বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, বাবার দীর্ঘ শাসনামলে মুজতবা খামেনি কোনো আনুষ্ঠানিক সরকারি পদে ছিলেন না। তবে ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থেকে তিনি নেপথ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন বলে ধারণা করা হয়। রক্ষণশীল রাজনৈতিক শিবিরের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা রয়েছে এবং ক্ষমতাধর ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর সঙ্গেও তার গভীর সম্পর্ক রয়েছে বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। বাহিনীটি এরই মধ্যে নতুন নেতার প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করেছে।
সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, দেশটির সশস্ত্র বাহিনী এবং বিচার বিভাগের সমর্থন লাভ করেন।
আরও পড়ুন:
দীর্ঘদিন জনসম্মুখে কম উপস্থিতি এবং গণমাধ্যমে সীমিত ভূমিকার কারণে মুজতবা খামেনির প্রকৃত রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে সাধারণ মানুষ ও কূটনৈতিক মহলে নানা জল্পনা-কল্পনা ছিলো। সোমবার মধ্যরাতের কিছু পর ইরানের শীর্ষ ধর্মীয় সংস্থা অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস এক বিবৃতিতে তাকে দেশের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ঘোষণা করে।
১৯৭৯ সালের ইরান রেভ্যুলেশনের মাধ্যমে ইরানে রাজতান্ত্রিক শাসনের অবসান ঘটলেও শেষ পর্যন্ত নেতৃত্বে বংশানুক্রমিক পরিবর্তনের পথই বেছে নিলো এ সংস্থা। যদিও আলি খামেনি ২০২৪ সালে নীতিগতভাবে এমন উত্তরাধিকার ব্যবস্থার বিরোধিতা করেছিলেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
মুজতবা খামেনি ১৯৬৯ সালের ৮ সেপ্টেম্বর ইরানের পবিত্র শহর মাসহাদে জন্মগ্রহণ করেন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি রাজধানী তেহরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিমান হামলায় ৮৬ বছর বয়সে আলি খামেনি নিহত হন। ওই হামলার মধ্য দিয়েই মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা ও সংঘাতের সূচনা হয় বলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মত।
আরও পড়ুন:
কাঁচা-পাকা দাড়ি ও কালো পাগড়ি পরিহিত মুজতবা খামেনি একজন ধর্মীয় পণ্ডিত। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)–এর বংশধর হিসেবে তিনি ‘সৈয়দ’ পরিচয়ের প্রতীক কালো পাগড়ি পরেন। ১৯৮০–এর দশকে সংঘটিত ইরান-ইরাক যুদ্ধেও তিনি অংশ নিয়েছিলেন বলে জানা যায়।
২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন মুজতবা খামেনির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। সে সময় মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় অভিযোগ করে, তিনি কোনো সরকারি পদে না থাকলেও বাবার হয়ে কাজ করতেন এবং আঞ্চলিক কৌশল ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নীতিতে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন।
বিরোধীদের অভিযোগ, ২০০৯ সালে তৎকালীন অতিরক্ষণশীল প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমেদিনেজাদের পুনর্নির্বাচনের পর যে বড় ধরনের বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল, তা দমনে মুজতবা খামেনির ভূমিকা ছিলো।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, মুজতবা খামেনির প্রায় ১০ কোটি ডলারের বেশি সম্পদ রয়েছে। বিভিন্ন কোম্পানির মাধ্যমে তেল বিক্রির অর্থ তিনি ব্রিটেনের বিলাসবহুল আবাসন, ইউরোপের হোটেল এবং দুবাইয়ের স্থাবর সম্পত্তিতে বিনিয়োগ করেছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
শিক্ষাজীবনে মুজতবা কোম শহরের ধর্মীয় সেমিনারিতে ধর্মতত্ত্ব নিয়ে পড়াশোনা করেন এবং সেখানে শিক্ষকতাও করেছেন। এতদিন তার ধর্মীয় পদবি ‘হুজ্জাতুল ইসলাম’ থাকলেও সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর তাকে ‘আয়াতুল্লাহ’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
ইরানি কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, মুজতবা খামেনির স্ত্রী জোহরা হাদ্দাদ আদেলও সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র–ইসরাইলি বিমান হামলায় নিহত হয়েছেন।
এদিকে, ইসরাইল ইরানের নতুন এই নেতৃত্বকে সতর্ক করে বলেছে, যেকোনো উত্তরসূরি এবং যারা তাকে নিয়োগ দিয়েছে তাদের কর্মকাণ্ডের ওপর নজর রাখা হবে।
উল্লেখ্য, অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টসের সদস্য সংখ্যা ৮৮ এবং তারা প্রতি আট বছর অন্তর নির্বাচিত হন। ১৯৮৯ সালে ইরানের প্রতিষ্ঠাতা নেতা রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর আলি খামেনিকে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছিল। এবার মুজতবা খামেনিকে দায়িত্ব দেয়ার মাধ্যমে সংস্থাটি দ্বিতীয়বারের মতো নেতৃত্ব পরিবর্তনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করলো





