স্ক্রিনে একটি প্রশ্ন টাইপ, আর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই চলে আসে পুরো উত্তর। ই-মেইল লেখা থেকে শুরু করে ছবি তৈরি, অফিস রিপোর্ট, ক্লাস নোট, এমনকি ব্যক্তিগত পরামর্শ।
এখন সবকিছুর মাঝখানেই জায়গা করে নিয়েছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআই। প্রযুক্তির এ দ্রুত পরিবর্তনের যুগে এআই এখন আর শুধু একটি সফটওয়্যার ফিচার নয়। ধীরে ধীরে এটি বদলে দিচ্ছে মানুষের কাজের ধরণ, তথ্য খোঁজার পদ্ধতি, এমনকি চিন্তা করার অভ্যাসও। চলুন শুনে আসি ফিচারগুলো কীভাবে ইউজারদের দৈনন্দিন জীবনের অভ্যাস বদলাচ্ছে।
বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডার মাঝেও ফোন স্ক্রল করতে ব্যস্ত ফাইন্যান্স ডিপার্টমেন্টের এ চার শিক্ষার্থী। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা থেকে শুরু করে প্রেজেন্টেশন তৈরি, অ্যাসাইনমেন্ট লেখা কিংবা দ্রুত তথ্য খোঁজা, সবকিছুর জন্যই এখন তারা নিয়মিত ব্যবহার করছেন এআই সফ্টওয়্যার। তাদের দাবি, চ্যাট জিপিটি কিংবা ক্লডের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো অনেক কাজ সহজ করে দিয়েছে। তবে এ সহজের ভেতরেই ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে নিজে চিন্তা করার প্রবণতা। এমন অনুভূতিও রয়েছে তাদের মধ্যে।
আগে সবাই মিলে এক সঙ্গে প্রেজেন্টেশন, অ্যাসাইনমেন্ট তৈরি করা হতো। আর এআইয়ের কারণে তা করা লাগছে বলে জানান শিক্ষার্থীরা।
আরও পড়ুন
প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান এআই সিস্টেমগুলো শুধু নির্দেশনা অনুসরণ করে না, বরং ইউজারের ব্যবহার প্যাটার্ন বিশ্লেষণ করেও কাজ করে। ব্যবহারকারী কী ধরনের প্রশ্ন করছে, কতক্ষণ ব্যবহার করছে, কোনো ধরনের উত্তর পছন্দ করছে, এসব তথ্য বিশ্লেষণ করেই আরও ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে অ্যালগরিদম। ফলে বাড়ছে কাজের গতি, কমছে সময়।
ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ডিআইইউ ডাটা সায়েন্স ল্যাব ল্যাব ইনচার্জ সোহেল আরমান বলেন, ‘আগে যেখানে সময় লাগতো অনেক বেশি এখন সে সময়টা কমে গিয়ে খুব সহজেই রেজাল্ট পাচ্ছি। ইউরোপে এআইয়ের বিষয়ে একটা পলেসি আছে, কিন্তু বাংলাদেশে তা হয়নি।’
তবে এটি তৈরি করছে নতুন ধরনের নির্ভরতা। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ভিক্তিক এমআইটি-এর এক গবেষণায় উঠে এসেছে অতিরিক্ত এআই নির্ভরতা মস্তিষ্কের সংযোগ কার্যক্রম প্রায় ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে পারে। এর পাশাপাশি বেড়েছে অনৈতিক ব্যবহারের প্রবণতাও। কেউ আবার ব্যক্তিগত পরামর্শ কিংবা মানসিক চাপ কমাতেও কথা বলছেন চ্যাটবটের সঙ্গে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের মতে, নতুন প্রজন্মের মধ্যে ইনস্ট্যান্ট আন্সার (উত্তর) কালচার দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইআইটি পরিচালক বি এম মইনুল হোসেন বলেন, ‘আমার তো সাহায্য বই বিভিন্ন সাইড থেকে নেই। আমি মনে করি এআই ব্যবহার করা খারাপ না। তবে প্রেজেন্টেশন, অ্যাসাইনমেন্ট তৈরি করার সময় ব্যবহার করা উচিত না।’
বিশ্বজুড়ে এআইকে ঘিরে বাজারের আকার ইতোমধ্যেই ১৫ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক নীতিমালা ও দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা গেলে বাংলাদেশে এর বাজার দাঁড়াতে পারে ১৫০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থানে এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলেও মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, ইনোভেশন অ্যান্ড অন্ট্রপ্রনারশিপ এআই ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রফেসর খন্দকার মামুন বলেন, ‘বাংলাদেশ সরকার ইকনোমিতে ১ ট্রিলিয়ন আয় করার দিকে আগাচ্ছে। কিন্তু এ আয় করার জন্য এআই প্রযুক্তির ব্যবহার করতে হবে।’
তবে মনোবিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন ভিন্ন দিক নিয়ে। তাদের মতে, দ্রুত উত্তর পাওয়ার এ সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে মানুষের মনোযোগ, ধৈর্য এবং সমস্যা সমাধানের স্বাভাবিক সক্ষমতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে।




