কয়েক বছর আগে সুন্দরবনের কটকা এলাকা থেকে অপহৃত হন ইব্রহিম হাওলাদার। সেই সময় মুক্তিপণ দিয়ে ফিরে এলেও এখনো কাটেনি সেই দুঃসহ স্মৃতি। শিকলবন্দি অবস্থায় অমানবিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে তাদের।
অপহরণের শিকার জেলে ইব্রহিম হাওলাদার বলেন, ‘সেই সময় জলদস্যুরা আমাদের ১২ জনকে অপহরণ করে গভীর সুন্দরবনে নিয়ে যায়। সেখানে তাদের আস্তানায় আমাদের নিয়ে আটকে রাখা হয়। গাছের সঙ্গে তাদের এক একটি টং ঘর তৈরি করে রাখা হয়েছে। আমরা সেখানে গিয়ে দেখি আমাদের মত আরও অনেক জেলেরা সেখানে বন্দি রয়েছেন। আমাদের প্রত্যেককে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়। পরিবারের সদস্যদের ফোন দিয়ে মুক্তিপণ চাওয়া হলে যাদের মুক্তিপণ দিতে দেরি হয় তাদের উপর চালানো হয় অমানসিক নির্যাতন।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক জেলে বলেন, ‘র্যাব ও পুলিশের কাছে যেসব অস্ত্র আছে, সেসব অস্ত্র জলদস্যুদের কাছেও আছে। অনেক জেলেদের পরিবার মুক্তিপণ দিতে না পারলে তাদের সেখানেই গুলি করে মেরে ফেলা হয়।’
গভীর সাগর ছাড়িয়ে দস্যুদের থাবা এখন উপকূলের কাছেও। এর আগে, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি পদ্মা স্লুইস এলাকা থেকে ট্রলারসহ নিখোঁজ হয় কিশোর মিরাজুল। ছিনতাই করা হয় আস্ত একটি ট্রলার। এরপর ২২ ফেব্রুয়ারি নারিকেলবাড়িয়ায় জলদস্যুদের গুলিতে আহত হন দুই জেলে। এমন লাগাতার হামলায় চরম নিরাপত্তাহীনতায় হাজারো জেলে পরিবার, থমকে গেছে অনেকের জীবিকাও।
দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এ মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে থাকা কয়েকজন জেলে জানান, এই ঘাট থেকে প্রতিদিন দেড়শ থেকে ২০০ ট্রলার সমুদ্রে মাছ শিকারে যায়। কিন্তু জলদস্যু আতঙ্কে অনেকেই এখন সমুদ্রে মাছ শিকারি যান না। সামনে ঈদ, এ অবস্থায় মাছ শিকারে যেতে না পারলে জেলে পরিবারের কারোরই ঈদ হবে না। ট্রলার মালিকরাও জেলেদের সমুদ্রে পাঠাতে ভয় পাচ্ছেন। একেকজন ছেলেকে অপহরণ করে ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত মুক্তিপণ দাবি করে দস্যুরা।
এদিকে দস্যু আতঙ্কে সাগরে মাছ ধরা প্রায় বন্ধ হয়ে আসায় দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম পাথরঘাটা মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে এখন সুনসান নীরবতা। ট্রলারগুলো ঘাটে অলস বসে থাকায় কমেছে মাছের সরবরাহ, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সরকারের রাজস্ব আদায়ে।
গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ মৎস্য ঘাট থেকে রাজস্ব আদায় হয়েছে ১ কোটি ৮৩ লাখ ২৯ হাজার ২৩০ টাকা। আর ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আদায় হয়েছে ১ কোটি ৪৪ লাখ ৩১ হাজার ১৭৩ টাকা, যা গত অর্থ বছরের তুলনায় ৩৮ লাখ ৯৮ হাজার ৫৭ টাকা কম। রূপালী ইলিশের সেই চিরচেনা কর্মচাঞ্চল্য হারিয়ে মৎস্য বন্দরে এখন কেবলই স্থবিরতা।
আরও পড়ুন:
এ মৎস অবতরণ কেন্দ্রের কয়েকজন ব্যবসায়ী বলেন, বিগত কয়েক বছর সমুদ্রে নির্ভয়ে জেলেরা মাছ শিকার করেছে। কিন্তু এ দস্যু আতঙ্কে সামুদ্রিক মাছ আহরণ অর্ধেকে নেমে এসেছে। বর্তমানে আমাদের ব্যবসা টিকিয়ে রাখা অনেক কঠিন হয়ে পড়েছে। এখানের বেশিরভাগ ব্যবসায়ীরা ঋণ নিয়ে ব্যবসা করেন। কিন্তু এ অবস্থা চলতে থাকলে আমাদের ঋণ পরিশোধ করাও অসম্ভব হয়ে পড়বে।
এ বিষয়ে পাথরঘাটা মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক লেফটেন্যান্ট কমান্ডার জিএম মাসুদ শিকদার বলেন, ‘এমনিতেই সমুদ্রে এখন মাছ ধরা পড়ছে কম। এর মধ্যে দস্যু আতঙ্কে অনেক জেলেরাই মাছ শিকারে যাচ্ছে না ফলে এর প্রভাব পড়েছে এই ঘাটে। আশা করছি খুব শিগগিরই দেশের দ্বিতীয় এ মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে মাছের সরবরাহ বাড়বে। পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব আহরণও বাড়বে।’
অন্যদিকে জলদস্যুদের হামলা ও অপহরণ থেকে রক্ষা পেতে পাথরঘাটায় মানববন্ধন করেছে জেলে ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর হলে এ দস্যুবাহিনী নির্মুল সম্ভব জানিয়ে জেলা ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি শিথিল হওয়ার সুযোগেই দস্যুরা আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। তারা তৎপর হলে দস্যু দমন করা সম্ভব। দস্যুরা জেলেদের অপহরণ করে যে মুক্তিপণ আদায় করে সেটি মোবাইল ব্যাংকিং অথবা সরাসরি। ফলে এই দস্যুদের ধরা অনেকটাই সহজ।’
তিনি বলেন, ‘সমুদ্রে জলদস্যু থাকলে আমাদের এ পেশা ছেড়ে চলে যেতে হবে। একজন জেলে মুক্ত করতে পাঁচ থেকে সাত লাখ টাকা মুক্তিপণ দিতে হয়। যা জেলেদের পক্ষে দেয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। বাধ্য হয়ে সেই মুক্তিপণের অর্থ দিতে হয় ট্রলার মালিকদের।’
এদিকে জলদস্যু ইস্যুতে ক্যামেরার সামনে আসতে রাজি নয় পাথরঘাটা কোস্টগার্ড সদস্যরা। জলদস্যু দমনে কোস্টগার্ডের ভূমিকা সম্পর্কে জানতে গেলে সাংবাদিকদের ক্যাম্পে প্রবেশেও বাধা দেন তারা।
পাথরঘাটার উপকূলীয় অর্থনীতির প্রাণ এই মৎস্য খাত। কিন্তু জলদস্যুদের দৌরাত্ম্যে সেই প্রাণপ্রবাহ এখন হুমকির মুখে। জেলেদের দাবি, আবারও সেই চিরুনি অভিযান চালিয়ে দস্যুমুক্ত করা হোক বঙ্গোপসাগর।





