অর্থনীতি
হালখাতার শূন্যতায় লোকায়ত শিল্প, গ্রামীণ মেলার যৌথ পরিবার
বছরজুড়ে 'আমার সন্তান যেনো থাকে দুধে ভাতে' তাই ফুলে ফলে জলের সম্পদের ভান্ডার পূর্ণ রাখার এক প্রার্থনায় একক সামিল হন এক মিছিলে, এক বটের নিচে, এক পরিচয়ে, 'বাঙালি'। কিন্তু দুঃখজনকভাবে গ্রামে কমেছে মেলা, উপলব্ধীহীন চর্চায় গন্তব্যহীন পড়ছে যৌথ পরিবারের হালখাতার অংশীজনেরা। তাঁতি, বেত, শীতলপাটি, হাতপাখা, কামার, কুমার, পটশিল্পী আর খেলাধুলার সাথে জড়িয়ে থাকা গ্রামের সম্মিলন আর অর্থনীতি স্মৃতি হয়ে যাচ্ছে মিঠে নকুলদানার মতো।

ঝড় আসার আগে ডাকপিয়নের নিয়ে আসা চিঠি, কখনও হাই তোলার মতো একটু আধটু হাওয়া। পৃথিবীর তপ্ততায় চুরি করা মেটে রং নিয়ে গায়ে আবির মেখে, নিজেকে বাঁচিয়ে চলা নীলাকার মহাশূণ্য। এই সময় কৃষক রুহুল আমিনের ভীষণ তাড়া। বদ্ধ বাতাসের পর জল গড়ানোর আগেই তৈরি করে দিতে হবে মাটি। হালের গরুর খরচ অনেক, তাই ঘোড়া দিয়ে হাল চাষ। ঘোড়ার গায়ের ঢেউ খেলা নরম লোমে এখনও কাটেনি শৈশবের সুবাস।

রুহুল আমিন বলেন, 'আমি প্রায় ৮ থেকে ১০ বছর হলে ঘোড়া পালন করি। আমার হালের গরু দুইটা একসাথে মারা যাওয়ার পর পুঁজি না থাকায় ঘোড়া দিয়েই হাল চাষ করি। এখন আর গরুর প্রয়োজন হয় না। এই ঘোড়া দিয়েই চাস করি এখন সব।'

খরচ বাঁচাতে গরুর জায়গায় ঘোড়া দিয়ে হাল চাষ করছেন চাষী রুহুল আমিন। ছবি: এখন টিভি

রুহুল আমিনের ঘোড়া এখনও অবুঝ, কিন্তু তার কথা শুনেন। বৈশাখের বছরে এটি তারা হারাধনের হারানো পুত্র। কিন্তু খুব আক্ষেপ তার, গ্রামে আর বৈশাখ আগের মতো আসে না। কোথাও যেনো সবাই বিচ্ছিন্ন আর একক।

তিনি বলেন, 'এখন তো মানুষ মূল্য দেয় না। আগের কয়েকজন আছেন তারাই বিভিন্ন নিয়ম পালন করে এখনও। বৈশাখে বীজ রাখতো বিভিন্ন ফসলের, ভালো খাবার খেত, ভালোভাবে চলাফেরা করতো। নতুন বছরের উৎসব করতো আরকি।'

কাঁকন নদী জড়িয়ে রেখেছে রুহুল আমিনের গ্রাম। অশ্বথ গাছের গোড়ায় বাঁধানো ঘাট বেয়ে জলহীন নদীতে অন্য এক কৃষক, জয়দেব নেমে যান সবুজ ধানের ক্ষেতে। নদীতে বাঁধ দেওয়ায় এই গ্রামে জল গড়াতে গড়াতে আষাড়। ধানের ক্ষেতের বপন ভালো, তবে জলের খুব অভাব।

এই কাঁকন নদীকে ঘিরে শতবর্ষী মেলার পুরানো মানুষটির নাম রাধা চন্দ্র বর্মন। তিনি মিষ্টভাষী, কথা কম বলেন। উত্তর দেন মেপে মেপে।

নদীর পাড়ে অসাম্প্রদায়িকতা নিয়ে বেড়ে উঠেছে ৭০ বছরের অশ্বথ গাছ। ডাল আর জটা বেয়ে মাঠজুড়ে নিজের অভিভাবকত্ব জানান দেয় শৈশবের স্মৃতি। বটের জটা বেয়ে নেমে আসে বৈশাখের মেলা, নানা এলাকা-জেলা থেকে আসা কারুপল্লীর নাম না জানা শিল্পী আর মানুষের কথা। ছোট থেকে বড়, সমাজের শ্রেণীর খেতাব সরিয়ে এক হয়ে যাওয়া এক যৌথ পরিবারের গল্প।

রাধা চন্দ্র বলেন, 'সব বিক্রি হতো, যে যেটা নিয়ে আসে সেটাই বিক্রি হতো। অনেকে দূর থেকে এসে দোকান দিতো। কোনো প্রকার কোনো ঝামেলা হতো না। কিন্তু এখন সেগুলো হারিয়ে গেছে। এখন কোনো মেলাা হয় না।'

ছোট্ট থেকে বেড়ে ওঠা অনেক যুবকের সম্প্রিতির সাথে পরিচয় এখান থেকে। তারা মেলায় দোকান নিয়ে আসতো দূর-দূরান্ত থেকে।

একজন যুবক বলেন, 'পাটের বস্তা নিয়ে আসতাম। পাটের বস্তার নিচে টাকা রেখে উপরে জিনিসপত্র রেখে বিক্রি করতাম। দিনশেষে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা লাভ হতো। এ‌খানে বিক্রি শেষ করে, এখান থেকে মুড়ি, নিমকি কিনে নিয়ে যেতাম।'

অন্য একজন যুবক বলেন, 'এখন তো আর আগের মতো মেলা হয় না। আগে আমাদের প্রতিবেশিদের মধ্যে একটা মিল ছিল। পহেলা বৈশাখ উপলক্ষ্য করে ছোটখাট মেলা হতো। একদিন থেকে তিনদিনের মেলা হতো। এখন তো তিন দিন দূরের কথা একদিনই হয় না মেলা।'

এখন টিভিকে নিজের ছোটবেলার মেলার অভিজ্ঞতা জানাচ্ছেন এক যুবক। ছবি; এখন টিভি

নদী ঘেরা নরসিংদীর মেলা কমেছে ৪০ শতাংশ। নানা দম্ভের টানাপোড়ানে কমেছে মেলা। তাতে লাভ আর ক্ষতির আনুপাতিক হারও হার মানায়।

কবি ও লেখক শামীম আজাদ বলেন, 'আমরা ছোট বেলায় রবীন্দ্রনাথের মাথা নাড়ানো পুতুল কিনেছি, নজরুলের ঝাকড়া চল ওয়ালা পুতুল মাটির কিনেছি। এগুলো আমাদের শিল্প, সংস্কৃতি। আর সংস্কৃতির সাথে আমাদের পটুয়াদের জীবন যুক্ত। এরমধ্যে পটুয়া আছেন, মিষ্টি কারিগড় আছেন, তাঁতি, কামার আছেন। মানুষের যে সহজাত সৃষ্টি এগুলো নিয়ে মানুষ মেলাতে আসেন।'

শামীম আজাদ আরও বলেন, 'এই মানুষগুলোর বেঁচে থাকার বা সারা বছর অপেক্ষা করে থাকার পর শখের জিনিসগুলো বিক্রি করে পকেটে কিছু পয়সা আসে।'

কৃষক আর গ্রামের মানুষের কাছে প্রতিদিনের হিসেব থাকলেও সুসময়ের ঋতুগুলো আমন্ত্রীত হয় যাপনের শহরে। বৈশাখ আসার আগে আভাস দেয় মিছে বৃষ্টি।

এই শহরে বৃষ্টির দুরত্ব জীবনের মতো একটি মোটা কাচের ব্যবধান। শহরও সাজে বৈশাখে। তাই কদর বাড়ে প্রান্তজনের। গ্রাম ছাড়া বৈশাখ নিস্ব:ঙ্গ। এক টুকরো শহর আর শিল্প আর গ্রাম চলে আসে শ্মশান চাপায় ভর করে। বকুল তলায় নেমে আসে রূপকথা, শেকরের গল্প আর সম্পর্ক।

শামীম আজাদ বলেন, 'একেবারে শিশুকাল থেকে আমরা আমরা অনেককিছু শেখাই। যা সহজাত নয়। কিন্তু যেগুলো জরুরি সে প্রক্রিয়ায় শেখাতে হবে।'

গ্রামের শূণ্যতা কাটাতে বাণিজ্যিক শহরের তাকে আর কাঁখে ওঠে শষ্য আর খাদ্যের উপকরণের সাদৃশ্য ঢেকি, কুলা, নৌকা, মাটির বাসন। আসে গ্রামের শিল্পীদের ট্যাপা পুতুল আর হাত পাখা। গ্রাম ছাড়া শহরের বৈশাখ অর্থহীন। যারা ছেড়ে আসেন তারা রেখে আসেন।

ঝড় আসার আগের ডাক পিয়নের নিয়ে আসা চিঠি, চিঠিতে লেখা - স্বাগত এলাম আমি বৈশাখী, আমাকে রুখবে কে!

এমএসআরএস