কারও সিভির ওপর লেখা সি, কারও ওপর ডব্লিউ, আবার কারও ওপর এমডি। শুনতে কোনো গোয়েন্দা কোড মনে হলেও, এগুলো আসলে আল-আরাফাহ ব্যাংকের নিয়োগ দুর্নীতির বিশেষ সংকেত।
তদন্তে দেখা গেছে, সি মানে খোদ চেয়ারম্যানের সুপারিশ, ডবলিউ মানে তৎকালীন এমডি ওয়াদুদ আর এএমডি মানে অ্যাডিশনাল ম্যানেজিং ডিরেক্টর। মেধা নয়, এই গোপন সংকেতের ওপর ভিত্তি করেই ব্যাংকটিতে নিয়োগ পেয়েছেন ১০৭ কর্মকর্তা-কর্মচারী।
অনিয়ম এখানেই শেষ নয়। মোট ১০৭ জনের মধ্যে ৩৯ জনই নিয়োগ পেয়েছেন কোনো ধরনের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি বা সার্কুলার ছাড়া। এদের মধ্যে ২০ জনের ব্যাংকিং সেক্টরে কাজের কোনো অভিজ্ঞতাই ছিল না, অনেকে এসেছেন গার্মেন্টস বা অন্য খাত থেকে।
এমনকি একবার ইন্টারভিউতে ফেল করা প্রার্থীকে সার্কুলার ছাড়াই পুনরায় ডেকে নিয়ে চাকরি দেয়ার অবিশ্বাস্য ঘটনাও ঘটেছে। নিয়ম ভেঙে দেয়া হয়েছে অতিরিক্ত বেতন আর পদোন্নতি।
নিয়োগের মতো এমন অনিয়মের কারণে ব্যাংক খাত প্রতিনিয়ত অস্থির হয়ে উঠছে জানিয়ে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাংলাদেশ ব্যাংককে মেরুদণ্ড সোজা রেখে ব্যবস্থা নিতে হবে। না হলে গ্রাহকের আস্থা আরও তলানীতে নামার শঙ্কা দেখছেন তিনি।
আরও পড়ুন:
অর্থনীতিবিদ ড. তৌফিকুল ইসলাম বলেন, ‘১০ জন যদি ডিরেক্টর হয়, সবাই পাঁচজন, পাঁচজন করে নিয়ে নেয়। যে আমি পাঁচজন অ্যাপয়েন্টমেন্ট দেব, আপনি দেবেন পাঁচজন এবং ওই পাঁচজনের থেকে ওরা আবার টাকা নেয়, তাই না? তো এই সমস্ত অনিয়মগুলো করে। ইসলামী ব্যাংক নিয়ে যে আন্দোলনগুলো হচ্ছে, এগুলো তো সব অনিয়মের ফসল। তো সুতরাং এগুলো গোড়াতেই শেষ করে দিতে হবে।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে দেখা গেছে, নিয়োগের ক্ষেত্রে সার্ভিস রুল বা বয়সসীমার কোনো তোয়াক্কাই করা হয়নি। এমনকি ইন্টারভিউ বোর্ডে প্রার্থীরা উপস্থিত ছিলেন কি না, তার প্রমাণ হিসেবে সিসিটিভি ফুটেজ বা হাজিরা খাতাও গায়েব করে দিয়েছেন অভিযুক্তরা। যেন পরিকল্পিতভাবেই সব তথ্য গোপন করা হয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, নিয়ম বহিঃর্ভূতভাবে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকুরিচ্যুতের পাশাপাশি এর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে নিতে হবে কঠোর ব্যবস্থা।
অর্থনীতিবিদ ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী বলেন, ‘এই নিয়োগ প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে আমার শুধু নেতৃস্থানীয় জায়গাতেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক নজরদারী করবে, বাকি প্রক্রিয়াগুলোর ঠিকমতো পালন হচ্ছে কি না এইটা দেখবে না। এইটা এজন্য আমরা এফোর্ড করতে পারবো না, কারণ হলো আমাদের দেশে আমরা জানি যে সিরিয়াস গভর্ন্যান্স ডেফিসিট আছে করপোরেট গভর্ন্যান্সে। সুতরাং ওই জায়গাটা থেকে যদি আমার চিন্তা করি, তাহলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটু বিশেষ মনোযোগের দরকার আছে।’
আরও পড়ুন:
পিয়ন থেকে শুরু করে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা—সবখানেই থাবা বসিয়েছে এই ‘সুপারিশি সংস্কৃতি’। বিষয়টি পর্যালোচনা করে বিধি অনুযায়ী কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করার কথা জানালেন ব্যাংক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘কোন ধারার ব্যত্যয় ঘটেছে, কোন আইনের লঙ্ঘন ঘটেছে, কোন ধারা উপেক্ষা করা হয়েছে, সেগুলো এগেইন্সটে আমার বলা আছে যে কোন ধারা লঙ্ঘন করলে কি ধরনের শাস্তি বা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ইন্সপেকশন টিম যেই রিপোর্ট করেছে, সেটা আমাদের পরিদর্শন দল কর্তৃক বা ওই ডিপার্টমেন্ট কর্তৃক এগুলি ফলোআপ করা হবে।’
যখন সাধারণ শিক্ষিত হাজারো যুবক একটি চাকরির জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন, তখন একটি ব্যাংকের শীর্ষ কর্তাদের এমন ‘পেন্সিল কোড’ বাণিজ্য ব্যাংকিং খাতের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাকে আরও তলানিতে নিয়ে যাচ্ছে।





