ইরান যুদ্ধ: ট্রাম্পের আধিপত্য নীতির বিরুদ্ধে বদলাচ্ছে বৈশ্বিক সমীকরণ

ডোনাল্ড ট্রাম্প
ডোনাল্ড ট্রাম্প | ছবি: সংগৃহীত
2

বলপ্রয়োগ ও ক্ষমতার নীতিই ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির মূল ভিত্তি। তবে বর্তমানে শাসনব্যবস্থার এ চিত্র দেশ ও বিদেশে ক্রমেই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। ট্রাম্প ও তার অধীনস্থরা কখনোই গোপন করেননি যে তিনি নিজের আধিপত্যে বিশ্বাস করেন এবং অর্থনৈতিক, ভূরাজনৈতিক ও অভ্যন্তরীণ সাফল্যের জন্য নিয়ন্ত্রণহীন মার্কিন শক্তি প্রয়োগে প্রস্তুত। সংঘাতকে উসকে দেয়া এবং বিরোধকে আরও বাড়িয়ে তোলার মধ্য দিয়েই তার নীতির বিস্তার ঘটেছে, যা মূলত তার ব্যক্তিগত ব্র্যান্ডেরই সম্প্রসারণ।

কিন্তু ক্রমেই বিশৃঙ্খল আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ও দেশে বাড়তে থাকা অস্থিরতা ইঙ্গিত দিচ্ছে, প্রেসিডেন্টের উত্তেজনা বাড়ানো ও চাপ প্রয়োগের কৌশলের সীমা আছে—এবং তা তাকে রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিকর এক কোণায় ঠেলে দিতে পারে। সম্প্রতি সিএনএন প্রকাশিত এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

ইরানের যুদ্ধ ট্রাম্পের এই কৌশলের চূড়ান্ত পরীক্ষা হয়ে উঠছে

ট্রাম্পের সহজাত প্রবৃত্তিই সম্ভবত ব্যাখ্যা করে, কেন তিনি ইরানের সামরিক, পারমাণবিক ও আঞ্চলিক আকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে এমন হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যা আগের প্রেসিডেন্টরা এড়িয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু তেহরান ট্রাম্পের দাবির কাছে নতি স্বীকার না করায় যুক্তরাষ্ট্র ও ট্রাম্পের নিজের ক্ষমতার সীমা স্পষ্ট হতে শুরু করেছে।

এতে প্রেসিডেন্টকে কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে পড়তে হয়েছে। তিনি সংঘাত আরও বাড়িয়ে ইরানকে তার দাবির কাছে নতি স্বীকারে বাধ্য করার চেষ্টা করতে পারেন, কিন্তু তাতে যুক্তরাষ্ট্রে হতাহতের সংখ্যা বাড়তে পারে এবং অর্থনৈতিক পাল্টা প্রতিক্রিয়াও তীব্র হতে পারে। আবার তিনি বিজয় দাবি করে সরে আসতে পারেন—কিন্তু হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে থাকা এবং সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত বহাল থাকা তার এমন দাবি মিথ্যা প্রমাণ করবে।

এ ফাঁদ থেকে বের হতে ট্রাম্প এমন এক পথ বেছে নিয়েছেন, যাতে মার্কিন সামরিক শক্তির সঙ্গে শত্রুর সামনে পিছু না হটার নিজের অবস্থানকে একসঙ্গে মিলিয়ে নেয়া হয়। প্রণালিতে তার নতুন অবরোধের পদক্ষেপও ইরানের অর্থনীতি চেপে ধরার চেষ্টা, যদিও এতে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

ইরানে কোনো সমাধান খুঁজে পাওয়ার প্রচেষ্টা প্রেসিডেন্টের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংকট। তবে তার খাপছাড়া যুদ্ধ নেতৃত্বের ইঙ্গিত আগেও অন্য বিতর্কে মিলেছিল।

ন্যাটো মিত্ররা তার বিরোধিতা করা এবং আগেভাগে না জানানো যুদ্ধে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। এমনকি জোট ছেড়ে দেয়ার হুমকিও তাদের নিজেদের জাতীয় স্বার্থ ত্যাগে বাধ্য করতে পারেনি। তাদের এ অনাগ্রহ যুক্তরাষ্ট্রের সেই সব বিকল্পকেই কমিয়ে দিয়েছে, যেগুলোর ওপর অতীতে যুদ্ধের সময় অনেকটা নির্ভর করতো।

ট্রাম্পের কঠোর পদ্ধতি কখনো কখনো কাজ করেছে। যেমন, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক অংশীদারদের বিরুদ্ধে শুল্কযুদ্ধ ব্যবহার করে তিনি কিছু চুক্তি আদায় করেছিলেন। কিন্তু চীন নিজেও এক অর্থনৈতিক পরাশক্তি। দুর্লভ মাটির খনিজ রপ্তানি বন্ধের হুমকি দিয়ে পাল্টা জবাব দেয়। বাণিজ্যযুদ্ধের সম্ভাবনা বিশ্ববাজারে ধস নামিয়ে ট্রাম্পকে পিছু হটতে বাধ্য করেছিল।

ইরানও সম্ভবত সে অভিজ্ঞতা থেকে শিখেছে যে, বিশ্ব অর্থনীতিতে ধাক্কা লাগলে যুক্তরাষ্ট্র দুর্বল হয়ে পড়ে—এবং তারা নিজেদের প্রণালি অবরোধের মাধ্যমে সেটিকেই জিম্মি করে রাখার চেষ্টা করেছে।

ট্রাম্পের কিছু ক্ষমতা ম্লান হয়ে যাচ্ছে—এমন ধারণা শুধু ইরান সংকটেই সীমিত নয়। হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবানকে সমর্থন দিতে নিজের রাজনৈতিক আন্দোলন ব্যবহার করেও তিনি তার রাজনৈতিক আকর্ষণের সীমা টের পেয়েছেন। গত রোববার ভোটাররা ওই সে নেতাকে প্রত্যাখ্যান করে, ফলে ইউরোপকে মেইক আমেরিকা গ্রেইট এগেন-ঘেঁষা বানানোর ট্রাম্পের প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

হাঙ্গেরির ওই সমকক্ষের মতোই ট্রাম্পের কিছু দেশিয় নীতিও প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়ছে। মিনেসোটায় ফেডারেল এজেন্টদের হাতে দুই মার্কিন নাগরিক নিহত হওয়ার পর তার গণ-দেশান্তর কর্মসূচি নিয়ে জনমতের চাপে তাকে পিছু হটতে হয়েছে।

আর নিজের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের শাস্তি দিতে আইনের ব্যবহার করার ট্রাম্পের বেশির ভাগ চেষ্টা ব্যর্থ হওয়া—যা অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্ডিকে বরখাস্তের দিকে ঠেলে দেয়—এটা দেখায়, কিছু সাংবিধানিক নিয়ন্ত্রণ এখনো তাকে আটকে রেখেছে।

এমনকি আমেরিকান পোপ লিও চতুর্দশ—যিনি ইরান যুদ্ধের প্রকাশ্য বিরোধিতায় প্রেসিডেন্টকে ক্ষুব্ধ করেছেন—গত সোমবার বলতে বাধ্য হন, ‘ট্রাম্প প্রশাসন নিয়ে আমার কোনো ভয় নেই।’

ট্রাম্প কেন মনে করেন, তার ক্ষমতা অসীম

ট্রাম্প কখনোই গোপন করেননি যে তিনি নিজেকে অপ্রতিরোধ্য ক্ষমতার অধিকারী মনে করেন। গত আগস্টে তিনি বলেন, ‘আমি যা চাই, তা করার অধিকার আমার আছে। আমি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট।’ এ বছর নিউইয়র্ক টাইমসকে তিনি বলেন, ‘বিদেশে তার কর্মকাণ্ডের একমাত্র সীমা হলো আমার নিজের নৈতিকতা।’

এই বিশ্বাসই দেখা যায় কংগ্রেসের মতামত না নেয়া এবং যুদ্ধ শুরু করার আগে দেশকে প্রস্তুত না করেই হামলা চালানোর সিদ্ধান্তে, যে যুদ্ধ এখন প্রায় ছয় সপ্তাহ ধরে চলছে।

ইরান বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে—এমন প্রশ্নে হোয়াইট হাউস কর্মকর্তারা প্রায়ই বলেন, ‘শুধু প্রেসিডেন্টই জানেন তিনি কী করবেন’—এটি এমন এক ধরনের উত্তর, যা মার্কিন প্রজাতান্ত্রিক ব্যবস্থার ক্ষমতা ভাগাভাগির নীতিকে প্রত্যাখ্যান করার প্রবণতা তুলে ধরছে।

ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের ভিত্তি যে শক্তি ও উত্তেজনা বৃদ্ধির নীতি, তা সবচেয়ে স্পষ্টভাবে বলেছিলেন হোয়াইট হাউসের উপপ্রধান স্টিফেন মিলার।

চলতি বছরের গত জানুয়ারিতে, ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার পর হোয়াইট হাউসের উচ্ছ্বাসের মধ্যে মিলার সিএনএনের জেক ট্যাপারকে বলেন, ‘আমরা এমন এক দুনিয়ায় বাস করি, এমন বাস্তবতায় যা শক্তি দিয়ে, বল দিয়ে, ক্ষমতা দিয়ে পরিচালিত হয়।’

ট্রাম্পের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার কৌশল তার প্রেসিডেন্সির শুরুর দিকে তুলনামূলকভাবে বেশি কার্যকর ছিল। তিনি রিপাবলিকান পার্টিকে নিজের ইচ্ছার বাহনে পরিণত করেন, যা তার বেপরোয়া প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণে আগ্রহী নয়—জনমত হ্রাস পেলেও।

অনেকেই মনে করেন, জানুয়ারিতে মাদুরোকে তার বাড়ি থেকে তুলে আনার বিশেষ বাহিনীর অভিযান ছিল ট্রাম্পের জন্য বড় সাফল্য। আর পশ্চিম গোলার্ধে আধিপত্য বিস্তারের তার ‘ডনরো মতবাদ’ অনুসারে, তিনি আর্জেন্টিনা ও হন্ডুরাসে মতাদর্শগতভাবে কাছের নেতাদের নির্বাচনে জিততেও রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করেন।

কীভাবে ইরান ট্রাম্পের অজেয় ভাবমূর্তি ক্ষয় করছে

কিন্তু ইরানে ট্রাম্পের ভাগ্য হয়তো বদলাতে শুরু করেছে। যুদ্ধটি শুরু হয় ২১ শতকের অন্যান্য আমেরিকান সংঘাতের মতোই ধ্বংসের প্রদর্শনী দিয়ে, কিন্তু দ্রুতই এটি ইতিহাসের সেই শিক্ষাটিই সামনে আনে—বিপুল বিমানশক্তির সুবিধা একা কোনো স্পষ্ট বিজয় বা শাসন পরিবর্তন আনতে পারে না। ট্রাম্পের প্রণালি অবরোধকে দেখা যেতে পারে ইরানের ওপর নিজের এবং যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য ফিরিয়ে আনার চেষ্টা হিসেবে, যাতে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের সম্ভাবনা বাড়ে। ইরানের তেল আয়ের উৎস ও আমদানি বন্ধ করে দিলে তার অর্থনীতি বিপর্যস্ত হতে পারে। তখন হয়তো ট্রাম্পের শর্তে শান্তির জন্য আবেদন করতে বাধ্য হবে।

কিন্তু যুদ্ধের একটি শিক্ষা হলো, ইরানের নেতারা এই সংঘাতকে অস্তিত্বের প্রশ্ন হিসেবে দেখছেন এবং নিজেদের জনগণের ওপর অসীম কষ্ট চাপাতেও তারা প্রস্তুত। তারা হয়তো ধরে নিয়েছেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনের বছরে জ্বালানি ও পেট্রলের দাম বাড়লে এবং মূল্যস্ফীতি বাড়লে ট্রাম্পের রাজনৈতিক সহনশীলতা কমে যাবে। অবরোধের মাধ্যমে ইরানকে নতজানু করতে কয়েক মাসও লাগতে পারে। আর সময় এমন এক সম্পদ, যা রিপাবলিকান কংগ্রেস প্রার্থীদের হাতে নেই। ইউরোপেও একই ধরনের এক পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে, যেখানে ফলাফলের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের সীমাবদ্ধতা এখন স্পষ্ট।

অরবানের ১৬ বছরের জাতীয়তাবাদী শাসনের অবসান মাগা আন্দোলনকে এমন এক আদর্শ থেকে বঞ্চিত করেছে, যিনি অভিবাসন ও সংবাদমাধ্যমে দমননীতি চালিয়েছিলেন, এবং বড় ব্যবসা ও আইনকেও রাজনৈতিক রঙে রাঙিয়েছিলেন। তার পতন ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভেতরে ট্রাম্পের এক মিত্রকে সরিয়ে দিয়েছে—যে ইউনিয়নকে ট্রাম্প অপছন্দ করেন। এটি ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের জন্যও ধাক্কা, যিনি সম্প্রতি হাঙ্গেরিতে গিয়ে ভোটারদের অরবানের সঙ্গেই থাকার অনুরোধ করেছিলেন।

আর জনতার বিশাল অংশের ভোটে জনতাবাদ ও জাতীয়তাবাদ প্রত্যাখ্যাত হওয়ার দৃশ্য—যে পরাজয় অস্বীকার করা যায় না—হোয়াইট হাউসকে উদ্বিগ্ন করতে পারে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাটদের জন্যও শিক্ষা আছে। রোববারের ফল বামপন্থী প্রগতিশীল মূল্যবোধের জয় ছিল না। বিজয়ী প্রার্থী পেতের ম্যাগিয়ার নিজেই মধ্য-ডানপন্থী নেতা, যিনি একসময় অরবানের অনুগত ছিলেন। আর তিনি যদি ইউরোপের গণতান্ত্রিক নেতাদের দুর্ভাগ্য, অর্থনীতি ও স্বাস্থ্যসেবার সমস্যার জাল ভাঙতে না পারেন, তাহলে জনতাবাদ শক্তিশালী শক্তি হয়েই থাকবে।

সামগ্রিকভাবে, অরবানের অবসান ইঙ্গিত দেয়— নেতার শাসনের মোহ, অন্তত এক ধরনের আধা-গণতান্ত্রিক সমাজে, চিরকাল শক্ত রাজনৈতিক স্রোত ও ক্ষমতাসীনদের দুর্ভোগকে অতিক্রম করতে পারে না।

ট্রাম্পের এই বিশ্বাস যে তিনি বেপরোয়া ক্ষমতার অধিকারী, তা কখনোই সংবিধান বা আমেরিকান রাজনৈতিক ঐতিহ্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল না। আর দ্বিতীয় মেয়াদের রাষ্ট্রপতিদের স্বাভাবিক ক্ষয়, ইরান যখন বাইরে থেকে তার নেতার ভাবমূর্তিকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে, তখন তাকে আরও দুর্বল করে দিতে পারে।

এএম