হারমোনিয়ামের ওপর জমা এই ধুলোই বলে দিচ্ছে চিরচেনা ছন্দের এখন আর দেখা মিলে না জেসমিন বেগমের এই ঘরে।
ঘরের বাজার থেকে শুরু করে দুই মেয়ের পড়াশোনা, তাদের দেখভাল সব দায়িত্বই নিয়ে নিয়েছেন তার কাঁধে। খরচ কমাতে বড় বাসা ছেড়ে উঠেছেন এই এক রুমের টিনশেড ঘরে।
২৭ বছরের সংসারে নানা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সহ্য করে সম্প্রতি সন্তানদের নিয়ে আলাদা আছেন জেসমিন, স্বামীর থেকে কোন ভরণপোষণ না পেলেও এখনো সংসারের ইতি টানেনি জেসমিন বেগম কিন্তু কেন?
জেসমিন বেগম বলেন, ‘বিয়ের পর থেকেই আমাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে অত্যাচার করতো। এখন এগুলো আরও বেশি হয়ে গেছে। এগুলো সহ্য করতে করতে এখন আর পারছি না। মেয়েদের কথা চিন্তা করে এখনো ডিভোর্স দিই নি।’
জেসমিন বেগমের মতো অনেক নারীই বিয়েকে একমাত্র নিরাপত্তা হিসেবে মনে করেন। এছাড়া সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, সন্তানের ভবিষ্যৎ, পারিবারিক সম্মান রক্ষায় দিনের পর দিন মুখ বুঝে নানা অত্যাচার নির্যাতন মুখে বুঝে সহ্য করেও একটা মৃত সম্পর্ক বয়ে বেড়াতে দেখা যায় নারীদের।
এ বিষয়ে বিভিন্ন পেশার কয়েকজন নারীর সঙ্গে আলাপকালে তারা জানান, অভিভাবকহীন নারীকে আসলে কেউ পছন্দ করছে না। তাদের প্রতি দৃষ্টিকটু একটা মনোভাব পোষণ করছে। নেতিবাচক পরিস্থিতি হলেও অনেকসময় মেয়েরা ভাবে যে মানিয়ে নিবে। কিন্তু তাতে পরিস্থিতি ঠিক না হয়ে সেটা বরং নারীদের আরও দাবিয়ে রাখে।
শুধু বিবাহিত নয় কেউ বিয়ে ছাড়া থাকতে চাওয়াটাকে সমাজে দৃষ্টিকটু হিসেবে দেখা হয়। শুধু তাই নয় বর্তমানে নারীরা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হলেও বেশিরভাগই মানিয়ে নেয়ার এই মানসিকতা থেকে এখনো বের হতে পারেননি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপ অনুযায়ী দেশের ৭০ শতাংশ নারী স্বামীর দ্বারা নির্যাতিত। যারা সহিংসতার শিকার হন মাত্র ৭ দশমিক ৪ শতাংশ নারী আইনের আশ্রয় নেন আর বাকি ৯৩ দশদিক ৬ শতাংশ নারী এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপই নেন না। নির্যাতন প্রতিরোধ আইন অনুযায়ী নারী নির্যাতন সংক্রান্ত কোন মামলা দায়ের করা হলে পুলিশ কর্তৃপক্ষ বিনা ওয়ারেন্টে আসামিকে গ্রেফতার করতে পারে তবে সামাজিক প্রতিবন্ধকতা এবং পরিবারের কথা চিন্তা করে অনেক নারীই আইনি সহায়তা নেন না বলে জানান আইন বিশেষজ্ঞরা।
আরও পড়ুন:
আইনজীবী রাশিদা চৌধুরী নিলু বলেন, ‘পারিবারিক সহিংসতা আইন, পেনালকোডের আন্ডারেও আপনি যদি কাউকে আত্মহত্যার প্ররোচনা করেন, কিংবা কাউকে শারীরিক বা মানসিকভাবে আঘাত করেন প্রতিটা জিনিসের জন্য খুবই স্পেসিফিক আইন রয়েছে।আমাদের নারীরা এখন নিজের অধিকার সম্পর্কে যত না সচেতন সমাজের কিছু প্রতিবন্ধকতা তাকে ততটাই পিছিয়ে দিচ্ছে।’
সমাজ বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে পারিবারিক সহিংসতা মোকাবিলা করার জন্য কোন কার্যকরী কাঠামো না থাকায় নারীদের সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত হচ্ছে না।
সমাজ বিশ্লেষক ড. নাসরীন খন্দকার বলেন, ‘বৈবাহিক ব্যবস্থার মধ্যে মেয়েদের কোনো সিকিউরিটি নেই। বৈবাহিক ব্যবস্থার বাইরেও নারীদের জন্য কোনো সিকিউরিটি নেই। একটা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার মধ্যে আমাদের আনতে হবে যে একটু মেয়ে বিয়ের মধ্যে বা বিয়ের বাইরে যেকোনো ক্ষেত্রেই অন্তরঙ্গ সঙ্গী দ্বারা আক্রান্ত হলে বা নিপীড়িত হলে রাষ্ট্র তাকে একটা সহায়তা দেবে।’
নারীদের স্বতন্ত্রতা এবং আত্মবিশ্বাস তৈরিতে নিজস্ব নেটওয়ার্ক এবং অপশন তৈরি করার পরামর্শ সমাজ বিশ্লেষকদের।





