সংকট ও জটিলতায় সোনামসজিদ স্থলবন্দরে ধস, রাজস্ব ঘাটতি ২৮২ কোটি টাকা

সোনামসজিদ স্থলবন্দর
সোনামসজিদ স্থলবন্দর | ছবি: এখন টিভি
0

সোনামসজিদ স্থলবন্দরে জায়গা সংকট, ভারতীয় অংশে একতরফা মূল্যবৃদ্ধি এবং ঘন ঘন আমদানি-রপ্তানি বন্ধ থাকার কারণে কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। বন্দরে পর্যাপ্ত ইয়ার্ড না থাকায় প্রতিদিন ভারত থেকে আসা ৩০০ থেকে ৩৫০টি পণ্যবাহী ট্রাকের চাপ সামলানো কঠিন হয়ে পড়ছে। খালাস কার্যক্রমে ধীরগতি, দীর্ঘ যানজট ও ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত ব্যয় বাড়ছে। বছরে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারানোর পাশাপাশি সংকট কাটাতে দ্রুত বন্দর সম্প্রসারণ ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নের দাবি সংশ্লিষ্টদের।

সোনামসজিদ স্থলবন্দরে বর্তমানে সংকীর্ণ সড়ক, পর্যাপ্ত জায়গার অভাব, অবকাঠামো উন্নয়নের ধীরগতিতে ব্যবসায়ীরা পড়েছেন চরম ভোগান্তিতে। এর সঙ্গে ভারতীয় অংশে একতরফাভাবে বিভিন্ন চার্জ ও মূল্য বৃদ্ধি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। যার কারণে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ে প্রায় ২৮২ কোটি টাকার ঘাটতি হয়েছে।

ব্যবসায়ীরা জানান, ফাইলের জন্য আমাদের রাজস্ব পাঠাতে হয়। টাইম লাগে, প্রসেস লাগ। এজন্য দাপ্তরিক কাজ সময়মতো হয় না। আর ফিজিক্যালি না থাকলে হয় না। আমাদের কাস্টমাইজেশন দরকার।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, গার্মেন্টস পণ্য স্থলবন্দরের পরিবর্তে সমুদ্রবন্দর দিয়ে রপ্তানি করতে হচ্ছে, ফলে সোনামসজিদ স্থলবন্দরের কার্যক্রম ও রাজস্ব আদায় কমে যাচ্ছে।

ব্যবসায়ীরা জানান, আমাদের উৎপাদন ক্ষমতা আছে, তারপরও আমরা দিতে পারছি না একমাত্র সি-পোর্টে যাওয়ার কারণে। যদি এটা ল্যান্ড পোর্টে ফিরে আসে, তাহলে অবশ্যই এক্সপোর্টের ক্ষেত্রে এটা ব্যবসার জীবন পাবে। আগে এই বন্দরে মাসুল নেয়া হতো এক পার্টের। অর্থাৎ একবার লোড-আনলোড করলে একবার বিল নেয়া হতো। কিন্তু এখন তারা ডাবল বিল নিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

স্থলবন্দরে আমদানি-রপ্তানি কমে যাওয়ায় কাজের সংকটে পড়েছেন শ্রমিকরা। একসময় প্রতিদিন ৫০০ টাকারও বেশি আয় হলেও বর্তমানে তা গড়ে ১৫০ টাকায় নেমেছে।

শ্রমিকরা জানান, কাজ অতি কম। দিনমজুরি কম আসছে শ্রমিকদের। কোনোদিন গাড়ি একটা পাচ্ছি, কোনোদিন পাচ্ছি না। আমরা কী করে খাবো?

শ্রমিক নেতাদের দাবি, অবকাঠামো উন্নয়ন না হওয়ায় পণ্য আমদানি কমছে। আগে পাথরের ট্রাক শ্রমিকরা লোড-আনলোড করলেও এখন মেশিনে সেই কাজ হওয়ায় অনেক শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন।

সোনামসজিদ মায়ের দোয়া শ্রমিক সংগঠনের সভাপতি মুখলেসুর রহমান সরকার বলেন, ৩০০-তে মনে করেন ১০০-তে পাথর, অন্যান্য মালামাল বাকি ২০০-ই হলো পাথর। তো পাথরের তো জেসিবি দিয়ে আনলোড হয়, আমাদের শ্রমিকের কোনো এখানে কর্ম নাই।

অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে ব্যবসায়ীরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। তাই পূর্ণাঙ্গ স্থলবন্দর গঠনের দাবি সিঅ্যান্ডএফ নেতাদের।

সোনামসজিদ স্থলবন্দর সিঅ্যান্ডএফের সাধারণ সম্পাদক রুহুল আমিন বলেন, ‘নানান জটিলতায় আমরা ভোগান্তিতে থাকি। অনেক ইমপোর্টার এখানে হয়রানির কারণে, যানজটের কারণে আসতে চায় না।’

সোনামসজিদ আমদানি ও রপ্তানিকারক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক মো. আরিফ উদ্দিন ইতি বলেন, ‘এই পোর্টটা যাতে বৈধ পথে বৈধ পণ্য আসে, এটার জন্য আমরা প্রশাসনসহ সর্বোত্তম জায়গায় আমরা আলোচনা করছি এই অসাধু ব্যবসায়ী বন্ধ করার জন্য।’

বন্দরের পরিধি বাড়াতে সরকারের কাছে আরও ২২ একর জমি বরাদ্দের আবেদন করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পানামা পোর্ট লিংক লিমিটেড কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে নানা সমস্যার কারণে ২০২৫–২৬ অর্থবছরে প্রায় ২৮২ কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি হয়েছে বলে দাবি কাস্টমসের।

সোনামসজিদ পানামা পোর্ট লিংক লিমিটেডের ম্যানেজার মো. মাইনুল ইসলাম বলেন, ‘স্থলবন্দরের সাথে যে এগ্রিমেন্ট আছে সে অনুযায়ী টোটাল কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে এবং ২২ একরের আরেকটা আবেদন দেয়া আছে, এটা চলমান। এটা হলে হয়তো আমাদের তখন আরও আমদানি-রপ্তানি কার বৃদ্ধি পাবে এবং রাজস্ব আদায় হবে বলে আমি আশা করি।’

কাস্টমস সোনামসজিদের রাজস্ব কর্মকর্তা হুমাউন কবির বলেন, ‘ব্যাংকের সঙ্গে এবং এখানে যারা স্টেকহোল্ডার আছেন তাদের সাথে বিভিন্ন সময় সভা-সেমিনার আমরা করছি। তো ব্যবসায়ীদের ওপরেও এটা ডিপেন্ড করে যে তারা কী পরিমাণ আমদানি করবে এবং ডলার যদি একটু ডলারের মানটা যদি একটু কমে আসে, সেক্ষেত্রে আমদানিটা একটু বাড়বে।’

১৯৯২ সালে ১৯ দশমিক ১৩ একর জায়গায় ‘সোনামসজিদ শুল্ক স্টেশন’ নামে যাত্রা শুরু করে বন্দরটি, যা পরে 'সোনামসজিদ স্থলবন্দর' নামে পরিচিতি পায়। বন্দরটিতে ২০২৫–২৬ অর্থবছরে ১ হাজার ১০১ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রা বিপরীতে রাজস্ব আদায় হয়েছে ৮১৯ কোটি টাকা।

ইএ