এক সপ্তাহের নতুন করে সংঘাতের পর শুক্রবার পরিস্থিতি তুলনামূলক শান্ত ছিল। সপ্তাহজুড়ে কাতার ও সৌদি আরবের তিনটি বাণিজ্যিক ট্যাংকারে হামলার ঘটনা ঘটে। এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালায়। পরে উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালায় ইরান। গতকাল (শুক্রবার, ১০ জুলাই) নতুন কোনো হামলার খবর পাওয়া যায়নি। এদিকে ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধে আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীরা কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লেখেন, ‘ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান আমাদের কাছে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করেছে। আমরা তাতে সম্মত হয়েছি। তবে যুক্তরাষ্ট্র তাদের স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি শেষ।’ তবে ট্রাম্পের এ বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান। দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানিয়েছে, তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার অনুরোধ করেনি। তবে কাতারের একজন মধ্যস্থতাকারীকে স্বাগত জানাতে সম্মত হয়েছে।
পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত একটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, উত্তেজনা কমানো এবং হরমুজ প্রণালি নিয়ে আলোচনা করতে শুক্রবার কাতারের প্রতিনিধিরা ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। ট্রাম্প আরও দাবি করেন, তার বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টা চালানো হলে ইরানের ওপর হামলার জন্য তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন।
তিনি লেখেন, ‘এক হাজার ক্ষেপণাস্ত্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং সেগুলোর লক্ষ্য ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান। ইরান সরকার যদি যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্টকে হত্যা বা হত্যার চেষ্টা করে, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে আরও হাজারো ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হবে।’ ট্রাম্প আরও বলেন, প্রয়োজন হলে এক বছরের জন্য, মেয়াদ বাড়ানোর সুযোগ রেখে, ইরানের সব এলাকা সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী প্রস্তুত রয়েছে।
এ সপ্তাহে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালসহ কয়েকটি মার্কিন গণমাধ্যম জানিয়েছে, ইসরাইলের গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী ইরান সম্প্রতি ট্রাম্পকে হত্যার একটি পরিকল্পনা করেছিল। তবে ট্রাম্পের সর্বশেষ মন্তব্যের বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি ইরান। বৃহস্পতিবার ইরানের নিহত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজায় বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেন। সেখানে কিছু মানুষের হাতে ‘উই উইল কিল ট্রাম্প’ লেখা ব্যানার দেখা যায়। যুদ্ধের প্রথম দিন বিমান হামলায় খামেনি নিহত হন।
আজ (শনিবার, ১১ জুলাই) হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা করতে ওমানে পৌঁছেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। আধা-সরকারি তাসনিম সংবাদ সংস্থা এ তথ্য জানিয়েছে। জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তারা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র চাইছে ইরান প্রকাশ্যে ঘোষণা দিক যে তারা হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলা বন্ধ করবে এবং এ নৌপথে কোনো ধরনের টোল ছাড়াই সব রুট উন্মুক্ত থাকবে। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন হতো।
মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষ্য, যুদ্ধ চলাকালে তেহরান কার্যত হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে, যা বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক শক্তির সঙ্গে তাদের মুখোমুখি অবস্থানকে অচলাবস্থায় নিয়ে গেছে। ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ ও তথ্যকেন্দ্রের প্রধান জানিয়েছেন, বুধবার ও বৃহস্পতিবার দেশটির ছয়টি শহরে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় অন্তত ১৭ জন নিহত এবং ১১৫ জন আহত হয়েছেন।
তবে মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা ইতিবাচক ছিল। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের বরাতে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেছেন, ওয়াশিংটন কোনো প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করলে তার ‘পারস্পরিক জবাব’ দেয়া হবে। গত মাসের অন্তর্বর্তী চুক্তির লক্ষ্য ছিল চলমান সংঘাতের অবসানের পথ তৈরি করা। এখন পঞ্চম মাসে গড়ানো এ যুদ্ধে হাজারো মানুষ নিহত হয়েছেন। বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দার শঙ্কা বেড়েছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তারাও এর প্রভাব অনুভব করছেন। কয়েক সপ্তাহ ধরে কমার পর অপরিশোধিত তেলের দাম গত আট সপ্তাহের মধ্যে সবচেয়ে বড় সাপ্তাহিক বৃদ্ধি পেয়েছে।





