আজ (বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল) জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। এসময় অধিবেশনে জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম সভাপতিত্ব করেন।
বিগত সরকারের লুটপাটের চিত্র তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আওয়ামী লীগ আমলে দেশ থেকে প্রায় ৩০ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে। এই বিশাল অংকের টাকা দিয়ে ২৪টি পদ্মা সেতু বা ১৪টি মেট্রোরেল বানানো সম্ভব ছিল।’
বিরোধীদলকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, ‘কে বড় মুক্তিযোদ্ধা সেই বাহাস না করে আসুন পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার উদ্যোগ গ্রহণ করি।’
আরও পড়ুন:
ব্যাংক দখল প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আগে ব্যাংক দখল হতো গোয়েন্দা সংস্থার ভয় দেখিয়ে, আর এখন অনেকে নারায়ে তাকবীর বলে দখল করছে, এই দখলদারিত্ব বন্ধ হওয়া জরুরি।’
তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ আর বর্তমান সময়ের মধ্যে দখলের স্টাইল হয়তো ভিন্ন হয়েছে, কিন্তু লুণ্ঠন বন্ধ হওয়া জরুরি। সংস্কারের দোহাই দিয়ে নির্বাচন বিলম্বিত করার যে কোনো অপচেষ্টা বিএনপি বরদাশত করবে না। বিএনপি জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষর করেছিল মূলত নির্বাচনের স্বার্থে অনেক কিছুতে আপস করে।’
মন্ত্রী বলেন, ‘২০০৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত দীর্ঘ সংগ্রামে রক্তের পথ মাড়িয়ে আজ আমরা এই অবস্থানে এসেছি। এই ইতিহাসকে খাটো করার চেষ্টা করবেন না। আওয়ামী লীগ আমলে দরিদ্রদের হক যেভাবে ধনীরা লুট করেছে এবং যেভাবে দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেয়া হয়েছে, সেই বাস্তবতাকে ভুলে গিয়ে কেবল চেতনার রাজনীতি করলে দেশ এগোবে না।’
আরও পড়ুন:
তিনি বিরোধীদলকে ইতিবাচক ও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘সংসদীয় রীতিনীতি মেনে জনগণের ম্যান্ডেটকে সম্মান করাই হবে প্রকৃত রাজনীতি। অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করেই সব সংস্কার ও নির্বাচনি প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে সরকার বদ্ধপরিকর।’
বাক স্বাধীনতার অপব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে স্বাধীনতার কথা থাকলেও তা অবারিত নয়। বর্তমানে দেশে-বিদেশে বসে যেভাবে কুরুচিপূর্ণ ভাষায় কুৎসা রটানো হচ্ছে, তাতে আমাদের সামাজিক ও ধর্মীয় সম্প্রীতি নষ্ট হচ্ছে।’
তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘স্বাধীনতার নামে এই কলঙ্কিত ধারা বেশি দূর এগোতে দেয়া হবে না।’
আরও পড়ুন:
বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত— বুদ্ধ পূর্ণিমার শুভেচ্ছাবার্তায় প্রধানমন্ত্রী
গালিগালাজের প্রতিযোগিতায় যারা চ্যাম্পিয়ন হতে চান, তাদের কঠোর বাধানিষেধের আওতায় আনতে আইন মন্ত্রণালয়কে পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, গুম হওয়া মানুষ আর ফিরে না আসা স্বজনদের যে হাহাকার, তা তিনি নিজের জীবন দিয়ে উপলব্ধি করেছেন। শহিদদের রক্ত আর জনগণের ত্যাগের বিনিময়ে যে গণতান্ত্রিক বিজয় অর্জিত হয়েছে, তাকে কোনোভাবেই কলঙ্কিত হতে দেয়া যাবে না।
নিজ পরিবারের অনিশ্চিত দিনগুলোর কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘সাড়ে ৯ বছরের নির্বাসন ও বিদেশের জেলখানায় কাটানো সময়গুলো তাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে।’
আরও পড়ুন:
ইলিয়াস আলীর মতো গুম হওয়া নেতাদের পরিবারের কষ্টের কথা তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘তাদের সন্তানরা আজও বাতায়ন খুলে পিতার জন্য অপেক্ষা করে। তাদের সেই অশ্রুর মর্যাদা দিতে হলে আমাদের এমন এক রাষ্ট্র গড়তে হবে, যেখানে আর কোনো মানুষ গুম হবে না, কারো অধিকার হরণ করা হবে না।’
২০২৬-এর এই নতুন বন্দোবস্তের রাজনীতি যেন বৈষম্যহীন ও ন্যায়বিচার ভিত্তিক হয়, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে তিনি সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে বলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার বক্তব্যে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সংজ্ঞাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে চূড়ান্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, ‘১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনী এবং তাদের এ দেশিয় দোসর রাজাকার, আলবদর, আলশামস ও জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে যারা লড়াই করেছেন, তারাই বীর মুক্তিযোদ্ধা, এটি এখন সংসদীয় আইনে সাব্যস্ত। এই জাতীয় ইস্যু নিয়ে বারবার বিতর্ক সৃষ্টি করা জাতির জন্য সম্মানজনক নয়।’
আরও পড়ুন:
যারা নিজেদের মুক্তিযোদ্ধা দাবি করেন অথচ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে দ্বিধায় থাকেন, তাদের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘ইতিহাসের আকাশে যারা তারা হয়ে আছেন, তাদের সম্মান রক্ষা করা আমাদের সবার দায়িত্ব।’
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘বিশ্ববাসী বাংলাদেশের নির্বাচনকে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং কোনো ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের প্রমাণ পায়নি।’
সংবিধান সংস্কার ও জুলাই জাতীয় সনদ নিয়ে ওঠা বিতর্কের জবাবে তিনি বলেন, ‘বিএনপি কখনোই জুলাই সনদ থেকে বিচ্যুত হয়নি। বরং কিছু দল নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করলেও বিএনপি বরাবরই জনগণের সার্বভৌমত্বের পক্ষে ছিল।’
আরও পড়ুন:
তিনি সংবিধানের ধারা উল্লেখ করে বলেন, ‘অর্ডিন্যান্স বা অধ্যাদেশের মাধ্যমে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। যেকোনো বড় সংস্কারের ক্ষেত্রে জনগণের সরাসরি রায়ের প্রয়োজন রয়েছে বলেই বিএনপি গণভোটের প্রস্তাব দিয়েছিল।’
জাতীয় সনদ নিয়ে কোনো প্রকার বিভ্রান্তি ছড়ানো থেকে বিরত থাকার জন্য তিনি বিরোধী দলীয় সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানান।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘জুলাই জাতীয় সনদকে পাশ কাটিয়ে “সংবিধান সংস্কার পরিষদ” গঠনের প্রক্রিয়া ফ্রডোলেন্ট বা প্রতারণামূলক। জুলাই সনদের মূল দলিলের সঙ্গে বর্তমান কর্মকাণ্ডের কোনো মিল নেই এবং রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া এমন আদেশ অন্তর্বর্তী সরকার কীভাবে দেয়, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে আসা এই সংসদকে অবজ্ঞা করে বাইরে ভিন্ন পন্থায় সংবিধান সংস্কারের চেষ্টা চলছে, যা দেশের আইনি কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক।’
আরও পড়ুন:
বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘জনগণের প্রত্যাশা পূরণ ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার নিয়েই তারা নির্বাচনে ৫১ শতাংশ ভোট পেয়ে ২১৪ জন সদস্যের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সংসদে এসেছেন।’
তিনি টু-থার্ড মেজরিটি বা দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, ‘এই শক্তি না থাকলে অতীতে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কিংবা মুক্ত গণমাধ্যম আসতো না।’
তিনি বিরোধীদলকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘সংবিধান সংশোধন কমিটির জন্য নাম চেয়েও পাওয়া যায়নি, অথচ বাইরে সংস্কার পরিষদ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।’
আরও পড়ুন:
তিনি বলেন, ‘১৯ জানুয়ারি ২০২৬-এ যখন কোনো গণভোট হয়নি, তখন কোন এখতিয়ারে ব্লু পেপারে সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ ফরম তৈরি করা হলো।’
তিনি একে সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদের স্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে অভিহিত করে বলেন, ‘পদে পদে সংবিধান ভায়োলেশন করা হচ্ছে।’
দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও আইনি অচলাবস্থা নিরসনে সংবিধান সংশোধনেরও প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘পঞ্চদশ সংশোধনীর অধিকাংশ ধারা এখনো বিদ্যমান, যার কারণে সংবিধানে মহান আল্লাহর ওপর আস্থার বিষয়টি প্রতিফলিত হচ্ছে না।’
আরও পড়ুন:
তিনি প্রশ্ন করেন, বিরোধীদল কি এখনো সেই বিতর্কিত সংশোধনীগুলোই বহাল রাখতে চায়? প্রজাতন্ত্রের মালিক জনগণ এবং তাদের স্বার্থে একটি ভবিষ্যৎমুখী সংবিধান প্রণয়ন করতে হলে অবশ্যই সংসদীয় কমিটিতে আসতে হবে।
বিএনপির ইতিহাসকে বহুদলীয় গণতন্ত্র ও সংসদীয় রাজনীতি প্রবর্তনের ইতিহাস হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বর্তমান গ্লোবাল অর্ডারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা বাস্তবায়নের দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।—বাসস





