গত দুই দশকের বেশি সময় ধরে পুরান ঢাকার এ স্বর্ণের দোকানের কর্মচারী সমীর চন্দ্র খাঁ। একসময় হালখাতার দিনে দমফেলার ফুরসত মিলতো না তার। কতশত মিষ্টি, আর উপহারে ঢাসা থাকতো দোকান। তবে এখন সেসব কেবলই স্মৃতি। যদিও নিয়ম রক্ষা করতে সীমিত পরিসরে হালখাতার আয়োজন রেখেছেন।
সমীর চন্দ্র খাঁ বলেন, ‘এখন আর আগের মতো হয় না। আর আমরাও কাস্টমারদের বলি না। বললেও কেউ আসে না। শুধু নিয়মটাই মানা হচ্ছে আর কিছু না। আগের মতো আর আনন্দ হয় না। আগে আমরা সব কিছু সাজাতাম।’
একই গলির অন্য দোকানে কাজ করেন রাজকুমার ধর। তিনিও জানান একসময়ের জাকজমকপূর্ণ হালখাতা উৎসব গত এক দশকে ধারাবাহিকভাবে জৌলুস হারিয়েছে। বছরের প্রথম দিন হিসাবে আগে যে রকম আনন্দ হতো তা এখন আর হয় না বলে জানান দোকান কর্মচারীরা।
মুঘল সম্রাট আকবরের শাসনামলে বাংলা ক্যালেন্ডার প্রবর্তনের পর থেকে বৈশাখ মাসের প্রথম দিন বাংলার ব্যবসায়ীরা নতুন খাতা বা হালখাতা খোলার প্রথা চালু করেন। যা ৪শ বছরের বেশি সময় ধরে প্রচলিত আছে।
আরও পড়ুন:
বছরের প্রথম দিনে ব্যবসায়ীরা খদ্দেরদের সঙ্গে বিগত বছরের খাতায় তাদের দেনা-পাওনার হিসাব চুকিয়ে এ দিন হিসাবের নতুন খাতা খোলেন। এ উপলক্ষে ব্যবসায়ীরা তাদের খদ্দেরদের মিষ্টিমুখ করান, খদ্দেররাও তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী পুরোনো দেনা শোধ করেন।
ব্যবসায়ী একজন বলেন, ‘এখন আর আগের মতো হালখাতার গুরুত্ব নেই। আর কেউ আসেও না। যারাও আসে তারাও অতি প্রয়োজনে আসে।’
একটা সময় হালখাতার দিন এসব দোকানগুলো মুখর থাকতো ক্রেতাদের পদচারণায়। বাহারি সাজে সাজতো দোকান, মিস্টি ভর্তি হাড়ি থাকতো দোকানের কোনায়, আর লাল খাতায় চলতো নতুন বছরের দেনা-পাওনার হিসাব। তবে আজকাল এসব দৃশ্য হারিয়েছে স্মৃতির পাতায়। উৎসবহীন দোকানে হালখাতা এখন কেবলই নিয়ম রক্ষার উৎসব।
হালখাতার সাথে আকর্ষণ হারিয়েছে উৎসবের অন্যতম অনুষঙ্গ লালসালু মোড়ানো ঐতিহ্যবাহী লাল খাতাও। একসময়ে ব্যাপক চাহিদা থাকলেও সময়ের পরিক্রমায় অনেকেই ব্যবসার হিসাব রাখতে বেছে নিয়েছেন ডিজিটাল মাধ্যম। শহর থেকে গ্রাম সবখানেই লাল মলাটের সেই প্রাচীন আভিজাত্য এখন অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে সামিল। হালখাতা আমাদের ঐতিহ্য বহন করে। হালখাতা ছাড়া চলবে না বলে জানান ব্যবসায়ীরা।
হালখাতা ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবার পথে। তবে ঐতিহ্য ধরে রাখতে আহ্বান জানালেন পুরান ঢাকার ব্যবসায়ীরা।





