১৯৭৭ থেকে ২০২৬: বাবার পথ ধরে ছেলের উদ্যোগ

তারেক রহমান ও জিয়াউর রহমানের খান খনন কর্মসূচি
তারেক রহমান ও জিয়াউর রহমানের খান খনন কর্মসূচি | ছবি: এখন টিভি
1

বাংলাদেশের গ্রামীণ উন্নয়ন, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও পানি ব্যবস্থাপনার এক ঐতিহাসিক উদ্যোগ ছিলো প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের খাল খনন কর্মসূচি। ১৯৭৭ সালে শুরু হওয়া এ কর্মসূচির লক্ষ্য ছিল বর্ষার অতিরিক্ত পানি সংরক্ষণ, শুষ্ক মৌসুমে কৃষিজমিতে সেচ নিশ্চিত করা এবং খালপথকে ব্যবহার করে যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটানো। সময়ের সঙ্গে এই উদ্যোগকে মানুষ ‘জিয়া মডেল’ হিসেবে আখ্যা দেয়।

প্রায় পাঁচ দশক পর আবারও সেই উদ্যোগ নতুন করে সামনে এলো। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ছেলে ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ১৬ মার্চ, ২০২৬ দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার বলরামপুর সাহাপাড়ায় ‘সাহাপাড়া খাল’ খননের মাধ্যমে সারা দেশে খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। অনেকের মতে, এটি মূলত বাবার দেখানো পথেই ছেলের নতুন যাত্রা।

জিয়াউর রহমানের সময় খাল খনন কর্মসূচি পরিচালিত হয়েছিল ‘কাজের বিনিময়ে খাদ্য’ কর্মসূচির মাধ্যমে। এতে গ্রামীণ মানুষ খাদ্য বা প্রয়োজনীয় সামগ্রীর বিনিময়ে খাল খননের কাজে অংশ নিতেন। ফলে একদিকে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়, অন্যদিকে স্থানীয় জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড এগিয়ে যায়।

এ উদ্যোগ শুধু পানি ব্যবস্থাপনা নয়, বরং গ্রামীণ অর্থনীতি ও সামাজিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অনেক গবেষক একে আধুনিক কমিউনিটি-ভিত্তিক উন্নয়ন মডেলের একটি সফল উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন।

১৯৭৭ থেকে ১৯৮১ সালের মধ্যে এ কর্মসূচির আওতায় ২৭৯টি প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় দেড় হাজার খাল খনন বা পুনঃখনন করা হয়। এসব খালের মোট দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ৩ হাজার ৬৩৬ মাইল। এর মাধ্যমে লক্ষাধিক একর কৃষিজমি সেচের আওতায় আসে এবং কৃষি উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ উদ্যোগ বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ স্বনির্ভরতার ভিত্তি শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

আরও পড়ুন:

জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর ধীরে ধীরে খাল খনন কর্মসূচি বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে দেশের অনেক অঞ্চলে পানি ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উত্তরাঞ্চলের বরেন্দ্র অঞ্চল, মধ্যাঞ্চল এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে খাল ও নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হওয়ায় একদিকে শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট বাড়ছে, অন্যদিকে বর্ষাকালে বন্যা পরিস্থিতি আরও তীব্র হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে ২০২৪ সালে ফেনীর দীর্ঘস্থায়ী বন্যার পেছনে নিষ্কাশন ব্যবস্থার দুর্বলতাকে অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৮০ সালে উত্তরাঞ্চলে পানি-নিরাপত্তার ঝুঁকি ছিলো মাত্র ০.০২ শতাংশ, যা ২০২১ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ১৭.০৮ শতাংশে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৬ সালে এটি ৩০.৪২ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে, বিশেষ করে খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট এলাকায় লবণাক্ততার মাত্রাও বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নদী ও খালের স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় থাকলে মিঠা পানির সংরক্ষণ সহজ হতো এবং লবণাক্ততার বিস্তার অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতো।

বর্তমান সরকার জানিয়েছে, প্রথম ধাপে আগামী ছয় মাসে প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার নদী, নালা ও খাল খনন করা হবে। পর্যায়ক্রমে পাঁচ বছরের মধ্যে সারা দেশে মোট ২০ হাজার কিলোমিটার খাল ও নদী খননের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলে পানি ব্যবস্থাপনা উন্নত হবে, কৃষিকাজে সেচের সুযোগ বাড়বে এবং সুপেয় পানির সংকট অনেকটাই কমে আসবে। একই সঙ্গে গ্রামীণ অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

বাবা জিয়াউর রহমানের পথ ধরে ছেলে তারেক রহমানের এ উদ্যোগ আবারও ‘জিয়া মডেল’কে নতুনভাবে আলোচনায় নিয়ে এসেছে।

এনএইচ