মধ্যপ্রাচ্যে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা: জাতিসংঘের সতর্কতা

জাতিসংঘের পতাকা
জাতিসংঘের পতাকা | ছবি: সংগৃহীত
0

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ ও সহিংসতার মাত্রা তীব্রতর হওয়ায় পুরো অঞ্চল এক ভয়াবহ ও অপূরণীয় মানবিক বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়েছে। ইরান, লেবানন, সিরিয়া এবং ফিলিস্তিনসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর অব্যাহত হামলা এবং অবকাঠামো ধ্বংসের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ। গতকাল (মঙ্গলবার, ৪ মার্চ) নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা বিষয়ক আন্ডার-সেক্রেটারি জেনারেল এবং জরুরি ত্রাণ সমন্বয়ক টম ফ্লেচার এক বিবৃতিতে এ হুঁশিয়ারি দেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ‘সংঘাতের প্রভাব এখন কেবল নির্দিষ্ট যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নেই; বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা দিতেই হবে, ফুল স্টপ।’

টম ফ্লেচার তার বিবৃতিতে উল্লেখ করেন, ইরান থেকে শুরু করে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার এবং সৌদি আরব পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলে ঘরবাড়ি, হাসপাতাল এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো হামলার শিকার হচ্ছে। বিশেষ করে ইরানে বড় ধরনের অস্থিরতা শুরু হলে প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তানে ব্যাপক জনস্রোত ও শরণার্থী সংকটের আশঙ্কা রয়েছে।

পাকিস্তান বর্তমানে ১৩ লাখ নিবন্ধিত শরণার্থীকে আশ্রয় দিচ্ছে, যার ফলে নতুন করে চাপ নেয়ার ক্ষমতা দেশটির জন্য অত্যন্ত সীমিত। অন্যদিকে, আফগানিস্তানে ইতোমধ্যে প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ মানুষের মানবিক সহায়তা প্রয়োজন, যা এই আঞ্চলিক সংঘাতের ফলে আরও চরম আকার ধারণ করতে পারে।

ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় মানবিক সহায়তা প্রবেশের পথগুলো প্রায় রুদ্ধ হয়ে পড়েছে। কেরেম শালোম ক্রসিং আংশিক খুললেও রাফাহসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পথ বন্ধ থাকায় ১৮ হাজার রোগী, যার মধ্যে ৪ হাজার শিশু রয়েছে, তারা জরুরি বিশেষায়িত চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

লেবাননেও পরিস্থিতি ভয়াবহ; সেখানে ইসরায়েলি হামলায় ইতোমধ্যে অর্ধশতাধিক মানুষ নিহত এবং ৬০ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই নিয়েছেন। দক্ষিণ লেবানন ও বেকা উপত্যকার ১০০টিরও বেশি শহর ও গ্রাম খালি করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন:

জাতিসংঘের এই শীর্ষ কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেন, হরমুজ প্রণালি বা লোহিত সাগরের মতো গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ ও জ্বালানি রুটগুলো বাধাগ্রস্ত হলে বিশ্বজুড়ে খাদ্য ও জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হবে। এর ফলে ইয়েমেন এবং সিরিয়ার মতো দেশগুলোতে চরম সরবরাহ সংকট দেখা দেবে।

বর্তমানে জ্বালানি সংকটে ইয়েমেনে জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা প্রদানকারী ফ্লাইটগুলো পর্যন্ত বন্ধ রাখা হয়েছে। টম ফ্লেচার আক্ষেপ করে বলেন, আন্তর্জাতিক মানবিক আইন বারবার লঙ্ঘিত হচ্ছে। যখনই বেসামরিক স্থাপনায় হামলা হয় বা ত্রাণ কার্যক্রমকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়, তখনই মানবিক কাজের পরিধি সংকুচিত হয়ে আসে।

এদিকে, জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক সোমবার নিয়মিত ব্রিফিং-এ জানান, গত শনিবার থেকে ইরানে শুরু হওয়া ধারাবাহিক বিমান হামলায় নিহতের সংখ্যা ৭৯০ ছাড়িয়েছে। ১ হাজারের বেশি স্থানে এসব হামলা চালানো হয়েছে।

জাতিসংঘ সতর্ক করেছে যে, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামোতে ক্রমাগত আক্রমণ বিশ্ব অর্থনীতির জন্য মারাত্মক হুমকি, কারণ বিশ্ব এখনো জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। গাজায় মানবিক কার্যক্রম সচল রাখতে প্রতিদিন অন্তত ৩ লাখ লিটার জ্বালানি প্রয়োজন হলেও রাফাহ ও জিকিম ক্রসিং বন্ধ থাকায় সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।

জাতিসংঘ মনে করিয়ে দিয়েছে যে, যুদ্ধের এই দুষ্টচক্র থেকে বাঁচার একমাত্র পথ হলো আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যখন মধ্যপ্রাচ্যের দিকে মনোযোগ দিচ্ছে, তখন সুদান, ইউক্রেন এবং কঙ্গোর মতো দেশগুলোতে চলমান দীর্ঘস্থায়ী সংকটগুলো যেন আড়ালে চলে না যায়, সে বিষয়েও বিশ্ববাসীকে সতর্ক করা হয়েছে।

এএম