ট্রাম্প বলেন, ‘এই তথ্য ফাঁসের ঘটনা নির্বাচনি নিরাপত্তার জন্য নজিরবিহীন এক দুঃস্বপ্ন তৈরি করেছে।’ চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই অভিযোগকে ‘সম্পূর্ণ বানোয়াট’ এবং ‘বিদ্বেষপূর্ণ অপপ্রচার’ বলে অভিহিত করেছে।
শুক্রবার নিয়মিত ব্রিফিংয়ে মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান বলেন, বেইজিংয়ের মার্কিন নির্বাচনে হস্তক্ষেপে কোনো আগ্রহ নেই এবং তারা কখনো এমনটি করেনি। তিনি বলেন, ‘আমরা যুক্তরাষ্ট্রকে আহ্বান জানাই, নিজেদের দিকে গভীরভাবে তাকান এবং চীনের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ তোলা বন্ধ করুন।’ ট্রাম্পের ভাষণের আগে ওয়াশিংটনে চীনা দূতাবাসের মুখপাত্র লিউ চ্যাং বলেন, ‘চীন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কখনো হস্তক্ষেপ করেনি এবং কখনো করবে না।’
সতর্কতার সঙ্গে সাজানো বাণিজ্যিক যুদ্ধবিরতি
শি জিনপিংয়ের সঙ্গে ব্যক্তিগত উষ্ণ সম্পর্কের কথা প্রায়ই বলে থাকেন ট্রাম্প। তবে এবার চীনের কর্মকাণ্ডে তাকে ব্যক্তিগতভাবেই ক্ষুব্ধ মনে হয়েছে। তিনি বলেন, ‘চীনা সরকার চেয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট যেন পরবর্তী নির্বাচনে হেরে যান। আমাকে তারা হারাতে চেয়েছিল, কারণ তারা জানত আমি তাদের সম্পর্কে সব বুঝে গেছি।’
বিরল এই প্রাইমটাইম ভাষণে দেয়া তার এসব মন্তব্য বেইজিংয়ের প্রতি তার সাম্প্রতিক সময়ের সম্মানজনক অবস্থান থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দেয়। ওয়াশিংটন চীনকে তার সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবেই বিবেচনা করে। এই ভাষণ গত বছরের বাণিজ্য যুদ্ধ থামানো সতর্কতার সঙ্গে গড়ে ওঠা যুদ্ধবিরতিকেও নস্যাৎ করে দিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কে এই ভাষণের প্রভাব সম্পর্কে হোয়াইট হাউসের কাছে মন্তব্য চাওয়া হলেও তারা কোনো সাড়া দেয়নি।
২০২৫ সালে চীনের ওপর তিন অঙ্কের শুল্ক আরোপ করার পর গত অক্টোবরে ট্রাম্প তার অবস্থান থেকে সরে আসেন। কারণ, বেইজিং পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে বিরল খনিজ ধাতু রপ্তানি বন্ধ করে দিলে যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদন খাত পঙ্গু হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। গত মে মাসে শি জিনপিং ট্রাম্পকে জাঁকজমকপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সফরে আমন্ত্রণ জানান। ওই সফরে ট্রাম্প তাইওয়ান নিয়ে বিরোধ প্রসঙ্গ এড়িয়ে যান এবং শিকে ‘বন্ধু’ বলে অভিহিত করেন। এরপর ট্রাম্প শিকে আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর ওয়াশিংটন সফরের আমন্ত্রণ জানান। নভেম্বরে চীনের শেনজেনে অনুষ্ঠেয় এশিয়া-প্যাসিফিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা (এপেক) শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করছেন তিনি।
চীন এখনো শি জিনপিংয়ের ওয়াশিংটন সফর নিশ্চিত করেনি। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দুজন জানিয়েছেন, বেইজিং ট্রাম্প প্রশাসনকে গোপনে জানিয়েছে, ভবিষ্যতে দুই নেতার বৈঠক নির্ভর করবে ইতিবাচক সম্পর্ক বজায় রাখার ওপর। তবে বেইজিং সম্ভবত ট্রাম্পের বৃহস্পতিবারের মন্তব্যকে সহজভাবেই নিতে পারে।
নির্বাচন-সংক্রান্ত অভিযোগে ট্রাম্পের অতীত
বেইজিংয়ের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে অবগত একজন জানিয়েছেন, ট্রাম্পের এই ভাষণকে চীনের প্রতি নীতি পরিবর্তনের চেয়ে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, হোয়াইট হাউসের ইস্ট রুম থেকে দেয়া ২৫ মিনিটের এই ভাষণে বেইজিংকে শাস্তি দেয়ার কোনো আহ্বান ছিল না। এটি বেইজিংয়ের প্রতিক্রিয়াকে সংযত রাখতে পারে।
চীন ও নির্বাচনি হস্তক্ষেপ নিয়ে ট্রাম্পের এটি প্রথম অভিযোগ নয়। ২০২০ সালের নির্বাচনে জো বাইডেনের কাছে হেরে যাওয়ার পর সেই নির্বাচনকে তার বিরুদ্ধে ‘জালিয়াতির’ শিকার বলে বারবার দাবি করে আসছেন তিনি। যদিও এই দাবি ইতিমধ্যেই ভুল প্রমাণিত হয়েছে। তবে ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর এক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, চীনসহ কোনো বিদেশি পক্ষ ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ভোটার নিবন্ধন, ব্যালট, গণনা বা ফলাফলসহ কোনো ‘কারিগরি দিক’ পরিবর্তনের চেষ্টা করেছে বা সফল হয়েছে—এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
বৃহস্পতিবারের ভাষণে ট্রাম্প নির্বাচনি নিরাপত্তার দুর্বলতা সম্পর্কে তাকে সতর্ক না করার জন্য অজ্ঞাতনামা ‘ডিপ স্টেট’ আমলাদের দোষারোপ করেন।ভাষণের পর ট্রাম্প প্রশাসন চীনের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। যদিও প্রেসিডেন্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলেছেন।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিরা জানান, গত এক বছরে তার প্রশাসন চীনকে গোপনে সতর্ক করেছে যে, তারা তাদের জাতীয় নিরাপত্তা স্বার্থ রক্ষা করবে এবং এমন পদক্ষেপ নিতে পারে, যা বেইজিং পছন্দ না-ও করতে পারে। তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে হোয়াইট হাউস চীনের বিরুদ্ধে নির্বাহী শাখার সংস্থাগুলোর প্রস্তাবিত পদক্ষেপগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে এবং চীনকে ক্ষুব্ধ করতে পারে এমন কিছু নতুন নীতি নিতে বারণ করেছে বলে ভাষা জানিয়েছেন ওই পদ্ধতি সম্পর্কে অবগত আরেকজন।
হোয়াইট হাউসের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সাবেক জ্যেষ্ঠ পরিচালক (পূর্ব এশিয়া) মিরা র্যাপ-হুপার বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চীনের হস্তক্ষেপের ভুল দাবি ব্যবহার করে কংগ্রেসকে ভোটদানের সুযোগ সীমিত করার আইন পাসের জন্য চাপ দিচ্ছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘তাকে অবশ্যই বিশ্বাস করতে হবে যে, শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তার সম্পর্কের পুনর্মিলন, বিশেষ করে সেপ্টেম্বরে শির ওয়াশিংটন সফর এই সবকিছু এসব অভিযোগ সত্ত্বেও টিকে থাকবে।’





