যুদ্ধের ৮ সপ্তাহ পরও অমীমাংসিত সংঘাত; জয় পায়নি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র কেউই

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পতাকা
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পতাকা | ছবি: সংগৃহীত
0

সংঘাত শুরুর পর ৮ সপ্তাহ কেটে গেলেও এখনও পর্যন্ত জয়ী হতে পারেনি ইরান কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের কোনো পক্ষই। সংঘাতের লক্ষ্য, পরিবর্তিত পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক ধাক্কা, নাগরিক নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক সাফল্য বিচার করে এমন বিশ্লেষণ হাজির করেছে সিএনএন। যদিও বিশ্লেষকদের দাবি, শত্রুপক্ষের বিরুদ্ধে কল্পনাতীত প্রতিরোধ গড়ে তুলে অর্জনের পাল্লা ভারী করেছে ইরান। পাল্লা দিয়ে ইরান যুদ্ধের সুবিধা নিয়ে যাচ্ছে চীন ও রাশিয়া।

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর মুহূর্তেও ট্রাম্প আত্মবিশ্বাসী ছিলেন, অনায়াসেই ধসিয়ে দেবেন ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ভিত। সংঘাত চলাকালে বহুবার দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করেছে। আর শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্রকে পরোয়া না করা ইরানের দাবি, এ যুদ্ধে ধরাশায়ী যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু ২ মাস পর এসে দেখা যাচ্ছে, প্রকৃতপক্ষে এ সংঘাতে এগিয়ে নেই কোনো পক্ষই।

ব্রুকিংস ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো মেলানি সিসন সিএনএনকে জানিয়েছেন, ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্র লক্ষ্যপূরণে ব্যর্থ হলেও যুদ্ধের প্রভাব মোকাবিলার ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে আছে কোনো কোনো দেশ। আর ক্ষয়ক্ষতির কেন্দ্রবিন্দুতে যখন ইরান, তখন লাভ-ক্ষতির খতিয়ানের চেয়ে প্রতিরোধ সক্ষমতাই এ সংঘাতে তাদের গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। সিএনএনের এ বিশ্লেষণে গুরুত্ব পেয়েছে লেবানন আর উপসাগরীয় দেশগুলোর দৃষ্টিকোণও।

আরও পড়ুন

সিএনএনের বিশ্লেষণ বলছে, যুদ্ধের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের জীবনে। বেসামরিক স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াও ২ মাসের এ যুদ্ধে প্রাণ গেছে সাড়ে ৩ হাজারেরও বেশি মানুষের। শত্রুপক্ষের সঙ্গে হাত মেলানোয় মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে ৬ শতাধিক মানুষকে। ২ মার্চের পর থেকে ইসরাইল-হিজবুল্লাহ সংঘাতে মারা গেছেন আড়াই হাজারেরও বেশি লেবানিজ। ঘরছাড়া ৬ লাখের বেশি মানুষ। আর ব্যাপক প্রাণহানি না হলেও উপসাগরীয় দেশগুলোর কয়েক দশকের স্থিতিশীলতা এবং সমৃদ্ধি প্রশ্নের মুখে।

বাঙ্কারে লুকিয়ে প্রাণে বাঁচলেও নিরাপদে নেই ইসরাইলিরা। আর ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বুলেট-বোমা এড়াতে পারলেও গ্যাসোলিন আর বিমানের টিকিট কিনতে গিয়ে পকেট ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে মার্কিনিদের।

আইএমএফের প্রত্যাশা ছিলো, বিশ্বব্যাপী মুদ্রাস্ফীতি ৪ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কমে চলতি বছর ৩ দশমিক ৮ শতাংশ নেমে আসবে। কিন্তু বর্তমানে এ হার ৪ দশমিক ৪ শতাংশের কাছাকাছি। দেখা যাচ্ছে বৈশ্বিকভাবে ইরান যুদ্ধের সরাসরি প্রভাব পড়েছে জ্বালানি আর খাদ্যপণ্যের বাজারে। তাই দ্রব্যমূল্যের কাছে সাধারণ মানুষ যে প্রতিদিনই হেরে যাচ্ছেন, এ নিয়ে কোনো দ্বিধার অবকাশ নেই।

এদিকে, আয়াতুল্লাহ খামেনিকে হত্যা করে ট্রাম্পের ইরানের শাসনব্যবস্থা গুড়িয়ে দেয়ার আকাঙ্ক্ষা মারা গেছে। উল্টো সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যু আরও একাট্টা করেছে ইরানিদের। বিপরীতে যুদ্ধ শুরুর জন্য মার্কিন আইনপ্রণেতা ও সাধারণ মানুষের ভর্ৎসনা শুনতে হচ্ছে ট্রাম্পকে।

এখন প্রশ্ন ওঠে ৮ সপ্তাহের এ সংঘাতে লাভ হলো কার? বিশ্বের বৃহত্তম জ্বালানি আমদানিকারক দেশ চীন মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হলেও কয়লা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে জোর দিয়েছে চীন। জ্বালানি সংকটের জেরে বাড়ছে চীনা সোলার প্যানেল এবং উইন্ড টারবাইনের চাহিদা। আর উসকানি ছাড়া যুদ্ধ শুরুর জন্য ওয়াশিংটনের যে দুর্নাম ছড়িয়েছে, সেই সুবিধা নিয়ে ভূরাজনীতিতে আরও শক্তিশালী অবস্থানে উঠে আসতে পারে বেইজিং।

এছাড়াও রুশ অপরিশোধিত তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং সারের উচ্চমূল্যের কারণে লাভের গুড় খাচ্ছে রাশিয়া। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা চলতি সপ্তাহের শুরুতে জানিয়েছে, ফেব্রুয়ারির তুলনায় মার্চে জ্বালানি রপ্তানি করে দ্বিগুণ আয় করেছে রাশিয়া। ৯ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার ছাপিয়ে একমাসে ক্রেমলিনের আয় ১৯ বিলিয়ন ডলারে।

আর, যুদ্ধের চিরায়ত সমীকরণ অনুযায়ী, গত ৮ সপ্তাহে সমরাস্ত্র ও যুদ্ধ প্রযুক্তি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর আয় এবং সাফল্যও কোনোটাই এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

জেআর