‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনে’ নাবিকদের দুর্দশা; পেন্টাগনের কাছে কৈফিয়ত চান মার্কিন আইনপ্রণেতারা

মার্কিন বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন
মার্কিন বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন | ছবি: সংগৃহীত
0

মার্কিন বিমানবাহী রণতরি ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনে’ ২৫০ দিনের বেশি সময় ধরে অবস্থানরত হাজার হাজার সেনা সদস্য খাদ্য সংকট, ভাঙা পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা ও চরম ক্লান্তির সঙ্গে লড়াই করছেন। এই খবর সামনে আসার পর মার্কিন আইনপ্রণেতারা পেন্টাগনের কাছে কৈফিয়ত চেয়েছেন এবং ইরান যুদ্ধ ইস্যুতে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর চাপ প্রয়োগ শুরু করেছেন। বিবিসির প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

সামরিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের’ কিছু নাবিক জাহাজ থেকে সাগরে ঝাঁপিয়ে পড়ার চেষ্টা করেছেন। এ ছাড়া জাহাজের নাবিকদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে তাদের পরিবার। বৃহস্পতিবার প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ অবশ্য জাহাজের পরিস্থিতি সম্পর্কে আসা প্রতিবেদনগুলোকে ‘সম্পূর্ণ অসত্য উপস্থাপন’ বলে অভিহিত করেছেন।

গত নভেম্বরে ক্যালিফোর্নিয়া থেকে রওনা হয়ে দক্ষিণ চীন সাগরের উদ্দেশে যাত্রা করেছিল রণতরিটি। এরপর ফেব্রুয়ারিতে ইরানে হামলার আগে সেটিকে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হয়। এই মিশনের মেয়াদ প্রথমে গত মে মাসে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও পরে তা বারবার বাড়ানো হয়েছে। রণতরিটির ফেরার কোনো তারিখ ঘোষণা না করা হলেও বৃহস্পতিবার একাধিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, আগে থেকে নির্ধারিত রোটেশন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের’ জায়গায় ‘ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন’ পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।

আইনপ্রণেতাদের কড়া প্রশ্ন
বর্তমানে প্রায় ৫ হাজার সেনা সদস্য বসবাস করা রণতরিটির দুর্দশার তালিকা তুলে ধরে প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথকে একটি চিঠি লিখেছেন কানেটিকাটের সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেনথাল।

আর্মড সার্ভিসেস কমিটির সদস্য এই ডেমোক্র্যাট সিনেটর তার চিঠিতে লেখেন, ‘জরুরি সরবরাহের ঘাটতি, পানি দূষণ, পয়ঃনিষ্কাশনের সমস্যা, মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি, ডেকের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং মেইল ব্যবস্থায় বিঘ্ন—যার কারণে জাহাজের উদ্দেশে পাঠানো বহু কেয়ার প্যাকেজ কয়েক মাস ধরে হারিয়ে গেছে।’

তিনি আরও লেখেন, ‘এই প্রতিবেদনগুলোর জরুরি ভিত্তিতে সুরাহা প্রয়োজন। তবে এগুলো আরও বড় একটি প্রশ্ন সামনে এনেছে—নৌবাহিনী কি বর্তমানে তার বিমানবাহী রণতরিগুলোর ওপর যে চাপ পড়ছে সেই গতি ধরে রাখতে পারবে?’ আরেক ডেমোক্র্যাট সিনেটর রুবেন গ্যালেগো জাহাজ পরিদর্শনে যেতে দেয়ার এবং এই ‘ভয়াবহ পরিস্থিতির’ ব্যাপারে তদন্ত করার জন্য একটি কংগ্রেসনাল প্রতিনিধিদলকে অনুমতি দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এক্সে দেয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রবেশাধিকার অস্বীকার করার কোনো কারণ নেই।’

বিবিসির মার্কিন সহযোগী সিবিএস নিউজ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুই কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানিয়েছে, চলতি মাসের শুরুতে এক নাবিক জাহাজ থেকে সাগরে পড়ে যান। পরে হেলিকপ্টার দিয়ে তাকে উদ্ধার করে চিকিৎসা বিভাগে চিকিৎসা দেয়া হয় এবং আরও উন্নত চিকিৎসার জন্য জাহাজ থেকে সরিয়ে নেয়া হয়। এই ঘটনার পরিস্থিতি তদন্তাধীন রয়েছে।

মানসিক ও শারীরিক দুর্দশা
‘দ্য মিলিটারি টাইমস’ ও ‘স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস’ চলতি সপ্তাহের শুরুতে জানিয়েছিল, একাধিক সেনা সদস্যের পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা জাহাজ থেকে ঝাঁপ দেয়ার কথা ভেবেছেন। পরিবারগুলোর মতে, দীর্ঘ সময় সমুদ্রে থাকার প্রভাব এবং জাহাজের ভেতরের পরিস্থিতি কিছু সদস্যের মানসিক স্বাস্থ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এই পরিস্থিতির মধ্যে সপ্তাহের বেশি সময় পোশাক ধুতে না পারা এবং বন্দরে অনিয়মিত যাওয়ার কারণে তাজা খাবার না পাওয়ার মতো বিষয়গুলোও রয়েছে। কারণ, বন্দরে গেলেও সেনা সদস্যদের সব সময় জাহাজ ছাড়ার অনুমতি দেয়া হয় না।

জাহাজে থাকা এক নাবিকের এক আত্মীয় বিবিসি নিউজকে জানিয়েছেন, ওই নাবিক মিশন শুরুর পর থেকে ২৯ কেজি ওজন হারিয়েছেন। প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থার আশঙ্কায় নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই ব্যক্তি জানান, তার আত্মীয়ও নিশ্চিত করেছেন যে নাবিকরা জাহাজ থেকে ঝাঁপ দেয়ার চেষ্টা করেছেন। হোয়াটসঅ্যাপে সাম্প্রতিক কথোপকথনে ওই নাবিক লিখেছেন, ‘আমি মৃতপ্রায় ক্লান্ত। মৃতপ্রায়।’ জাহাজের ইঞ্জিন এবং বিমান ওঠানামার কারণে অবিরাম শব্দ ও কম্পন সহ্য করার কথাও তিনি জানান।

ওই নাবিকের আত্মীয় বলেন, ‘সে মিশনটা জানে এবং সে জানে যে এটি আদর্শ পরিস্থিতি হবে না। এটি কোনো ছুটির ভ্রমণ নয়। এবং সে জানে তাকে কী করতে হবে। কিন্তু কোনো বন্দর ছাড়া, স্থলে পা ফেলা ছাড়া, কোনো ধরনের হালকা হওয়া ছাড়া এটি অবিরাম কম্পন—সকালে, দুপুরে, রাতে; ঘুমানোর সময়, খাওয়ার সময়, গোসল করার সময়। মনে এক মুহূর্তের শান্তিও নেই।’

ক্যালিফোর্নিয়ার ডেমোক্র্যাট কংগ্রেসম্যান মাইক লেভিন বলেছেন, ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনে’ ছত্রাকযুক্ত গোসলখানা, ভাঙা টয়লেট, সপ্তাহের পর সপ্তাহ লন্ড্রি বন্ধ, দীর্ঘ সময় গরম পানি নেই, এমনকি এক বেলার খাবার নেমে এসেছে আধা কাপ ভাত ও দুটি টর্টিলায়। সাবান, ডিওডোরেন্ট বা টুথপেস্টও নেই।

নৌবাহিনী ও প্রশাসনের বক্তব্য
এসব প্রতিবেদন সামনে আসার পর মার্কিন নৌবাহিনীর এক কর্মকর্তা বিবিসিকে বলেছেন, জাহাজে আত্মহত্যাচেষ্টা বা আত্মহত্যার চিন্তার প্রবণতা বৃদ্ধির কোনো প্রমাণ তারা পাননি। তবে ‘যুদ্ধ কর্মকাণ্ডের কারণে প্রথাগত সরবরাহ কেন্দ্রগুলোতে বিঘ্ন ঘটেছে’ বলে তিনি স্বীকার করেন। এই মুহূর্তে জাহাজে ‘মিশনের জন্য জরুরি সরবরাহ’ পৌঁছানোকেই অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে। বুধবার ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রথমে খাবার, তারপর হাইজিন সামগ্রী এবং এরপর মেইল। জাহাজ থেকে সর্বশেষ প্রতিবেদন নিশ্চিত করছে যে সেখানে বিশুদ্ধ পানি, সক্রিয় এসি ও স্বাস্থ্যকর খাবার নিয়মিতভাবে পাওয়া যাচ্ছে।’

বৃহস্পতিবার পানামায় সাংবাদিকদের হেগসেথ বলেন, সরকার নিশ্চিত করছে যে ‘প্রতিটি জাহাজ, প্রতিটি ক্রু ও প্রতিটি ক্যাপ্টেন প্রতিটি মুহূর্তে যা কিছু আমরা দিতে পারি তা যেন পায়।’ তিনি বলেন, ‘কিছু মিশন অন্যগুলোর চেয়ে দীর্ঘ হয়। ওই নাবিকদের প্রতি আমার শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা অন্য যেকোনো ব্যক্তির চেয়ে বেশি। তারা কম বন্দর যাত্রার সঙ্গে অস্বাচ্ছন্দ্যকর অবস্থায় গভীর সমুদ্রে যা করে যাচ্ছে, তা অবিশ্বাস্য।’ জাহাজের পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে ট্রাম্পের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস সাংবাদিকদের বলেন, হেগসেথ ও ট্রাম্প উভয়েই যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি যেকোনো হুমকি মোকাবিলার জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের সংস্থান দিয়ে সেনাবাহিনীকে সজ্জিত রাখার ব্যাপারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

সামরিক সংবাদমাধ্যম ‘স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপসের’ বরাত দিয়ে জানা গেছে, অতীতেও দীর্ঘ সময়ের মিশনে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী সেনাদের জন্য বিনোদনের ব্যবস্থা রাখত। এর মধ্যে ছিল বিঙ্গো, চিত্রশিল্পের সেশন ও গানের প্রতিযোগিতা।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ৯৫৬ জন নাবিকের ওপর করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, মার্কিন সেনাবাহিনীর অন্যান্য শাখার তুলনায় নৌবাহিনীর জাহাজে থাকা সেনা সদস্যরা ‘গুরুতর মানসিক চাপে’ সবচেয়ে বেশি ভুগে থাকেন। গবেষণায় ‘বাসযোগ্যতার সমস্যা, শব্দ ও চাপযুক্ত সময়সূচি, যা ঘুম ও বিশ্রামের জন্য পর্যাপ্ত সময় দেয় না’—এই অনন্য ঝুঁকিগুলোর কথা বলা হয়েছে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর তথ্যের ওপর ‘ইউএসএনআই নিউজের’ বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নৌবাহিনী ও মেরিন কোরে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ এখনো আত্মহত্যা। ভেটেরান্স অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের তথ্য বলছে, সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের তুলনায় সেনাবাহিনীতে কাজ করা সাবেক সদস্যদের আত্মহত্যার হার অনেক বেশি।

এএম