মাইক্রোওয়েভ ওভেনে রান্না ও খাবার গরম করা কতটুকু নিরাপদ?

মাইক্রোওয়েভ ওভেনের খাবার খাওয়া কি নিরাপদ
মাইক্রোওয়েভ ওভেনের খাবার খাওয়া কি নিরাপদ | ছবি: এখন টিভি
0

ব্যস্ততম আধুনিক জীবনে কম সময়ে ও ঝামেলাহীনভাবে খাবার গরম বা রান্না করার সবচেয়ে সহজ মাধ্যম হলো মাইক্রোওয়েভ ওভেন (Microwave oven for quick cooking and heating)। তবে রান্নাঘরে এর নিয়মিত ব্যবহার নিয়ে পুষ্টিগুণ হ্রাস, ক্ষতিকর বিকিরণ এবং ক্যান্সার ঝুঁকির মতো নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক উঁকি দেয় অনেকের মনে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (World Health Organization) এবং আন্তর্জাতিক গবেষকদের মতে, সঠিক নিয়ম মেনে ব্যবহার করলে ওভেনের রেডিয়েশন নিয়ে ভয়ের কিছু নেই; তবে ভুল পাত্রে খাবার গরম করলে তা শরীরে মারাত্মক হরমোনের ব্যাঘাত ঘটাতে পারে (Is Microwave Oven Cooking Safe? Health Risks of Plastic Containers and Radiation Myths Defused)।

ওভেনের রেডিয়েশন কি সত্যিই ক্ষতিকর? সাইবার ও বিজ্ঞানীদের ব্যাখ্যা (Does Microwave Oven Radiation Cause Cancer?)

অনেকের ধারণা, ওভেন থেকে নির্গত তেজস্ক্রিয়তা খাবারের মান নষ্ট করে এবং ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞান ও বিকিরণ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওভেনে কোনো আয়োনাইজিং বিকিরণ (Non-ionizing electromagnetic radiation) ব্যবহার করা হয় না। এটি এক্স-রের মতো শক্তিশালী নয় এবং ডিএনএ ভাঙার ক্ষমতা রাখে না।

মাইক্রোওয়েভ মূলত কম ফ্রিকোয়েন্সির ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক তরঙ্গ ব্যবহার করে, যা খাবারের পানির অণুগুলোকে কম্পিত করে ঘর্ষণের মাধ্যমে তাপ উৎপাদন করে (How microwave heating works)। এই তরঙ্গ সম্পূর্ণ ওভেনের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকে। তাই ওভেনে খাবার গরম করার মাধ্যমে শরীরে তেজস্ক্রিয়তা ছড়ানোর কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি বা ঝুঁকি নেই (Microwave radiation myths and safety updates)।

আরও পড়ুন:

মাইক্রোওয়েভে রান্না করলে কি খাবারের পুষ্টিগুণ কমে যায়? (Does Microwaving Destroy Food Nutrients and Vitamins?)

গবেষণায় দেখা গেছে, যেকোনো রান্নার পদ্ধতিতেই কিছু না কিছু পুষ্টি উপাদান কমে, তবে ওভেনে রান্নার নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম রয়েছে:

ব্রোকলি ও ফ্ল্যাভোনয়েড: একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বেশি পানি দিয়ে ব্রোকলি ওভেনে দীর্ঘ সময় রান্না করলে এর ৯৭ শতাংশ প্রদাহপ্রতিরোধী ফ্ল্যাভোনয়েড নষ্ট হয়ে যায়। তবে মাত্র এক মিনিট বা অল্প সময়ে পানিতে সরাসরি সিদ্ধ না করে বাষ্পের মাধ্যমে ওভেনে দিলে পুষ্টিগুণ অক্ষুণ্ণ থাকে (Microwaving vegetables and flavonoid retention)।

ভিটামিন সি ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট: সাম্প্রতিক কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, সাধারণ চুলার চেয়ে ওভেনে মাঝারি তাপমাত্রায় রান্না করলে শাকসবজিতে সামান্য বেশি পরিমাণে ভিটামিন সি এবং প্রয়োজনীয় অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ধরে রাখা সম্ভব হয় (Microwave vs boiling for vitamin C)।

ওভেনে প্লাস্টিকের পাত্র ব্যবহার: হরমোন ও ডায়াবেটিসের নীরব ঝুঁকি (Danger of Using Plastic Containers in Microwave)

মাইক্রোওয়েভ ওভেনে প্লাস্টিক পাত্রের ব্যবহার নিয়ে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিজ্ঞানীরা। খাবার রাখার সাধারণ প্লাস্টিককে নমনীয় ও টেকসই করতে ‘থ্যালেট’ (Phthalates) এবং ‘বিসফেনল’ (BPA) নামক অত্যন্ত ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার করা হয় (Harmful chemicals like BPA and phthalates in plastic)।

যখন ওভেনের তাপমাত্রা ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায়, তখন প্লাস্টিক পাত্র খাবার স্পর্শ না করলেও ভেতরের বাষ্প ঢাকনায় জমা হয়ে রাসায়নিক মিশ্রিত পানি আবার খাবারে ফিরিয়ে আনে। এই রাসায়নিক শরীরের হরমোন ও বিপাকীয় প্রক্রিয়াকে তীব্রভাবে ব্যাহত করে (Endocrine disruptors and hormonal imbalance)। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এটি রক্তচাপ বৃদ্ধি, ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স (যা ডায়াবেটিসের মূল কারণ), থাইরয়েড সমস্যা এবং মেধা বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে (Health risks for children due to plastic toxins)।

আরও পড়ুন:

খাবার অসমভাবে গরম হওয়া ও রাসায়নিক বিক্রিয়ার ঝুঁকি (Uneven Heating and Chemical Risks in Microwave)

ওভেনে খাবার রান্নার আরেকটি সমস্যা হলো এটি খাবারকে সম্পূর্ণ সমান তাপমাত্রায় গরম করে না (Uneven heating in microwave)। খাবারের কোনো অংশ অতিরিক্ত গরম এবং কোনো অংশ ঠান্ডা থেকে যেতে পারে, যা কাঁচা খাবারের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করতে ব্যর্থ হয়। ব্যাকটেরিয়া মুক্ত করতে খাবারের ভেতরের তাপমাত্রা অন্তত ৮২ ডিগ্রি সেলসিয়াস হওয়া জরুরি।

এছাড়া আলু, পেঁয়াজ বা গাজরের মতো শর্করা জাতীয় খাবার উচ্চ তাপমাত্রায় ওভেনে রান্না করলে ‘অ্যাক্রিলামাইড’ (Acrylamide) নামক একটি রাসায়নিক তৈরি হতে পারে, যা ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় প্রাণীর শরীরে ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াতে দেখা গেছে (Acrylamide formation in high heat cooking)।

ওভেন ব্যবহারের নিরাপদ ও সঠিক গাইডলাইন (Safety Guidelines for Using Microwave Oven)

প্লাস্টিক বর্জন করুন: ওভেনে খাবার গরম করতে প্লাস্টিকের পাত্রের পরিবর্তে সম্পূর্ণ নিরাপদ সিরামিক বা ওভেন-প্রুফ কাঁচের পাত্র ব্যবহার করুন (Use ceramic or glass containers instead of plastic)।

রিসাইক্লিং সিম্বল যাচাই: যদি প্লাস্টিক ব্যবহার করতেই হয়, তবে পাত্রের তলায় ‘ইউনিভার্সাল রিসাইক্লিং সিম্বল’ এবং ‘মাইক্রোওয়েভ সেফ’ বাটন দেখে নিন। তবে পুরনো বা ভাঙাচোরা পাত্র একেবারেই ব্যবহার করবেন না।

একবারের বেশি গরম নয়: একই খাবার বারবার ঠান্ডা ও গরম করলে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ বাড়ে। তাই কোনো খাবার ওভেনে একবারের বেশি গরম করা উচিত নয়।

আরও পড়ুন:

আপনার ওভেন ব্যবহারের পাত্রটি নিরাপদ তো? (Test Your Kitchen Cookware for Microwave Safety)

আপনার ঘরের প্লাস্টিক বা সিরামিকের থালা-বাসনগুলো ওভেনে দেওয়ার উপযোগী কিনা, তা ঘরে বসেই মাত্র ২ মিনিটে পরীক্ষা করার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি এবং অনুমোদিত ওভেন-সেফ পাত্রের তালিকা গাইডটি দেখে নিন।

একনজরে মাইক্রোওয়েভ ওভেনের নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য নির্দেশিকা (Microwave Oven Safety and Health Guidelines at a Glance)



বিবেচ্য বিষয়
(Safety Elements)
বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা ও প্রভাব
(Scientific Facts & Effects)
নিরাপত্তা নির্দেশিকা
(Health Recommendations)
রেদিয়েশন ঝুঁকি
(Radiation Risk)
সম্পূর্ণ নিরাপদ। ওভেনে 'নন-আয়োনাইজিং' ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক তরঙ্গ ব্যবহৃত হয়, যা এক্স-রের মতো ডিএনএ নষ্ট করে না এবং ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায় না। রেডিয়েশন নিয়ে দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই, এটি শুধুমাত্র তরঙ্গের মাধ্যমে খাবারের পানির অণুতে ঘর্ষণ তৈরি করে তাপ বাড়ায়।
প্লাস্টিক পাত্র
(Plastic Ware)
অত্যন্ত বিপজ্জনক। উচ্চ তাপে প্লাস্টিক থেকে 'থ্যালেট' ও 'BPA' রাসায়নিক খাবারে মিশে হরমোন ব্যাহত, ডায়াবেটিস, থাইরয়েড ও শিশুদের মেধা বিকাশে ক্ষতি করে। প্লাস্টিক সম্পূর্ণ বর্জন করুন। খাবার গরম করতে বাধ্যতামূলকভাবে সিরামিক বা ওভেন-প্রুফ কাঁচের পাত্র ব্যবহার করুন।
পুষ্টি উপাদান
(Food Nutrition)
বেশি পানিতে দীর্ঘক্ষণ রান্না করলে ব্রোকলির মতো সবজির ৯৭% ফ্ল্যাভোনয়েড নষ্ট হয়। তবে বাষ্পের মাধ্যমে অল্প সময় ওভেনে রাখলে ভিটামিন সি ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ভালো থাকে। সবজি রান্নার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত পানি ব্যবহার না করে অল্প সময়ে বাষ্পায়িত (Steam) করার মাধ্যমে পুষ্টি বজায় রাখুন।
তাপমাত্রার সমতা
(Uneven Heating)
ওভেন খাবারকে সমানভাবে গরম করে না। ভেতরের কিছু অংশ ঠান্ডা থেকে যেতে পারে, যার ফলে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া সম্পূর্ণ ধ্বংস হয় না। ব্যাকটেরিয়া মুক্ত করতে খাবার অন্তত ৮২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে গরম করুন। কোনো খাবার বারবার ঠান্ডা ও গরম করা থেকে বিরত থাকুন।
অ্যাক্রিলামাইড ঝুঁকি
(Acrylamide Risk)
আলু, গাজর বা শর্করার মতো সবজি ওভেনে অতিরিক্ত উচ্চ তাপমাত্রায় রান্না করলে 'অ্যাক্রিলামাইড' নামক ক্ষতিকর কারসিনোজেনিক উপাদান তৈরি হতে পারে। শর্করা বা মূল জাতীয় সবজি ওভেনে উচ্চ তাপে দীর্ঘক্ষণ বেক না করে স্বাভাবিক চুলার পানিতে সিদ্ধ করা বেশি নিরাপদ।

হেলথ অ্যালার্ট: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর মতে, ওভেন নিজেই কোনো বিপদের কারণ নয়, বরং ব্যবহারের অসচেতনতাই বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি। বিশেষ করে ওভেনে প্লাস্টিকের ঢাকনা বা পুরোনো স্ক্র্যাচ পড়া প্লাস্টিক পাত্র গরম করলে বাষ্পের মাধ্যমে বিষাক্ত কেমিক্যাল খাবারে ফিরে আসে। সুস্থ থাকতে কিচেনে প্লাস্টিক পুরোপুরি বর্জন করে কাঁচ বা চিনা মাটির পাত্র ব্যবহার করাই সর্বোত্তম।

আরও পড়ুন:

এসআর