রাঙামাটির পাহাড়ি বিস্তীর্ণ ঘন সবুজ প্রাকৃতিক বনভূমি একসময় ছিলো এশীয় মহাবিপন্ন প্রজাতি বুনো হাতির অবাধ বিচরণক্ষেত্র। মানুষের উপদ্রবহীন অবারিত নিরাপদ আবাস আর পর্যাপ্ত খাবারে অনকূল পরিবেশ ছিলো হাতির।
কিন্তু সেই বনভূমি দখল করে বন উজার, পাহাড় কাটা, সড়ক নির্মাণ, পর্যটনকেন্দ্র তৈরি ও জন বসতি সম্প্রসারণ হয়েছে দিনের পর দিন। সংকুচিত হয়েছে হাতির আবাসস্থল ও করিডোর। খাদ্য সংকটে পড়ে এখন হাতির দেখা মিলছে লোকালয়, সড়ক, এমনকি ফসলের ক্ষেতেও।
এতে হাতির আক্রমণে মানুষের প্রাণহানি, পঙ্গুত্ববরণ, ঘরবাড়ি, সহায় সম্পদ, ফসল ও যানবাহন মারাত্মক ক্ষতির শিকার হচ্ছে। বিপরীতে মানুষের হাতে প্রাণ হারিয়ে দিন দিন হাতির সংখ্যাও কমছে।
রাঙামাটির কাপ্তাই, বরকল ও লংগদু উপজেলায় প্রায় অর্ধশতাধিক হাতির মধ্যে গত দেড় দশকে ১৩ হাতির মৃত্যু হয়েছে। আর প্রাণ হারিয়েছেন ৩৬ জন ও পঙ্গু হয়েছেন অসংখ্য মানুষ।
স্থানীয়রা জানান, হাতি লোকালয়ে ঢুকে ঘর-বাড়ি ভেঙে দেয়, বাগান নষ্ট করে। মাঝে মাঝে রাস্তার ধারে বের হয়ে গাড়ি ভাঙচুর করে ও মানুষের ওপর আক্রমণ করে বলেও অভিযোগ তাদের।
আরও পড়ুন:
বন্য হাতির আক্রমণে নিহতের পরিবারকে তিন লাখ ও আহতকে এক লাখ টাকা হিসেবে গত ৫ বছরেই ১ কোটি ১৪ লাখ টাকা দিয়েছে বন বিভাগ।
হাতি-মানুষের সংঘাত বন্ধ ও হাতির বিলুপ্তি ঠেকাতে হাতির আবাসস্থল নিরাপদ ও খাদ্য সুরক্ষার তাগিদ বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের।
রাঙামাটি হিলি সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের সভাপতি ওমর ফারুক বলেন, ‘যে বনগুলো আছে, সেগুলো উজাড় করার কারণে হাতির স্বাভাবিক আবাস্থলগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সে কারণেই হাতিগুলো লোকালয়ে ঢুকছে।’
বন্যপ্রাণি বিশেষজ্ঞ ড. মিজানুর রহমান বলেন, ‘এটা কেন হচ্ছে, হাতির খাবার কী ধরনের, হাতি কীভাবে বেড়ে উঠছে, কোন পরিবেশে থাকছে, পরিবেশগত কী কী পরিবর্তন হচ্ছে, এগুলোর জন্য অনেক গবেষণা দরকার।’
হাতি-মানুষের এহেন সংঘাত বন্ধে হাতির খাবারের বনায়ন, মানুষকে সচেতন করা এবং এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম গঠন ও সোলার ফেন্সিং প্রকল্পসহ বিভিন্ন উদ্যোগের কথা জানান এক বন কর্মকর্তা।
রাঙামাটি সার্কেলের বন সংরক্ষক মোহাম্মদ আবদুল আউয়াল সরকার বলেন, ‘সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী আমাদের এই অঞ্চলে প্রায় ৪৫ থেকে ৫০টি হাতি থাকতে পারে। আপনারা জেনে খুশি হবেন যে, হাতি সংরক্ষণ প্রকল্প বাস্তবায়নে এরই মধ্যে বন অধিদপ্তর কাজ করছে।’
হাতির বসতি, বিচরণ ক্ষেত্র ও চলাচলের পথে মানুষের অবাধ যাতায়াত বন্ধ করতে হবে। গড়ে তুলতে হবে সহজলভ্য প্রাকৃতিক খাবারের বনায়ন। তবেই হাতি ও মানুষের প্রাণের সাথে সুরক্ষা পাবে প্রাকৃতিক ভারসাম্যও—এমন দাবি সংশ্লিষ্টদের।




