবদিহিতা ও নজরদারির আৱওতায় আনতে হবে বলছেন সংশ্লিষ্টরা।





