উৎপাদন কমায় নাগালের বাইরে ইলিশের দাম, বিপাকে ক্রেতারা

ইলিশের বাজার
ইলিশের বাজার | ছবি: এখন টিভি
0

মৎস্যসম্পদ রক্ষায় প্রায় সারা বছরই নদী ও সমুদ্রে চলে অভিযান। তবে সেই প্রচেষ্টার পরও বরিশাল বিভাগজুড়ে দিন দিন কমছে ইলিশের উৎপাদন। চলতি অর্থবছরে উৎপাদন কমেছে প্রায় এক লাখ মেট্রিক টন। বরিশালের বিভিন্ন বাজারে এখন ইলিশের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।

দেশের মৎস্যসম্পদ রক্ষা এবং জাটকা নিধন প্রতিরোধে বছরজুড়েই সক্রিয় থাকে নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড ও নৌপুলিশ। নিয়মিত অভিযানে আটক করা হয় জেলেদের, জব্দ করা হয় হাজার হাজার মিটার অবৈধ জাল। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে—এসব অভিযানের মূল উদ্দেশ্য কতটা সফল হচ্ছে? কতটা বাড়ছে দেশের প্রধান অর্থকরী মাছ ইলিশের উৎপাদন?

মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী বরিশাল বিভাগে গত কয়েক বছর ধরে ইলিশ উৎপাদনে ওঠানামা থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে তা ধারাবাহিকভাবে কমছে।

মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী সাম্প্রতিক সময়ে ইলিশ উৎপাদন

২০১৯-২০ অর্থবছর: ৩ লাখ ৫৭ হাজার ৯৮৭ মেট্রিক টন

২০২০-২১ অর্থবছর: ৩ লাখ ৬৯ হাজার ৩০১ মেট্রিক টন

২০২১-২২ অর্থবছর: ৩ লাখ ৬৯ হাজার ৮৫১ মেট্রিক টন

২০২২-২৩ অর্থবছর: ৩ লাখ ৭২ হাজার ৩৪৩ মেট্রিক টন

২০২৩-২৪ অর্থবছর: ৩ লাখ ৪৮ হাজার ৮৪৩ মেট্রিক টন

২০২৪-২৫ অর্থবছর: ৩ লাখ ৩৪ হাজার ৭৮৩ মেট্রিক টন

আরও পড়ুন:

মৎস্য বিভাগ বলছে, অভয়াশ্রমে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা সফলভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। তবে নদীতে পর্যাপ্ত পানি ও স্রোতের অভাব, ডুবোচর সৃষ্টি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ইলিশের স্বাভাবিক চলাচল ও প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে।

এসব সমস্যা কাটিয়ে উঠতে নদীর মোহনায় ড্রেজিংসহ বিভিন্ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগের কথা জানালেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

বরিশাল মৎস্য অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. মহসীন বলেন, ‘নদী টু সাগর, সাগর টু নদী। এটা তাদের লাইফ স্পেরই অংশ। সো এটা যখন বাধাগ্রস্ত হয়, তখন কিন্তু আপনার ডিম ছাড়ার পরিমাণ, জাটকা সার্ভাইভেল হওয়ার পরিমাণ সবই কিন্তু কমে যায়। এ কারণে কম। এরপর মনুষ্যসৃষ্ট কিছু কারণ তো আছেই, সব মিলিয়েই আসলে কমে যাচ্ছে।’

ইলিশ উৎপাদন কমে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বরিশালের ঐতিহ্যবাহী মাছের বাজারগুলোতে। যে বাজারে একসময় ইলিশের রাজত্ব ছিল, সেখানে এখন পর্যাপ্ত ইলিশের দেখা মেলাই কঠিন। ব্যবসায়ীরা জানান, পাঁচ বছর আগেও পোর্ট রোড বাজারে প্রতিদিন দুই থেকে আড়াই হাজার মণ ইলিশ সরবরাহ হতো। এখন সেই সরবরাহ নেমে এসেছে প্রায় এক-তৃতীয়াংশে। ফলে ক্রেতাদের পাশাপাশি লোকসান গুনতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদেরও।

ব্যবসায়ীদের মধ্যে একজন বলেন, ‘অনেক মাছ ছিল। আমাদের এই ঘাটে এমন দিন আছে চার হাজার, পাঁচ হাজার, দশ হাজার মণ মাছও হইছে। এখন ছোট ছোট খররা কয়, ওইডাই ইলিশের বাচ্চা। ওইডা চেক দিতই হইবো। জনগণও সতর্ক হইতে হইবো।’

আরও পড়ুন:

পোর্ট রোড আড়তদার মালিক সমিতির সদস্য জামাল হোসেন বলেন, ‘এখন কমতে কমতে আমাদের ইলিশ মাছ আর চাষের মাছ মিলিয়া গড়ে এক হাজার ৫০০ মণ মাছ আসে। পাঁচ বছর আগে তো অতুলনীয়, মিনিমাম এর পাঁচ-ছয় গুণ। তখন তো একটা আড়তদারের মাছ আর এহন ৫০টা আড়তদারের মাছ।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, নিষেধাজ্ঞা ও অভিযান থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে না। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করা গেলে ইলিশের সুদিন আবারও ফিরিয়ে আনা সম্ভব বলে মনে করেন তারা।

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের চেয়ারম্যান ড. হাফিজ আশরাফুল হক বলেন, ‘এই নদীগুলোকে পুনরুজ্জীবন দান করতে হবে এবং এটা ইন্টারন্যাশনাল যে আইন, সেই অনুযায়ী আমাদের পানির হিস্যা বাড়ানো। যখন ন্যাচারাল ফ্লোকে হচ্ছে একটা নির্দিষ্ট মাত্রায় চালু করা হবে, তখন আবার নদীতে স্রোত ফিরে আসবে। আবার ইলিশের আপনার সয়লাব হয়ে যাবে।’

গত দুই বছরে বরিশাল বিভাগে ইলিশের উৎপাদন কমেছে প্রায় ৩৮ হাজার মেট্রিক টন। আর চলতি অর্থবছরে উৎপাদন কমেছে প্রায় এক লাখ মেট্রিক টন। এ ধারা অব্যাহত থাকলে দেশের জাতীয় মাছ ইলিশের উৎপাদন ভবিষ্যতে আরও সংকটের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।

এসএস