ফেব্রুয়ারির শেষে মার্কিন-ইসরাইলি হামলায় প্রাণ যায় বাবার। পরের সপ্তাহেই ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা হিসেবে নিযুক্ত হন ছেলে মুজতবা খামেনি। তখন থেকেই ইরানসহ পুরো বিশ্বের কাছে এক রহস্যের প্রতিমূর্তি তিনি।
সাবেক নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জানাজায় বাকি তিন ছেলেকে দেখা গেলেও, শুরু থেকে বিদায়ের পুরো আয়োজনের শেষ পর্যন্ত ছেলে মুজতবার অনুপস্থিতি এতোটাই প্রকট ছিল যে, কোনো ভিডিও বা এমনকি লিখিত বার্তাও দেননি তিনি। ইসলামী প্রজাতন্ত্রের ৪৭ বছরের ইতিহাসে উত্তালতম সময়ে দেশ নিয়ে নেতার পরিকল্পনা কী, কোনো ধারণাই করতে পারছে না সাধারণ মানুষ।
ঊর্ধ্বতন সূত্রের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, হামলায় আহত ৫৬ বছর বয়সী নেতা এতোটাই আহত হয়েছেন যে তার মুখমণ্ডলও বিকৃত হয়ে গেছে। বর্তমানে ভালোর দিকে থাকলেও জনসমক্ষে আসার মতো সুস্থ এখনো হননি; কিন্তু প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন ঠিকই। চলতি সপ্তাহে ইরানে ফের মার্কিন হামলার শুরু হওয়ার পর মুজতবা খামেনির স্বাস্থ্য ও ভূমিকা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে ইরানে।
মুজতবা খামেনির বাকি তিন ভাই জ্যেষ্ঠ ধর্মীয় নেতার আসন পেলেও দেশের রাজনীতিতে খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র তারা নন, কিংবা হওয়ার পথেও নেই। তবে ১৯৭৯ সালের বিপ্লবে ইরানের ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা রুহুল্লাহ খোমেনির নাতি আলি খোমেনি শুক্রবার কথা বলেন মুজতবার পক্ষ থেকে; যার অর্থ দেশের রাজনীতিতে প্রভাবশালী ধর্মগুরুর ধারাবাহিকতা রক্ষায় পরবর্তী নেতা হিসেবে হাল ধরতে পারেন আলি খোমেনি।
তবে গুঞ্জন, মুজতবা খামেনি ফিরবেন। প্রকাশ্যে না এলেও পিতার চিরনিদ্রার সমস্ত আনুষ্ঠানিকতা শেষে প্রকাশ করবেন নতুন ছবি কিংবা রেকর্ড করা বার্তা। নিরাপত্তা ঝুঁকি এড়িয়ে মার্কিন-ইসরাইলি গুপ্তচরদের নজর থেকে বাঁচতে এবং ইরানের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী একজন শক্তিশালী রাজনৈতিক, কৌশলগত, ধর্মীয় ও বিপ্লবী ব্যক্তিত্ব হিসেবে সামনে আসতে হবে বলেই হয়তো সময় নিচ্ছেন তিনি।
সবশেষ ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান গেলো মে মাসে জানান নেতার সাথে দেখা করার এবং তার অবস্থার উন্নতি হওয়ার খবর। আপাতত দেশে কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখছে ইরানের অভিজাত বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী আইআরজিসি। তাও এক ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নেতার এমন দীর্ঘ আত্মগোপন দশায় উদ্বেগ এড়াতে পারছে না সাধারণ মানুষ।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতার ভূমিকা অন্যান্য রাষ্ট্রের প্রধানদের থেকে ভিন্ন, কারণ ইরানের আনুষ্ঠানিক মতাদর্শ অনুযায়ী এই পদাধিকারী হলেন শিয়া ইসলামের দ্বাদশ ইমামের পার্থিব প্রতিনিধি, যিনি নবম শতাব্দীতে অদৃশ্য হয়ে যান। মুজতবা খামেনি এই বিষয়টিকে কীভাবে নেবেন তা স্পষ্ট নয়। প্রথম নেতা, আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি ছিলেন বিপ্লবের ক্যারিশম্যাটিক জনক এবং ইরানের ইতিহাসে সবচেয়ে শ্রদ্ধেয় ধর্মীয় পণ্ডিত। তার উত্তরসূরি, আলি খামেনি, নেতা হিসেবে নিযুক্ত হওয়ার আগে দেশের প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন কখনও বিশেষ কোনো জ্যেষ্ঠ ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে আবির্ভূত হননি।
প্রাথমিকভাবে খোমেনির মতো কর্তৃত্ব না থাকলেও, নেতা হিসেবে ৩৭ বছরের শাসনামলে প্রতিদ্বন্দ্বীদের কৌশলে পরাজিত করা এবং বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর সহযোগিতায় দেশের রাজনীতিতে প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন খামেনি। তার উত্তরসূরি, ইরানের ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের তৃতীয় নেতা মুজতবাও বাবার মতো শক্তিশালী ধর্মীয় বা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নন। বাবার বিশাল দপ্তর আর দেশজুড়ে যোগাযোগ সামলাতেন তিনি। ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন সশস্ত্র বাহিনীর সাথে। ধারণা করা হচ্ছে, তাকে সামনে রেখে শাসনের মূল কলকাঠি নাড়বে আইআরজিসি।





