প্রবাস
অর্থনীতি

অভিবাসন ব্যয়ের বিপরীতে প্রবাসী আয় কম

সরকার নির্ধারিত খরচে বাংলাদেশি কর্মীদের বিদেশ পাড়ি দেয়া অনেকটা স্বপ্নের মতো। কিন্তু মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যে তা যেন ফিকে হয়ে যায়। পরিসংখ্যান বলছে, একজন বাংলাদেশিকে বিদেশ পাড়ি দিতে গড়ে খরচ করতে হয় ৪ লাখেরও বেশি টাকা। অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাড়তি ব্যয় কমাতে রিক্রুটিং ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজন কঠোর নজরদারি। এদিকে, জিটুজি চুক্তি মেনে অভিবাসন ব্যয় কমানোর আশ্বাস প্রবাসীকল্যাণ প্রতিমন্ত্রীর।

কুমিল্লার দাউদকান্দির মারুকা ইউনিয়নের যুবক হাসান তালুকদার ভাগ্য বদলের আশায় ওমানে পাড়ি জমিয়েছিলেন ২০১৭ সালে। কিন্তু ৫ বছর পর দেশে ফিরে আসেন শুণ্য হাতে।

সে সময় ৩ লাখ ৩০ হাজার টাকা খরচ করে বিদেশে গেলেও পাননি কাঙ্ক্ষিত বেতনের চাকরি। যে কাজের আশায় মা, মাটি আর মাতৃভূমির টান ত্যাগ করেছিলেন সে আশায় গুঁড়েবালি। জেলও খাটতে হয়েছে এক মাসের বেশি।

হাসান বলেন, '৪২ জন ধরা খাওয়ার পর আমাদরে জেলে নিয়েছিল। এর কারণ হলো আমাদের অবৈধতা। মানে যেখানে কাজ করতাম তার আইডি কার্ড ছিল না। সেজন্য কোম্পানির ওপর একটা জরিমানা আসে, এরপর আমাদের ওপরও একটা জরিমানা আসে। কোম্পানির জরিমানা দিতে একট দেরি হয়েছে। সেজন্য আমাদের প্রায় ১ মাস ৯ দিন জেলে থাকতে হয়েছে।'

তার মতো অনেক অভিবাসীর ভাগ্য মিলিয়ে যায় অমানিশায়। ধার-দেনা কিংবা সহায়-সম্বল বিক্রি করে যে টাকা ব্যয় করে স্বপ্ন বোনেন, শেষ অবধি তা অধারাই থেকে যায়।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো'র প্রবাসী কর্মীদের অভিবাসন ব্যয় সংক্রান্ত জরিপের প্রতিবেদনে দেখা যায়, একজন বাংলাদেশিকে বিদেশ পাড়ি দিতে খরচ করতে হয় ৪ লাখ ১৬ হাজার ৭৮৯ টাকা। বিপরীতে মাসিক গড় আয় ২৩ হাজার ৬৯৩ টাকা। অর্থাৎ খরচ করা টাকা তুলে আনতে সময় লাগে গড়ে প্রায় ১৭ মাসেরও বেশি।

দক্ষ পুরুষ অভিবাসীদের ক্ষেত্রে এই ব্যয় ৪ লাখ ২৭ হাজার ২১৭ টাকা। যাদের মাসিক আয় ২৯ হাজার ৪৭৭ টাকা। তবে অদক্ষ অভিবাসীদের ক্ষেত্রে সে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৪ লাখ ৭৭ হাজার ৯২৭ টাকা। আর গৃহকর্মীদের বিদেশ গমনের খরচ পড়ে ১ লাখ ১৮ হাজার ৯৬৪ টাকা। মাসিক ১৬ হাজার ৬৭৮ টাকা বেতনে এই ব্যয় তুলতে তাদের সময় লাগে প্রায় ৭ মাস।

পরিসংখ্যানে আরও দেখা যায়, বাংলাদেশ থেকে সিঙ্গাপুরগামী অভিবাসীদের খরচ সবচেয়ে বেশি। ৫ লাখ ৭৪ হাজার ২৪১ টাকা। সরকার নির্ধারিত ফি'র তুলনায় যা ৩ লাখ টাকা বেশি। সৌদি আরবে যেতে ব্যয় ৪ লাখ ৩৬ হাজার ৩৬৬ টাকা। নির্ধারিত ব্যয়ের চেয়ে আড়াই লাখ টাকার বেশি। সর্বোচ্চ ব্যয়ের এই তালিকায় তৃতীয় অবস্থানে মালয়েশিয়া, চতুর্থ কাতার ও পঞ্চম অবস্থানে আছে ওমান।

অভিবাসন ব্যয় কমাতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে জিটুজি চুক্তি থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়া যেন অনেকটাই মধ্যস্বত্বভোগীদের দখলে। আর তাই অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশ থেকে বিদেশ যেতে ব্যয় যেমন বেশি, তেমনি অভিবাসন ব্যয়ের বিপরীতে প্রবাসী আয়ের পরিমাণ অনেক কম।

অভিবাসন ব্যয় বেশি হওয়ার কারণ হিসেবে মধ্যস্বত্তভোগীদের দৌরাত্ম্যকে দুষছেন অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা। এ অবস্থার অবসানে রিক্রুটিং ব্যবস্থাপনাকে নজরদারির মধ্যে নিয়ে আসা এবং জনশক্তি রপ্তানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয় জরুরি বলে মনে করেন তারা।

ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচি প্রধান শরীফুল হাসান বলেন, 'সৌদি আরব থেকে বা অন্য কোনো দেশথেকে ভিসা আনা থেকে শুরু করে বাংলাদেশের যে কর্মী যাবে তার প্রত্যেকটি ধাপে মধ্যস্বত্বভোগী রয়েছে। আমাদের এই মধ্যস্বত্বভোগী রিক্রুটমেন্ট সিস্টেমগুলো কিভাবে একটা ওয়ান স্টপ সেন্টার বা ডিজিটালাইজেশনের ভেতর আনা যায় তা নিয়ে কাজ করতে হবে। পাশাপাশি যে যাচ্ছে তারও দায়িত্ব রয়েছে।'

অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রাম (ওকাপ) বলছে, অভিবাসন খরচ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ ভিসা বাণিজ্য। দেশের বেশকিছু রিক্রুটিং এজেন্সি অভিবাসন ব্যয় নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে জড়িত। যাদের খপ্পরে পড়ে গুণতে হচ্ছে বাড়তি টাকা । অভিবাসন ব্যয় কমাতে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান তাদের।

ওকাপ চেয়ারম্যান শাকিরুল ইসলাম বলেন, 'একজন মানুষ ৫ লাখ টাকা দিয়ে যাচ্ছে। এই টাকার একটা বড় অংশ বিদেশে চলে যাচ্ছে ভিসা কেনার জন্য। প্রচুর পরিমাণে ভিসা ট্রেডিং হচ্ছে। ওই দেশের কোনো এমপ্লয়ারের সাথে এ দেশের রিক্রুটিং এজেন্সির যারা সম্পৃক্ত তারা ভিসাগুলো কিনছে। এবং এই ভিসাগুলো কেনার কারণে তাদের একটা বড় ফি দিতে হচ্ছে। এটা কমানোর দায়িত্ব হচ্ছে রাষ্ট্রের।'

অভিবাসন ব্যয় কমানোর বিষয়টি আলোচনা হচ্ছে দীর্ঘদিন থেকেই। কিন্তু এই ব্যয় কমানোর উদ্যোগ আশ্বাসেই সীমাবদ্ধ।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী শফিকুর রহমান চৌধুরী বলেন, 'একজন মানুষ যদি বিদেশ যাবে। সেই বিদেশ যাওয়ার জন্য যদি তার ভিটামাটি বিক্রি করে ফেলে তাহলে তার লাভটা হলো কি। সেদিকে বিবেচনা করেই আমরা কাজ করে যাচ্ছি।'

অভিবাসীদের শ্রমে-ঘামে সচল দেশের অর্থনীতি। তাই শুধু অভিবাসন ব্যয় কমানো নয়, পুরো সেক্টরেই সংস্কারের তাগিদ বিশেষজ্ঞদের। যেন নিরাপদ অভিবাসন, দক্ষ জনশক্তি প্রেরণ ও রেমিট্যান্স প্রবাহ যুগপৎ বৃদ্ধি পায়।

এমএসআরএস

এই সম্পর্কিত অন্যান্য খবর