হরমুজ বন্ধের ইস্যুতে ‘ডোমিনো ইফেক্ট’: বিশ্বজুড়ে খাদ্য, ফ্লাইট ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধাক্কা

তেহরানের এক ভবনে হরমুজ প্রণালি সম্পর্কে গ্রাফিক্যাল বিলবোর্ড
তেহরানের এক ভবনে হরমুজ প্রণালি সম্পর্কে গ্রাফিক্যাল বিলবোর্ড | ছবি: সংগৃহীত
0

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের জেরে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় শুধু তেলের বাজারেই নয়, বিশ্বজুড়ে খাদ্য, ফ্লাইট ও সরবরাহ ব্যবস্থায় ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে। চলমান ১০ দিনের যুদ্ধবিরতির মধ্যে প্রণালিটি সাময়িকভাবে খুলে দেয়া হলেও জেট ফুয়েল, সার, শিল্প-কারখানার কার্বন ডাই-অক্সাইড এবং নাফথার বৈশ্বিক সরবরাহে ইতিমধ্যে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটেছে। ফ্রান্স ২৪ বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানে হামলা চালানোর পর তেহরান এই কৌশলগত জলপথটি বন্ধ করে দেয়। পাল্টা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রও ইরানি বন্দরে নৌ-অবরোধ দেয়। এর ফলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায় এবং গ্যাসের দাম বাড়ে ১২ শতাংশ। বিশ্লেষকরা একে ‘ডোমিনো ইফেক্ট’ বলছেন, যেখানে একটি সংকটের কারণে একের পর এক নতুন সংকট তৈরি হচ্ছে।

ফ্লাইট বাতিলের শঙ্কা, বন্ধ হচ্ছে এয়ারলাইনস
হরমুজ সংকটের কারণে এশিয়া ও ইউরোপে কেরোসিন বা জেট ফুয়েলের তীব্র ঘাটতির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করেছেন, মে ও জুন মাস থেকে ইউরোপে ব্যাপক হারে ফ্লাইট বাতিল হতে পারে। জ্বালানির দাম দ্বিগুণের বেশি বেড়ে যাওয়ায় জার্মান বিমান সংস্থা লুফথানসা বাধ্য হয়ে তাদের আঞ্চলিক সহযোগী সংস্থা ‘সিটিলাইন’ বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে।

চরম খাদ্যসংকটের মুখে বিশ্ব
সার সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটায় বিশ্ব এক ভয়াবহ খাদ্যসংকটের দিকে এগোচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ইন্দরমিত গিল সতর্ক করে বলেছেন, বিশ্বে এমনিতেই ৩০ কোটি মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। এই সংকট দ্রুত আরও ২০ শতাংশ বেড়ে যেতে পারে।

বিশ্বের প্রায় অর্ধেক ইউরিয়া এবং বিপুল পরিমাণ অ্যামোনিয়া সার হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। এই সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় আফ্রিকা থেকে শুরু করে কৃষি পরাশক্তি ব্রাজিল পর্যন্ত মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে। সারের অভাবে ফসলের উৎপাদন কমবে, যা বিশ্বজুড়ে খাদ্যের দাম আরও বাড়িয়ে দেবে।

যুক্তরাজ্যে কার্বন ডাই-অক্সাইডে ও জাপানে ‘নাফথা’ সংকট
সংকটের আঁচ লেগেছে ধনী দেশগুলোতেও। যুক্তরাজ্যে কার্বন ডাই-অক্সাইডের ঘাটতি নিয়ে সরকার জরুরি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণ, তাজা খাবার সংরক্ষণ এবং চিকিৎসাক্ষেত্রে এই গ্যাস অত্যন্ত জরুরি।

অন্যদিকে, চিকিৎসা সরঞ্জাম যেমন: জীবাণুমুক্ত গ্লাভস তৈরির অতিপ্রয়োজনীয় কাঁচামাল ‘নাফথা’ সংকটে পড়েছে জাপান। কারণ, জাপান তার চাহিদার বড় অংশই মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করে। এই পরিস্থিতিকে জাপানি গণমাধ্যম ‘নাফথা সংকট’ বলে আখ্যা দিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালির এই অচলাবস্থা বিশ্বায়নের জন্য একটি বড় পরীক্ষা। এটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, বিশ্বের খাদ্য, জ্বালানি ও স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নির্দিষ্ট কিছু কৌশলগত নৌপথের ওপর কতটা নির্ভরশীল।

এএম