নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলায় চীনের নতুন আইনি অস্ত্র; বিপাকে বহুজাতিক কোম্পানি

চীনের সাংহাই শহরের স্কাইলাইনের একাংশ
চীনের সাংহাই শহরের স্কাইলাইনের একাংশ | ছবি: সংগৃহীত
0

বিদেশি নিষেধাজ্ঞা ও রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ মোকাবিলায় নিজেদের সক্ষমতা বাড়াচ্ছে চীন। বেইজিং, ওয়াশিংটন ও ব্রাসেলসের পাল্টাপাল্টি শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মধ্যেই বহুজাতিক কোম্পানিগুলো এখন এই সংঘাতের সরাসরি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে। আল জাজিরার বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

মার্চ থেকে বেইজিং দুটি নতুন বিধিমালা পাস করেছে। এসব বিধিমালার মাধ্যমে চীনের সরবরাহ চেইনের নিরাপত্তা হুমকির মুখে ফেলে বা ‘অনুচিত বহির্ভূত অধিক্ষেত্রের’ আওতায় আরোপিত নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন করে এমন বিদেশি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষমতা বেড়েছে। এখনো খসড়া পর্যায়ে থাকা তৃতীয় একটি আইন অনুযায়ী, ‘দেশটির জাতীয় স্বার্থ বা সামাজিক জনস্বার্থের ক্ষতি করে এমন অবৈধ কাজ’ করলে চীনা কৌঁসুলিরা বিদেশি সংগঠন ও ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করতে পারবেন। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম এই তথ্য জানিয়েছে। চীনের জনস্বার্থ মামলা আইনকে আরও শক্তিশালী করার বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে জুন মাসে এই সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করা হয়।

বহুজাতিক আইনি প্রতিষ্ঠান হোয়াইট অ্যান্ড কেসের হংকংয়ের অংশীদার জেমস সিয়াও বলেন, পরস্পরবিরোধী নিয়মকানুন কীভাবে মানা হবে, তা নিয়ে বিভিন্ন কোম্পানি উদ্বিগ্ন। তিনি আল জাজিরাকে বলেন, ‘কিছু কোম্পানি উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যে এসব ব্যবস্থা তাদের সাধারণ বাণিজ্যিক লেনদেনকে প্রভাবিত করতে পারে। বিশেষ করে যেসব ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলোর সামনে সম্ভাব্য পরস্পরবিরোধী আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র বা ইইউর নিষেধাজ্ঞার নিয়ম অনুযায়ী কোনো কোম্পানিকে হয়তো তার একটি পক্ষের সঙ্গে লেনদেন সীমিত করতে হতে পারে। একই সঙ্গে সেই কোম্পানিকে ভাবতে হবে, এমন পদক্ষেপ নিলে চীনের পাল্টা ব্যবস্থার আওতায় ঝুঁকি তৈরি হবে কি না।’

এপ্রিলে পাস হওয়া স্টেট কাউন্সিল ডিক্রি নম্বর ৮৩৫ অনুযায়ী, যেসব কোম্পানি ‘অনুচিত বহির্ভূত অধিক্ষেত্রের’ আওতায় নেয়া ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করবে, তাদের জরিমানা, ভিসা বাতিল, সম্পদ জব্দ, বিনিয়োগ বিধিনিষেধ এবং চীন থেকে পণ্য আমদানি বা রপ্তানিতে বাধার মুখোমুখি হতে হবে। মার্চে পাস হওয়া স্টেট কাউন্সিল ডিক্রি নম্বর ৮৩৪ অনুযায়ী, ‘চীনের শিল্প বা সরবরাহ চেইন ব্যাহত, দুর্বল বা বৈষম্যমূলক আচরণ’ করলে কোম্পানিগুলো শাস্তির মুখোমুখি হতে পারে।

মার্কিন বহুজাতিক আইনি প্রতিষ্ঠান পল হেস্টিংসের মতে, এসব পরিবর্তন পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা মেনে চলা এবং সরবরাহ চেইনের ঝুঁকি নিরূপণের প্রচেষ্টাকে জটিল করে তুলবে। এতে সেসব কোম্পানি ‘বাড়তি নজরদারির মুখে পড়বে, যাদের ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত বা কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থা বিদেশি বৈষম্যমূলক বা অন্য বিধিনিষেধমূলক ব্যবস্থা বাস্তবায়ন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।’

ইয়েল জ্যাকসন স্কুল অব গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের সিনিয়র ফেলো হ্যানসকম স্মিথ বলেন, এই সম্প্রসারিত বিধিমালাগুলোকে ভবিষ্যতের ইঙ্গিত হিসেবেই দেখা উচিত। তিনি আল জাজিরাকে বলেন, ‘চীনের মতো ‘আইন দিয়ে শাসন’ ব্যবস্থায় বিধিবিধান এক ধরনের সংকেত এবং সবক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ করা হবে না। যাই হোক, এই নতুন ব্যবস্থাগুলো চীনে ব্যবসারত বিদেশি কোম্পানিগুলোর জন্য নিয়ন্ত্রক জটিলতা বাড়িয়ে দেবে।’

চীনের ওয়াশিংটন দূতাবাস এবং ব্রাসেলসের মিশন আল জাজিরার মন্তব্যের অনুরোধে তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেয়নি। চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এর আগে বলেছে, তাদের নিষেধাজ্ঞাবিরোধী আইনগুলো চীনের ‘জাতীয় সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও উন্নয়ন স্বার্থ’ রক্ষা করে এবং ‘চীনা নাগরিক, আইনি সত্তা ও অন্যান্য সংগঠনের বৈধ অধিকার ও স্বার্থ রক্ষা করে।’

বেইজিংভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ট্রিভিয়াম চায়না মার্চ মাসের এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলেছে, বিদেশি কোম্পানিগুলো ‘ক্রমশ মার্কিন পাথর ও চীনা কঠিন স্থানের মধ্যে আটকা পড়বে।’

২০২০ সালে ‘অবিশ্বাসযোগ্য প্রতিষ্ঠানের তালিকা’ চালু করার পর থেকে বিদেশি নিষেধাজ্ঞা ও রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ মোকাবিলায় নিজের অস্ত্রভান্ডার বাড়িয়েছে চীন। জাতীয় নিরাপত্তা হুমকি এবং হংকং ও শিনজিয়াংয়ের মতো স্থানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের প্রেক্ষিতে পশ্চিমা দেশগুলো এসব নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।

যুক্তরাষ্ট্র চীনকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) জন্য ব্যবহৃত উচ্চপ্রযুক্তির সেমিকন্ডাক্টরসহ উন্নত প্রযুক্তির নাগাল পাওয়া থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করছে। এছাড়া চীনা সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে মার্কিন কোম্পানিগুলোর ব্যবসাও সীমিত করেছে ওয়াশিংটন।

চীনের ওপর থেকে ঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রে কম আক্রমণাত্মক হলেও ইইউ শিনজিয়াংয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধকে সমর্থনের অভিযোগে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এই জোট অন্যায্য বাণিজ্য অনুশীলনের অভিযোগে বেশ কয়েকটি চীনা কোম্পানির বিরুদ্ধেও তদন্ত শুরু করেছে।

ট্রিভিয়াম চায়নার একজন পরিচালক ইভান পে আল জাজিরাকে বলেন, ‘২০২০ সালের আগে বেইজিংয়ের কোনো নিষেধাজ্ঞা তালিকা বা প্রতিরোধমূলক আইন প্রণয়ন ছিল না। এর মানে হচ্ছে, তাদের হাতে থাকা একমাত্র প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা ছিল কড়া ভাষায় বিবৃতি ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক বিঘ্ন সৃষ্টি করা। কিন্তু পাল্টা নিষেধাজ্ঞামূলক ব্যবস্থা এখন অনেক বেশি সরাসরি ‘চোখের বদলে চোখ’ প্রতিক্রিয়া দেয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে, যা বেইজিং পছন্দ করে।’

চীনা ‘টিপট’ তেল শোধনাগারগুলোর ইরানি তেল কেনার কারণে যুক্তরাষ্ট্র তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর প্রতিক্রিয়ায় চীনা নাগরিক ও কোম্পানিগুলোকে সেই নিষেধাজ্ঞা মেনে চলা থেকে বিরত রাখতে বেইজিং মে মাসে প্রথমবারের মতো তাদের ২০২১ সালের ‘ব্লকিং আইন’ প্রয়োগ করে।

একই মাসে ইউরোপে সহযোগী প্রতিষ্ঠান থাকা চীনা নিরাপত্তা সরঞ্জাম কোম্পানি নিউকটেকের বিরুদ্ধে ইইউর তদন্তকে ‘অনুচিত বহির্ভূত অধিক্ষেত্রের’ ঘটনা হিসেবে অভিহিত করতে বিচার মন্ত্রণালয় ডিক্রি নম্বর ৮৩৫ প্রয়োগ করে। মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, এই সিদ্ধান্তের আলোকে কোনো সংগঠন বা ব্যক্তি ইইউর এই তদন্তে সহায়তা করতে পারবে না।

এএম