বিরল মৃত্তিকা খনিজ: স্মার্টফোন থেকে মিসাইল, কেন এ খনিজ এখন বিশ্বের ‘নতুন তেল’?

বিরল মৃত্তিকা খনিজের প্রতীকী ছবি
বিরল মৃত্তিকা খনিজের প্রতীকী ছবি | ছবি: এআই দ্বারা নির্মিত
0

পৃথিবীর মানচিত্রে এক অদ্ভুত যুদ্ধ চলছে এখন। এ যুদ্ধ তেল-গ্যাসের নয়; বরং লেজার, রাডার, স্মার্টফোন আর বৈদ্যুতিক গাড়ির অদৃশ্য এক শক্তি—বিরল মৃত্তিকা খনিজ (Rare Earth Mineral)। এই খনিজের টানেই যুক্তরাষ্ট্র-চীন পরাশক্তির দ্বন্দ্ব যেন নতুন মোড় নিয়েছে। আর এই বৈশ্বিক টানাপোড়েনের মধ্যেই আশার আলো দেখাচ্ছে বাংলাদেশের নদী। যমুনা, ধরলা ও সিলেটের বালুতে সম্প্রতি সন্ধান মিলেছে অর্থনীতির এই ‘ট্রাম্প কার্ডের’ (Trump Card of Economy)। কিন্তু এই প্রাপ্তিতে বাংলাদেশের আসল লাভটা কোথায়? কেন বিশ্ব এটাকে ‘একুশ শতকের অস্ত্রাগার’ বলছে? আসুন, বুঝে নেয়া যাক।

কেন এত কদর এই ‘বিরল মৃত্তিকা খনিজের? (Importance of Rare Earth MINERAL)

এরা প্রায়ই অদৃশ্য নায়কের মতো কাজ করে। দেখতে যা কালচে মাটি বা বালির কণা, সেটিই কি না আধুনিক সভ্যতার ‘ভিটামিন’! এর ভেতর থাকা নিওডিমিয়াম, ডিসপ্রোসিয়াম, টারবিয়াম বা স্যামারিয়ামের মতো ১৭টি মৌলের জাদুকরি বৈশিষ্ট্যের কারণেই আজ আমাদের হাতের স্মার্টফোন (Smartphones) এতটা স্মার্ট, এলইডি (LED) আলো এতটা সাশ্রয়ী, আর জেট ইঞ্জিন বা উইন্ড টারবাইন (Wind Turbine) এতটা শক্তিশালী। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই মৌলগুলো ছাড়া আধুনিক সবুজ জ্বালানি বিপ্লব (Green Energy Revolution) বা প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি (Defense Technology) কার্যত অচল।

চীনের একচেটিয়া রাজত্ব আর বিশ্বের হাঁসফাঁসানি (China's Monopoly and Global Crisis)

বিরল মৃত্তিকা খনিজের এই বাজারটাকে কেউ কেউ ‘পৃথিবীর সবচেয়ে নোংরা গোপন অস্ত্র’ বলেও মজা করেন। কারণটা সহজ: বিশ্বের মোট উৎপাদনের ৭০ থেকে ৯০ শতাংশই এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করে চীন (China)। চীন চাইলে কল বন্ধ করে দিতে পারে—এমন ভয় সব দেশের অর্থনীতির নাভিশ্বাস তুলেছে। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ (USGS) এবং বিভিন্ন গবেষণা বলছে, ২০২০ থেকে ২০৪০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক চাহিদা ৩ থেকে ৭ গুণ বাড়বে। এই অবস্থায় বাংলাদেশের মতো কোনো দেশে নতুন মজুদের সন্ধান মানে বৈশ্বিক বাজারে শুধু সরবরাহের বৈচিত্র্যই নয়, এটি কূটনৈতিকভাবে বাংলাদেশের অবস্থানও শক্ত করবে।

বাংলাদেশের ‘সোনার খনি’: লাভটা কোথায়? (Benefits for Bangladesh)

যদিও আমরা এখনো এই খনিজ ব্যবহার করি না বা বাণিজ্যিকভাবে তুলি না, তবু বাংলাদেশ ভূতত্ত্ব অধিদপ্তর (GSB) এবং আন্তর্জাতিক গবেষণা বলছে, যমুনা ও ধরলার পললে হালকা বিরল মৃত্তিকা (LREE) এবং ভারী বিরল মৃত্তিকার (HREE) বেশ ভালো উপস্থিতি রয়েছে। এখন পর্যন্ত আমরা এগুলোকে সাধারণ বালি ভেবে নদী ভরাট ও ভবন নির্মাণে ব্যবহার করছি। গবেষকেরা বলছেন, যদি সঠিক প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ আসে, তাহলে এই বালিই হতে পারে বিশাল এক রপ্তানি খাত (Export Sector)।

বাংলাদেশের জন্য সম্ভাব্য লাভ তিন স্তরের:

১. অর্থনৈতিক মুক্তি (Economic Freedom): বৈশ্বিক বাজারে দুষ্প্রাপ্য এসব ধাতুর দাম আকাশছোঁয়া। স্থানীয়ভাবে প্রক্রিয়াজাত করতে পারলে বৈদেশিক মুদ্রার বিশাল একটি দরজা খুলে যেতে পারে।

২. প্রযুক্তির ভিত (Technological Foundation): দেশীয় ইলেকট্রনিক্স, নবায়নযোগ্য জ্বালানি (Renewable Energy) ও প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তুলতে গেলে এই কাঁচামালই হবে মূল চাবিকাঠি।

৩. রাজনৈতিক গুরুত্ব (Political Significance): চীন-আমেরিকা দ্বন্দ্বে বিশ্ব যখন নির্ভরযোগ্য বিকল্প উৎস খুঁজছে, তখন বাংলাদেশ হতে পারে বিশ্বস্ত এক অংশীদার। টাইমস নাউ-এর মতো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমও বলছে, এই আবিষ্কার বাংলাদেশকে বিশ্ব মঞ্চে ভূরাজনৈতিকভাবে (Geopolitically) গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে পারে।

বাস্তবতা ও সতর্কতা: আশার ফানুস নয়, প্রয়োজন পরিকল্পনা (Reality and Planning)

তবে এখানেই গল্প শেষ নয়; বরং শুরু। এই মুহূর্তে বাংলাদেশের কাছে এই খনিজ তোলার মতো কার্যকর প্রযুক্তি বা বিপুল বিনিয়োগ (Investment) নেই। বরং বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, বিরল মৃত্তিকা খনিজ উত্তোলন অত্যন্ত পরিবেশবিধ্বংসী (Environmentally Damaging) একটি প্রক্রিয়া। এতে তেজস্ক্রিয় বর্জ্য, পানি দূষণ ও মাটি ক্ষয়ের মতো বড় ঝুঁকি থাকে। এখনই যদি আমরা পরিকল্পনা না করি, তাহলে সম্পদ রক্ষা করতে গিয়ে প্রকৃতিকে শেষ করে ফেলার আশঙ্কা থেকেই যায়।

তাই বিশেষজ্ঞদের শেষ পরামর্শ এটি ‘জ্যাকপট’ নয়, এটি সম্ভাবনার হাতছানি। নদী থেকে বালি তোলার আগে আমাদের দরকার সবুজ প্রযুক্তিনির্ভর নিষ্কাশন নীতি (Green Extraction Policy), পরিবেশগত সমীক্ষা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা। তবেই এই বিরল মাটি সত্যিই সোনায় পরিণত হবে।

এএম