গত জুনে রাউজানের পাহাড়তলী এলাকায় রাঙ্গুনিয়া যুবদলের আহ্বায়ক মাসুদুল হক চৌধুরীকে প্রকাশ্যে ধাওয়া করে গুলি করে হত্যা করা হয়। তার এক মাস আগে নগরীর রৌফাবাদ এলাকায় অস্ত্রের মুখে তাড়া করে গুলি করে হত্যা করা হয় আরেক যুবককে।
এর আগে, গত নভেম্বরে চট্টগ্রাম-৮ আসনের সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহর জনসংযোগ কর্মসূচির মধ্যে সরওয়ার বাবলা নামে এক সন্ত্রাসীকে মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনায় এমপি এরশাদ উল্লাহও আহত হন।
শুধু সাধারণ মানুষই নয়, সন্ত্রাসীদের হামলার শিকার হয়েছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও। জঙ্গল সলিমপুরে সংঘবদ্ধ হামলায় এক র্যাব সদস্য নিহত হন। পরে র্যাব ক্যাম্পে হামলা, বুলডোজার দিয়ে ক্যাম্প গুঁড়িয়ে দেয়া, গুলিবর্ষণ এবং পানির লাইনে বিষ মেশানোর মতো ঘটনাও ঘটে।
সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর চট্টগ্রামে সন্ত্রাসী তৎপরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। এক বছরে মহানগর ও জেলায় মোট ১৯৪টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে মহানগরে ৬১টি এবং জেলায় ১৩৩টি। আধিপত্য বিস্তার, গ্যাং সংস্কৃতি, মাদক, বালুমহল নিয়ন্ত্রণ ও চাঁদাবাজিকে এসব হত্যাকাণ্ডের প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
র্যাব-৭-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান বলেন, ‘সন্ত্রাসীদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার ও বালুমহল নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে অধিকাংশ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। এতে নিরপরাধ মানুষও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।’
চাঁদাবাজির ঘটনাও উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। পুলিশ পাহারার মধ্যেই এক ব্যবসায়ীর বাড়িতে এসএমজি দিয়ে গুলিবর্ষণ, ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানে হামলা, হাটহাজারী, মুরাদপুর ও হিলভিউসহ বিভিন্ন এলাকায় নির্মাণাধীন ভবন ও বাসাবাড়িতে চাঁদার দাবিতে গুলি ছোড়ার ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সাধারণ সম্পাদক আক্তার কবির চৌধুরী বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হয়নি। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নাগরিকবান্ধব ভূমিকা পালন করতে হবে।’
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামের সন্ত্রাসীরা এসএমজি, একে-৪৭সহ ভারী অস্ত্র এবং বিদেশি আধুনিক পিস্তল ব্যবহার করছে। পাহাড়ি সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে এসব অস্ত্র সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং অপরাধের পর অনেকেই পাহাড়ে আশ্রয় নিচ্ছে।
চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি নাজিমুল হক বলেন, ‘কোনো বড় ঘটনা ঘটার পর দ্রুত জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অস্ত্রসহ বহু অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে।’
পুলিশ জানায়, গত দুই বছরে ছোট সাজ্জাদ, ডেভিড ইমনসহ বহু শীর্ষ সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার হয়েছে। এ সময়ে এক হাজার ১০০টি দেশি-বিদেশি অস্ত্র, এক হাজার ৬০০টি রাইফেল এবং ১০ হাজার রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। র্যাবও বিপুল পরিমাণ অস্ত্র জব্দ করেছে। তবে কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসী এখনও পাহাড়ে আত্মগোপন করে বা বিদেশে অবস্থান করে অপরাধচক্র পরিচালনা করছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির শিথিলতার সুযোগে আন্ডারওয়ার্ল্ডের সন্ত্রাসীরা নতুন করে সক্রিয় হয়ে ওঠে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত অভিযান, দ্রুত বিচার এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত আইন প্রয়োগের ওপর জোর দিচ্ছেন তারা।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ বলেন, ‘বিদেশি অস্ত্র উদ্ধারে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। এসব অস্ত্র সীমান্ত দিয়ে আসার পাশাপাশি পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের কাছ থেকেও সংগ্রহ করা হয়ে থাকতে পারে।’
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের অভিযোগ, গ্রেপ্তার হওয়া অনেক অপরাধী আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে আবারও অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এ বিষয়ে আইনজীবীরা রাজনৈতিক প্রভাবকে অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি) রায়হানুল ওয়াজেদ চৌধুরী বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও কঠোরভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়—এ বার্তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।’





