গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ইরানবিরোধী যুদ্ধ শুরুর পর থেকে যত বেশি সম্ভব সরকারপন্থি রাতের সমাবেশে যোগ দিচ্ছেন বলে জানান মোহসেন। তার মতে, এই মার্কিন ও ইসরাইলবিরোধী সমাবেশগুলো প্রমাণ করছে, দেশের একটি অংশ এই সংঘাতকে রাজনৈতিক লড়াইয়ের চেয়ে জাতীয় অস্তিত্বের প্রশ্ন হিসেবেই দেখছে।
মিডল ইস্ট আইকে তিনি বলেন, ‘আমরা প্রতি রাতেই বাইরে আসি। আমরা চাই তারা বুঝুক, এই ভূখণ্ডে বিদেশিদের আমরা কখনোই ঢুকতে দেব না।’
এই সমাবেশগুলো শুরু হয়েছে মার্চের মাঝামাঝি সময় থেকে। এরপর প্রায় প্রতি রাতেই ইরানের বড় বড় শহরের চত্বরে মানুষ জড়ো হয়ে ইরানি পতাকা ওড়াচ্ছেন এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিরুদ্ধে স্লোগান দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাজপথ দখলে রাখছেন।
দেশব্যাপী ইন্টারনেট বন্ধ এবং পরবর্তী সময়ে আংশিকভাবে চালু হওয়ার পরও এই বিক্ষোভ থেমে থাকেনি। কর্তৃপক্ষ এই সমাবেশগুলোতে নিজেদের সমর্থন গোপন করছে না। বিশেষ করে তেহরানে সমাবেশস্থলের দিকে যাওয়ার রাস্তাগুলো প্রায়ই বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে। প্রতি রাতে পুলিশ মোতায়েন থাকছে। মানুষ আসার আগেই বসানো হচ্ছে মাইক ও মঞ্চ।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম এসব সমাবেশকে ‘স্বতঃস্ফূর্ত গণআন্দোলন’ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছে। তবে সমালোচকেরা ভিন্ন কথা বলছেন। তেহরানের ৩৬ বছর বয়সী বাসিন্দা হেসাম জানান, টেলিভিশনে এসব সমাবেশের ফুটেজ দেখে নিজেও কয়েকটি সমাবেশে গিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমি দেখতে চেয়েছিলাম সেখানে আসলে কী হচ্ছে।’
হেসামের মতে, যারা এসব সমাবেশে যোগ দিচ্ছেন, তাদের অধিকাংশই বিরোধী আন্দোলন দমনে অংশ নেয়া পরিচিত মুখ। তিনি বলেন, ‘তাদের অনেকেই বাসিজ সদস্য, কট্টরপন্থি ধর্মীয় ব্যক্তি কিংবা রেভল্যুশনারি গার্ডের সমর্থক। তারা প্রতি রাতে স্লোগান দিতে দিতে রাস্তায় হাঁটছেন, আর বাকিদের সেই হট্টগোল আর ব্যাঘাত সইতে হচ্ছে।’ হেসামের বিশ্বাস, যদি সরকারবিরোধীদের একই ধরনের প্রকাশ্যে জড়ো হওয়ার সুযোগ দেয়া হতো, তাহলে জনসমাগম আরও অনেক বড় হতো।
তবে এই সমাবেশে যোগ দেয়া সবাই যে রাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ, তা নয়। কিছু ইরানির কাছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে বৃহত্তর যুদ্ধের আশঙ্কা পুরোনো রাজনৈতিক বিভাজনকেই জটিল করে তুলেছে।
তেহরানের ৪১ বছর বয়সী মোনা বছরের পর বছর ধরে সরকারের সমালোচক, বিশেষ করে দেশের অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে। তবে তিনি বলেন, যুদ্ধ অনেকের ভাবনাকেই বদলে দেয়। মোনা বলেন, ‘ঘরের কথা বাইরে নিতে নেই। আমার সঙ্গে অনেকে দ্বিমত পোষণ করতে পারেন, কিন্তু আমি মনে করি, নিজ দেশের মানুষকে কষ্ট দেয়া সরকার আর পুরো দেশকেই ধ্বংস করতে চাওয়া বিদেশি শক্তির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।’
মোনা প্রায় ১০ বার এই সমাবেশে অংশ নিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘বিদেশি শক্তিরা ধ্বংস রেখে চলে যায়। একজন স্বৈরশাসক মানুষের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে, কষ্ট দিতে পারে, কিন্তু দিন শেষে সে ইরানিই। সে কখনোই দেশকে ধ্বংস হতে দিতে চাইবে না।’ তিনি জানান, গাজা, লেবানন বা সিরিয়ার পরিস্থিতি দেখে তার আশপাশের অনেকেই উদ্বিগ্ন।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইরানি কর্মকর্তারা বারবার এই সমাবেশের প্রশংসা করেছেন। গত ৯ এপ্রিল এক বিবৃতিতে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মুজতবা খামেনি সমর্থকদের জনপরিসরে সক্রিয় থাকার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে চলমান আলোচনাকে রাজপথ ছেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে দেখা যাবে না।
তিনি লেখেন, ‘রাজপথে জনগণের উপস্থিতি একটি নতুন মহাকাব্য রচনা করেছে। আলোচনা চলতে পারে, তবে জনগণ যেন না ভাবে যে তাদের রাজপথে উপস্থিত থাকার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে।’ এই বার্তাকে অনেকে ব্যাখ্যা করেছেন যে, পর্দার আড়ালে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ চললেও জনসমর্থন ধরে রাখার প্রচেষ্টা হিসেবে।
পার্লামেন্টের স্পিকার এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনায় ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের ঘালিবাফও সমর্থকদের সমাবেশ চালিয়ে যেতে উৎসাহিত করেছেন। ১১ মার্চ এক্সে দেয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘প্রিয় ইরানি জনগণ, আপনাদের রাজপথে উপস্থিতি শত্রুকে বিভ্রান্ত করেছে। এই নগণ্য সৈনিকের তিনটি অনুরোধ—রাজপথ, রাজপথ, রাজপথ।’
২৫ বছর বয়সী প্রকৌশলবিদ্যার ছাত্র হোসেইন বলেন, কতগুলো রাত তিনি এই সমাবেশে কাটিয়েছেন, তার হিসাব তিনি ভুলে গেছেন। তিনি বলেন, ‘এটা আমাদের দৈনন্দিন রুটিনের অংশ হয়ে গেছে। নওরোজের ছুটিতে যখন তেহরানের বাইরে গিয়েছিলাম, তখনো সেখানে সমাবেশে যোগ দিয়েছি।’ হোসেইনের কাছে এই অংশগ্রহণ একই সঙ্গে জাতীয় ও ধর্মীয় দায়িত্ব। তিনি বলেন, ‘আমরা এখনো যুদ্ধাবস্থায় আছি। কেউ কেউ অঙ্গ হারিয়েছেন, কেউ দেশের জন্য জীবন দিয়েছেন। আমি অস্ত্র চালাতে পারি না, ক্ষেপণাস্ত্র চালাতে পারি না, কিন্তু অন্তত তাদের প্রতি সমর্থন তো দেখাতে পারি।’
তবে অনেকেই এই সমাবেশকে একেবারেই ভিন্নভাবে দেখছেন। মধ্য তেহরানের ৬২ বছর বয়সী বাসিন্দা মাসুদের কথায়, মাসের পর মাস রাতের সমাবেশ আশপাশের মানুষকে ক্লান্ত করে তুলেছে। তিনি বলেন, ‘তারা আমাদের শান্তি কেড়ে নিয়েছে। প্রতি রাতে একই ঘটনা—মাইক, স্লোগান, বন্ধ রাস্তা। একদল মানুষ বাইরে জড়ো হচ্ছে, আর বাকিরা ঘুমাতে পারছে না, স্বাভাবিকভাবে বাঁচতে পারছে না। আমরাও তো মানুষ। আমাদের কি একটু শান্তি পাওয়ার অধিকার নেই?’
এই সমাবেশগুলো ইরানের রক্ষণশীল শিবিরের ভেতরেও বিভক্তি প্রকট করেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা ইস্যুতে এই বিভাজন স্পষ্ট। মুজতবা খামেনি প্রকাশ্যে ঘালিবাফের কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় সমর্থন দিলেও কট্টরপন্থিরা ওয়াশিংটনের সঙ্গে যেকোনো ধরনের যোগাযোগের বিরোধিতা করে চলেছেন।
পশ্চিম তেহরানের স্বেচ্ছাসেবী আধাসামরিক বাহিনী বাসিজের ২৯ বছর বয়সী সদস্য মাহদি বলেন, তিনি এই আলোচনার ঘোর বিরোধী। যুদ্ধের প্রথম দিনই নিহত ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘আমাদের শহীদ নেতা বারবার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা নিষিদ্ধ।’
মাহদির মতো রক্ষণশীল শিবিরের অন্যরাও মনে করেন, এই সমাবেশের মাধ্যমে কূটনীতিতে যুক্ত ইরানি কর্মকর্তাদের কাছে বার্তাও পাঠানো উচিত। তিনি বলেন, ‘ঘালিবাফ যদি সাবেক প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি এবং সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ জাভেদ জারিফের পরিণতি বরণ করতে চান, তাহলে এই আলোচনা চালিয়ে যেতে পারেন। তবে হিজবুল্লাহ তরুণেরা আমাদের নেতার পথকে ভুলে যেতে দেবে না।’ (ইরানে কট্টরপন্থি কর্মী ও প্রতিষ্ঠানের সমর্থকেরা নিজেদের বোঝাতে ‘হিজবুল্লাহ’ শব্দটি ব্যবহার করেন।)
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে রক্ষণশীল শিবিরের ভেতরের এই বিভাজন আর গোপন রাখা যাচ্ছে না। ২৮ মে প্রকাশিত এক বার্তায় মুজতবা খামেনি ঘালিবাফের প্রশংসা করার পাশাপাশি রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোকে অভ্যন্তরীণ বিভাজন আরও না বাড়ানোর জন্য সতর্ক করেন। তিনি লেখেন, ‘আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন ঐক্য রক্ষা করা জরুরি। মতপার্থক্যকে দ্বন্দ্ব ও বিভাজনে রূপান্তর করবেন না।’
তেহরানের অনেকেই এই বার্তাকে কট্টরপন্থিদের প্রতি একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন। কারণ কট্টরপন্থিরা এখনো বিশ্বাস করেন, কূটনীতির বদলে সামরিক উত্তেজনা বাড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে সংঘাত চালিয়ে যাওয়া উচিত।
—মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদন অবলম্বনে





