ইরানে সেনা পাঠানোর গোপন প্রস্তুতি, শেষ মুহূর্তে থামালেন ট্রাম্প: সিএনএন

প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি | ছবি: এখন টিভি
0

যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা গত মাসের শেষের দিকে ফ্লোরিডায় ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডের সদর দপ্তরে এক গোপন ও তড়িঘড়ি সফর করেন। সেখানে ইরানে মার্কিন স্থলবাহিনী পাঠিয়ে জোরপূর্বক উচ্চ মাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম জব্দের পরিকল্পনার বিষয়ে তাকে ব্রিফ করা হয়। পরমাণু অস্ত্র তৈরির মূল উপাদান এই ইউরেনিয়াম জব্দের উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ পরিকল্পনাটি শেষ মুহূর্তে স্থগিত করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সংশ্লিষ্ট দুটি সূত্র সিএনএনকে এ তথ্য জানিয়েছে।

সূত্রগুলো জানায়, এই ব্রিফিং এতটাই জরুরি ও সংবেদনশীল ছিল যে, জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইনকে ব্রাসেলসে ন্যাটো কর্মকর্তাদের একটি বৈঠক থেকে তড়িঘড়ি করে আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে ১৯ মে ফ্লোরিডার টাম্পায় ফিরে আসতে হয়। সূত্রমতে, জেনারেল কেইন এই অভিযানের বিকল্পগুলো নিয়ে ট্রাম্পকে ব্রিফ করেন। কিন্তু ইরানিদের কড়া জবাব, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়া এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কায় ট্রাম্প এই সিদ্ধান্তে স্থগিতাদেশ দেন। বিপুল সংখ্যক মার্কিন সেনার প্রাণহানির আশঙ্কা নিয়েও ট্রাম্পের উদ্বেগ ছিল।

ইরানে সেনা পাঠানোর এই আলোচনা এমন এক সময়ে হলো, যখন ট্রাম্প বারবার দাবি করছিলেন যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করা এবং পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে চুক্তির কাছাকাছি পৌঁছেছে। বৃহস্পতিবারও ট্রাম্প জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান খুব শিগগির একটি চুক্তিতে সই করবে। এই পরিকল্পনার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট এক সূত্র জানান, সম্ভাব্য ওই সামরিক অভিযানে ‘প্রচুর ঝুঁকি’ ছিল এবং গত মাসে সামরিক বাহিনীকে সবুজ সংকেত না দেয়ার ট্রাম্পের সিদ্ধান্তটি অবাক করার মতো কিছু ছিল না।

এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা ভেস্তে গেলে এবং যুদ্ধ পুনরায় শুরু হলে তেহরান একটি অর্থনৈতিক ‘পারমাণবিক বিকল্প’ ব্যবহারের ছক কষছে। তিনটি সূত্র জানিয়েছে, ইরানিরা তাদের প্রধান প্রক্সি গোষ্ঠী ইয়েমেনের হুতিদের দিয়ে বাব-আল-মান্দাব প্রণালি বন্ধ করে দেয়ার পরিকল্পনা করছে। লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত এই পানিপথটি বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে চলমান শান্তি আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার আশঙ্কায় ইরান এখনো হুতিদের এই নির্দেশ দেয়া থেকে বিরত রয়েছে।

হোয়াইট হাউসের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা শুক্রবার জানান, ইরান তাদের পরমাণু সরঞ্জাম ধ্বংস ও সরিয়ে নেয়া, পরমাণু কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করা, হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখা এবং সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে অর্থায়ন বন্ধ করতে রাজি হয়েছে। এগুলো পালনের পরই কেবল তাদের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হবে। তবে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের দাবি সম্পূর্ণ ভিন্ন। তারা জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ছাড়বে না ইরান এবং যেকোনো চুক্তির জন্য তাদের আটকে রাখা ২ হাজার ৪০০ কোটি ডলারের তহবিল অবিলম্বে ছেড়ে দিতে হবে।

ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের দখল নেয়া ট্রাম্পের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলেও বিপুল মার্কিন প্রাণহানির আশঙ্কায় তিনি এই পথে এগোতে দ্বিধাগ্রস্ত। ইরানের তেল রপ্তানির প্রধান কেন্দ্র খার্গ দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার মতো আরেকটি সামরিক বিকল্প নিয়েও ট্রাম্প ফক্স নিউজকে বলেছেন, ‘আমি জানি না আমেরিকার এটি সহ্য করার ক্ষমতা আছে কি না।’ প্রায় ৯৭০ পাউন্ডের এই ইউরেনিয়াম মজুত রয়েছে ইসফাহান, নাতাঞ্জ ও ফোরদো পরমাণু স্থাপনার গভীর সুড়ঙ্গের ভেতরে। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) প্রধান রাফায়েল মারিয়ানো গ্রোসি সম্প্রতি সতর্ক করে বলেন, বিদ্যমান এই মজুত দিয়ে ইরান চাইলে ১০টি পর্যন্ত পরমাণু বোমা তৈরি করতে পারে। এছাড়া ইরানের কাছে মজুত থাকা নিম্ন মাত্রার উপাদান দিয়ে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর মতো ‘ডার্টি বোমা’ তৈরি করা সম্ভব।

মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ইউরেনিয়ামের সঠিক অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হলেও তা উদ্ধার করা অত্যন্ত কঠিন। সামরিক কমান্ডারদের মতে, স্পেশাল অপারেশন ফোর্সের জন্য এই অভিযান ‘উচ্চ থেকে চরম’ মাত্রার ঝুঁকিপূর্ণ। এক প্রশাসনিক কর্মকর্তা জানান, এই ইউরেনিয়াম অত্যন্ত দাহ্য ও উদ্বায়ী, তাই এটি সহজে বের করে আনা সম্ভব নয়। এছাড়া সুড়ঙ্গে পাতা ফাঁদ, ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ও কাঁধে বহনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন মার্কিন বাহিনীর জন্য বড় হুমকি হতে পারে।

পেন্টাগনের শীর্ষ কর্মকর্তারা এর আগে সতর্ক করেছিলেন যে, ইরানের বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী সামরিক অভিযান মার্কিন অস্ত্রের মজুত ও সামরিক প্রস্তুতির ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলবে। ইউরেনিয়াম জব্দের এই সামরিক বিকল্প নিয়ে ট্রাম্প বৃহস্পতিবার ওভাল অফিস থেকে মন্তব্য করেন, ‘কেউ এর কাছাকাছিও যাচ্ছে না, কারণ এটি একটি পাহাড়ের নিচে চাপা পড়ে আছে।’

এএম