আধুনিক যুগে হরমুজ প্রণালি ও অন্যান্য নৌ-অবরোধের ইতিহাস

আধুনিক ইতিহাসে কিছু উল্লেখযোগ্য নৌ অবরোধ
আধুনিক ইতিহাসে কিছু উল্লেখযোগ্য নৌ অবরোধ | ছবি: আল জাজিরা
0

যুদ্ধের অন্যতম প্রাচীন অস্ত্র হলো নৌ-অবরোধ (Naval Blockade)। সাগরপথের নিয়ন্ত্রণ (Control of sea routes) নিয়ে শত্রুর সরবরাহ বন্ধ করে তাদের আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে এটি ব্যবহার করা হয়। এর জন্য কোনো পদাতিক বাহিনী (Infantry) বা আগ্রাসনের প্রয়োজন হয় না; কেবল শত্রুর বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় রসদ (Essential supplies) আটকে দেয়াই যথেষ্ট।

এসব অবরোধ যুগে যুগে অর্থনীতি (Economy), সমাজ ও আঞ্চলিক জোটকে নতুন আকার দিয়েছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি অবরোধের কারণে হরমুজ প্রণালি (Strait of Hormuz) কার্যত বন্ধ রয়েছে, যেখান দিয়ে একসময় বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস (Oil and Gas) পরিবাহিত হতো।আল জাজিরার আধুনিক ইতিহাসের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি নৌ-অবরোধের বিবরণ তুলে ধরেছে।

গাজা উপত্যকায় ইসরাইলি অবরোধ (২০০৭-বর্তমান)

২০০৭ সাল থেকে গাজা উপত্যকায় (Gaza Strip) স্থল, সমুদ্র ও আকাশপথে সম্পূর্ণ অবরোধ আরোপ করে রেখেছে ইসরাইল, যা আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী অবরোধ (Longest blockade)। এর ফলে গাজার ২৩ লাখ মানুষ এক দীর্ঘ মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকটের (Humanitarian and economic crisis) মধ্যে রয়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে শুরু হওয়া ইসরাইলি আগ্রাসনের (Israeli aggression) পর থেকে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এর আগে ২০০৮ সাল থেকে বেশ কয়েকটি ‘ফ্রিডম ফ্লোটিলা’ (Freedom Flotilla) আন্তর্জাতিক জলসীমায় এই অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করলেও ইসরাইলি বাধার মুখে পড়ে।

বিয়াফ্রা অবরোধ (১৯৬৭-৭০)

১৯৬৭ সালের জুলাইয়ে নাইজেরিয়ায় গৃহযুদ্ধ (Civil war) শুরু হওয়ার পরপরই স্বাধীনতাকামী বিয়াফ্রা প্রজাতন্ত্রের ওপর স্থল, সমুদ্র ও আকাশপথে অবরোধ আরোপ করে নাইজেরিয়ার কেন্দ্রীয় সরকার। এই অবরোধের ফলে ব্যাপক দুর্ভিক্ষ (Famine) দেখা দেয় এবং এটি বিশ্বব্যাপী মানবিক সংকটে রূপ নেয়। ধারণা করা হয়, এই সময় সরাসরি সংঘাতের চেয়ে ক্ষুধা ও রোগবালাইয়েই ১০ থেকে ২০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। প্রায় তিন বছরের এই অবরোধ শেষে ১৯৭০ সালের জানুয়ারিতে বিয়াফ্রা আত্মসমর্পণ করে।

বেইরা পেট্রোল অবরোধ (১৯৬৬-৭৫)

রোডেশিয়ায় (বর্তমান জিম্বাবুয়ে) তেল সরবরাহ বন্ধ করতে ব্রিটিশ নৌবাহিনী দীর্ঘ ৯ বছর ধরে মোজাম্বিকের বেইরা বন্দরে (Beira Port) এই অবরোধ চালায়। জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞার (UN sanctions) আওতায় এই পদক্ষেপ নেয়া হলেও তা সফল হয়নি। দক্ষিণ আফ্রিকা ও অন্যান্য বন্দর দিয়ে রোডেশিয়া ঠিকই তেল পাচ্ছিল। অবশেষে ১৯৭৫ সালের জুলাইয়ে মোজাম্বিক স্বাধীনতা লাভের পর এই অবরোধের অবসান ঘটে।

কিউবার মিসাইল সংকট ও ‘কোয়ারেন্টিন’ (১৯৬২)

১৯৬২ সালের অক্টোবরে কিউবায় সোভিয়েত পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্রের (Soviet nuclear missiles) নির্মাণকাজ শনাক্ত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র সেখানে নৌ-‘কোয়ারেন্টিন’ (Naval quarantine) আরোপ করে। সরাসরি অবরোধ বা ‘ব্লকেড’ (Blockade) বললে তা যুদ্ধের শামিল হতো বলে যুক্তরাষ্ট্র এই শব্দটি ব্যবহার করেছিল। এর ফলে বিশ্ব পারমাণবিক যুদ্ধের (Nuclear war) দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছিল। অবশেষে একটি গোপন চুক্তির মাধ্যমে ১৩ দিনের এই উত্তেজনার অবসান ঘটে।

ওনসান অবরোধ (১৯৫১-৫৩)

কোরীয় যুদ্ধের (Korean War) সময় ১৯৫১ সালের ফেব্রুয়ারিতে উত্তর কোরিয়ার ওনসান বন্দরে জাতিসংঘের নৌবাহিনী (United Nations Navy) অবরোধ আরোপ করে। এটি প্রায় আড়াই বছর স্থায়ী হয়েছিল। উত্তর কোরিয়ার কৌশলগত নৌ-ঘাঁটি ও শোধনাগার (Naval base and refinery) অচল করে দিতে এই পদক্ষেপ নেয়া হয়। ৮৬১ দিনের এই অবরোধ ১৯৫৩ সালের জুলাইয়ে যুদ্ধবিরতি চুক্তির (Armistice agreement) মাধ্যমে শেষ হয়।

জাপানের বিরুদ্ধে মার্কিন সাবমেরিন অবরোধ (১৯৪২-৪৫)

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে (World War II) প্রশান্ত মহাসাগরীয় রণাঙ্গনে জাপানের ওপর সাবমেরিন অবরোধ (Submarine blockade) আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। ১৯৪২ সাল থেকে শুরু হওয়া এই অবরোধের কারণে জাপানের তেল ও খাদ্য আমদানি (Oil and food imports) পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। মার্কিন সাবমেরিনগুলো জাপানের প্রায় ১ হাজার ৩০০টি বাণিজ্য জাহাজ (Merchant ships) ধ্বংস করে। ১৯৪৫ সালের আগস্টে হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা হামলার পর জাপান আত্মসমর্পণ করলে এই অবরোধের সমাপ্তি ঘটে।

পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অবরোধ (১৯১৫-১৮)

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯১৫ সালের আগস্টে মিত্রবাহিনী (Allied forces) পূর্ব ভূমধ্যসাগরের উপকূলে অবরোধ আরোপ করে। এর মূল লক্ষ্য ছিল অটোমান সাম্রাজ্যের (Ottoman Empire) সামরিক রসদ সরবরাহ বন্ধ করা। এর ফলে লেবানন ও বৃহত্তর সিরিয়ায় মারাত্মক দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, যাতে ১৯১৮ সাল পর্যন্ত প্রায় ৫ লাখ বেসামরিক মানুষের মৃত্যু হয়।

জার্মানির ওপর মিত্রবাহিনীর অবরোধ (১৯১৪-১৯)

১৯১৪ সালের আগস্টে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পরপরই জার্মানির ওপর নৌ-অবরোধ আরোপ করে ব্রিটিশ নৌবাহিনী (British Navy)। ইংলিশ চ্যানেল থেকে নরওয়ে পর্যন্ত বিস্তৃত এই অবরোধের কারণে জার্মানিতে খাদ্য ও সারের আমদানি (Food and fertilizer imports) বন্ধ হয়ে যায়। ১৯১৬-১৭ সালের শীতে সেখানে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। ১৯১৯ সালের জুলাইয়ে ভার্সাই চুক্তি (Treaty of Versailles) স্বাক্ষরের পর এই অবরোধ পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হয়।

এএম