নির্বাচন ঘিরে বডি ক্যামেরা সংকট; দায়িত্বে থেকেও বন্ধ অনেকের ক্যামেরা

পুলিশের বডি ক্যামেরা
পুলিশের বডি ক্যামেরা | ছবি: এখন টিভি
2

৪২ হাজার ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তায় ৪০ হাজার বডি ক্যামেরা কিনতে সরকার অনুমোদন দিলেও কয়েক দফায় কমেছে বরাদ্দ। অবশেষে সিদ্ধান্ত হয় নির্বাচনে ২৫ হাজার বডি ক্যামেরা ব্যবহার করবে পুলিশ। এর মধ্যে ১৫ হাজার ক্যামেরা অনলাইনে সরাসরি নজরদারি করা যাবে, বাকিগুলো অফলাইন। এদিকে পরীক্ষামূলক ব্যবহার শুরু হলেও দায়িত্বরত অবস্থায় ক্যামেরা বন্ধ রাখছেন অনেকেই।

প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বদলে যাচ্ছে অপরাধ দমনের কৌশল। মাঠ পর্যায়ে কর্মযজ্ঞের নিখুঁত তথ্য যাচাইয়ে আধুনিক সংস্করণ অনলাইন বডি ওন ক্যামেরা। এতে সংশ্লিষ্ট থানা বা কেন্দ্র থেকেই সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা যায়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত পুলিশ বা অপরাধীর অবস্থান। এ প্রযুক্তি পুলিশ সদস্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিতের পাশাপাশি অপরাধ দমনের মতো ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতেও নিরাপত্তার হাতিয়ার।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট ডাকাতি, কেন্দ্র দখল কিংবা সহিংসতা রোধে ভূমিকা রাখবে এ অত্যাধুনিক যন্ত্র। নির্বাচনের দিন ২৫ হাজার পুলিশ সদস্যের কাছে এ ক্যামেরা থাকবে। যদিও সারা দেশে ভোট কেন্দ্র ৪২ হাজার ৭০০। অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক কেন্দ্রেই থাকছে না একটিও বডি ক্যামেরা। তাই ডিজিটাল নিরাপত্তা ও নজরদারির আওতায় আসছে না বেশিরভাগ ভোট কেন্দ্র।

সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষ্যে গত বছরের আগস্টে ৪০ হাজার বডি ক্যামেরা কেনার নির্দেশ দেন প্রধান উপদেষ্টা। সেপ্টেম্বরে ক্রয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে ইউএনডিপির মাধ্যমে ৪০ হাজার বডি ক্যামেরা কেনার অনুমোদন দেয়ার কথা জানান অর্থ উপদেষ্টা। তবে হঠাৎ আটকে যায় বরাদ্দ। ১৮ নভেম্বরে ক্রয় কমিটির বৈঠক শেষে অর্থ উপদেষ্টা জানান, পুলিশের চাহিদার আলোকে ঝুঁকিপূর্ণ আসনেই কেবল বডি ক্যামেরা দেয়া হবে। পরে প্রায় ২০ হাজার নতুন ক্যামেরা কেনে সরকার। আগের ৫ হাজারসহ মোট ২৫ হাজার ক্যামেরার মধ্যে অনলাইন ১৫ হাজার, বাকিগুলো অফলাইন।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দেয়া তথ্য অনুযায়ী সারা দেশে ২৫ হাজার ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্র। এর মধ্যে ঢাকা মহানগরে ২ হাজার ১০০ কেন্দ্র। যার ১ হাজার ৮০০টি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে বডি ক্যামেরা থাকবে। এছাড়া জেলাভিত্তিক গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, ফরিদপুর ও শরিয়তপুরের সবচেয়ে বেশি বডি ক্যামেরা ব্যবহার হবে। সবচেয়ে কম ক্যামেরা থাকবে ঝালকাঠি জেলায়।

আরও পড়ুন:

ডিএমপি মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্সের উপ-পুলিশ কমিশনার তালেবুর রহমান বলেন, ‘যেখানে যেমন লজিস্টিকস ব্যবহার করা প্রয়োজন বা সমীচীন মনে করবো, জনগণের বৃহত্তর স্বার্থে নিরাপত্তার স্বার্থে আমরা সেখানে তাই ব্যবহার করবো।’

নাগরিক কোয়ালিশনের সহ-সমন্বয়ক ফাহিম মাশরুর বলেন, ‘গত বেশ কয়েক মাস দেখেছি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে একধরনের সমন্বয়হীনতার। অনেক কিছু আমরা এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হতে পারছি না যে যেগুলো হওয়া উচিত ছিলো একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য, সহিংসমুক্ত নির্বাচনের জন্য, সে বিষয়ে আমরা নাগরিকরা দিন দিন আরও বেশি সন্দিহান হয়ে যাচ্ছি।’

রাজনৈতিক বিশ্লেষক দিলারা চৌধুরী বলেন, ‘বাংলাদেশে আমি মনে করি সিংহভাগ আসনই ঝুঁকিপূর্ণ। আলামতগুলো খুব একটা সুবিধাজনক নয় বলে আমার ধারণা হচ্ছে। সুষ্ঠু নির্বাচন যদি করতে চায় তাহলে এমন ব্যবহার করতে হবে, মানুষ আস্থা যেন রাখতে পারে নির্বাচন কমিশনের ওপর।’

তবে বাকি সাধারণ কেন্দ্রগুলোতেও ঝুঁকির আশঙ্কা আছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। সবগুলো কেন্দ্রকে নজরদারির আওতায় আনার তাগিদ তাদের।

এরইমধ্যে প্রযুক্তি জ্ঞান ও দক্ষতা উন্নয়নে বডি ক্যামেরা প্রশিক্ষণ নিয়েছেন পুলিশ সদস্যরা। দেড় সপ্তাহ ধরে পরীক্ষামূলক ব্যবহার শুরু হয়েছে। তবে দায়িত্বরত অবস্থায় থাকলেও ক্যামেরা বন্ধ রাখছেন অনেকে। পাশাপাশি নেটওয়ার্ক জটিলতা এবং দীর্ঘসময় ব্যাটারি সক্ষমতা নিয়ে এখনো চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।

পুলিশ সদস্যদের একজন বলেন, ‘অনলাইন ক্যামেরার মাধ্যমে ইনস্ট্যান্ট আমার কন্ট্রোল; নির্বাচন কমিশন, পুলিশ হেড কোয়াটার তারা সরাসরি তদারকি করতে পারবে।’

কন্ট্রোল রুমে থাকে এমন একজন বলেন, ‘অনলাইন প্রযুক্তি হওয়ার কারণে অনেকসময় ভিডিও ঝাপসা আসে। ব্যাটারি ব্যাকআপের জন্য দুটি ব্যাটারি রাখা হচ্ছে।’

২০১৫ সাল থেকে ট্রাফিক পুলিশের মাধ্যমে বডি ক্যামেরার ব্যবহার শুরু হয়। তবে অভিযোগ ওঠে, অসৎ উদ্দেশ্যে অনেকে নিদিষ্ট কিছু সময় বডি ক্যামেরা বন্ধ রাখেন। তাই জনগণের আমানত, ভোটের নিরাপত্তা নিশ্চিতে পুলিশ সদস্যদের সততা ও দক্ষতার পরিচয় দেয়ার আহ্বান সর্বস্তরের মানুষের।

এফএস