চোখের সামনে জল ও মাটির আদিম যুদ্ধ দেখতে দেখতে বৃদ্ধা সানোয়ারা বেগমের চুলে এখন পদ্মার ভাঙনের মতোই সাদা ফেনা। বিয়ের পর থেকে আজ অবধি মোট নয় নয় বার নদী তাঁর উঠোন গিলে খেয়েছে।
বৃদ্ধা সানোয়ারা বেগম বলেন, ‘এখন তো একে বাড়ে বুড়া হয়ে গিয়েছি। আর কেনার মতো টাকাও নাই। যে কিনে অন্য কোথাও যাবো।’
নদীর ঠিক বুক ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে উত্তম হালদারের জীর্ণ বসতভিটা। বিগত চার-চারটি বছর ধরে তিনি কোনো মানুষের সঙ্গে নয়, লড়াই করছেন এক অবাধ্য প্রকৃতির সঙ্গে। যিনি চান না কচুরিপানার মতো ভাসতে।
উত্তম হালদার বলেন, ‘যখন বর্ষা আসে তখন মনের ভিতরে ভয়ভীতি কাজ করে। এই বুঝি নদীর গর্ভে বিলীন হয়ে গেলো বাড়ি। সরকার যদি স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করতো তাহলে আমাদের ভাগ্য পরিবর্তন হতো।’
আরও পড়ুন
ঝুঁকিতে শুধু উত্তমের একা ঘর নয়, নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার অপেক্ষায় কাঁপছে গোটা গ্রাম, এক একটি চেনা স্বপ্ন মুহূর্তেই চুরমার হচ্ছে।
নদী শুধু জল নয়। নদী মানুষের কপাল। কপাল যখন ফেরে নদী তখন হাসে। কপাল যখন পোরে নদী তখন সব গ্রাস করে। কথাগুলো কথা সাহিত্যিক তারাসঙ্করের। আর এর বাস্তাব চিত্র দেখতে হলে যেতে হবে না বেশি দূর। নদীর পাড়ে গেলেই দেখা যাবে এর বাস্তব চিত্র।
নদীভাঙ্গনের মত অতিবৃষ্টি, অসময়ে খরা, লবণাক্ততার মত দুর্যোগের কবলে থাকা এই মানুষগুলোর আর্তনাদ যেন জলবায়ু পরিবর্তনের করাল গ্রাসে এক মানচিত্রের সমবেত কান্নার সুর। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, কিংবা কুড়িগ্রামের চরাঞ্চল থেকে সাতক্ষীরার উপকূল, নির্মম! প্রকৃতির এ খামখেয়ালি।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ২০৫০ সালের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়বে ২৭ সেমি। বাংলাদেশ হারাবে ১৭ শতাংশ ভূখণ্ড এবং ৩০ শতাংশ খাদ্য উৎপাদন। এতে কৃষি খাতের জিডিপির এক-তৃতীয়াংশ বিলীন হওয়ার শঙ্কা আছে।
প্রকৃতির সেই রুদ্র রূপ, তার সীমানা ছাড়িয়েছে। রাজধানীর ধমনীতে যার বিষাক্ত নিঃশ্বাস- উষ্ণায়ন, দূষণ আর প্রকৃতির প্রতি অবজ্ঞার এক জটিল সংমিশ্রণ। কংক্রিটের এ অরণ্য রূপ নিয়েছে আরবান হিট আইল্যান্ডে। বদ্বীপের এ নিষ্পাপ বুক পুড়ছে যে জলবায়ুর করাল গ্রাসে, সেখানে কতটা আলো হয়ে আসবে এবারের বাজেট?
আরও পড়ুন
প্রতিবছর সরকার মোট বাজেটের প্রায় ১০ শতাংশ জলবায়ু বাজেট হিসেবে বরাদ্দ রাখে, যা ভাগ করে দেয়া হয় জলবায়ু সংকটের সঙ্গে লড়তে থাকা ২৫টি মন্ত্রণালয়কে।
সবশেষ অর্থ -বছরে জলবায়ু বাজেটের আকার ছিলো ৪১ হাজার ২০৮ দশমিক ৯৭ কোটি টাকা। এ বছরে সম্ভাব্য বাজেটের আকার ৯ দশমিক ৩৮ লাখ কোটি টাকা। সেক্ষেত্রে জলবায়ু বাজেটের আকার দাঁড়াতে পারে ৯৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা।
প্রশ্নটা আসলে খুব সাদামাটা- জলবায়ু পরিবর্তনের এ যে এত বড় ধাক্কা, তা কি কেবল মোট বাজেটের ১০ শতাংশ বরাদ্দ দিয়ে সামাল দেয়া সম্ভব? চারদিকে যখন শুধু ভাঙন আর চাতকের মতো চেয়ে থাকা মানুষের ছবি, তখন আমাদের এ বাৎসরিক পরিকল্পনাগুলো আসলেই কতটা টেকসই? বুক পেতে এ বিশাল দুর্যোগ সামলানোর মতো শক্তি আর সাধ্য আমাদের কতটুকুই বা আছে?
পরিবেশ ও পানিসম্পদ বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তন টা ঠিক মতো অ্যাকশনে রুপান্তর করতে হবে। এ জন্য বাজেটে নীতিগত জায়গা থেকে বরাদ্দ থাকা দরকার।’
লেখক, গবেষক ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ গওহার নঈম ওয়ারা বলেন, যারা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তাদের জন্য আলোচনা করে বরাদ্দের টাকা টা খরচ করা দরকার। আর প্রত্যেকটি বাজেটে জলবায়ু পরিবর্তনের কথা চিন্তা করে বাজেট নির্ধারণ করা উচিত।’
আরও পড়ুন
বিগত কয়েক বছরের জলবায়ু বাজেটে বরাদ্দের সিংহভাগই খরচ হয়ে গেছে আকস্মিক ও জরুরি প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায়। যা অবকাঠামোর ক্ষেত্রেই ব্যবহার হয়। অথচ এ জলবায়ুর প্রভাবে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, সামাজিক সুরক্ষা, স্বাস্থ্য হুমকির মুখে।
গবেষক ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ গওহার নঈম ওয়ারা বলেন, ‘আমাদের উপকূলে পানির কষ্ট আছে। কারণ আমরা নদীগুলোয় বাঁধ দিয়ে দিয়েছি তাই মিষ্টি পানি আর সুন্দরবন অব্দি পৌঁছায় না।’
পানিসম্পদ বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত বলেন, ‘কিছু দিন পর স্থানীয় নির্বাচন হবে। যারা নির্বাচন করবে তাদের এই জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা থাকা উচিত।’
বছরের এ নির্দিষ্ট জুন মাসে ঢাকার খেরোখাতায় যে বরাদ্দের প্রদীপ জ্বলে, তা যেন কেবলই এক বাৎসরিক আনুষ্ঠানিকতার মরীচিকা না হয়, এমনটিই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।


