হিমবাহ ধসের ইতিহাস
কাঠমান্ডু থেকে ৪৫ কিলোমিটার উত্তরে ৭ হাজার ২৪৫ মিটার (প্রায় ২৪ হাজার ফুট) উঁচু লাংটাং লিরুং পর্বতের রয়েছে ভয়াবহ ইতিহাস। ২০১৫ সালের ২৫ এপ্রিল ৭ দশমিক ৮ মাত্রার ভূমিকম্পে দক্ষিণ ঢালে তুষারধসে লাংটাং গ্রাম বরফ ও ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে। ওই ঘটনায় অন্তত ৩০০ জন নিহত হন। এবার ঘটলো উত্তর ঢালে।
গতকাল (বুধবার, ২৬ আগস্ট) সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে সীমান্তের কাছে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্প হয়। ঠিক তখনই উত্তর ঢালে বিশাল তুষারধস ঘটে। ধসে নেমে আসা বিপুল ধ্বংসস্তূপ লেন্দে খোলা নদীর গতিপথ আটকে দেয়। সেখানে হ্রদের মতো জলাধার তৈরি হয়। কিছুক্ষণ পর সেই পানি বেরিয়ে কাদা ও পাথরের দেয়ালের মতো স্রোত তৈরি করে, যা ত্রিশূলী নদী দিয়ে নেপালের ভেতরে প্রবাহিত হয়। স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে প্ল্যানেট ল্যাবসের বিশেষজ্ঞরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন।
বিজ্ঞানীদের মধ্যে মতভেদ
ভূমিকম্পই উত্তর ঢালের ধস ঘটিয়েছে, নাকি ধসটি এতটাই বিশাল ছিল যে সেটিই ভূকম্পনের মতো কম্পন সৃষ্টি করেছে এ নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) প্রাথমিকভাবে ৪.৪ মাত্রার ভূমিকম্পের খবর দিলেও পরে তাদের মূল্যায়ন সংশোধন করে জানায়, সিসমিক সংকেতটি আসলে হিমবাহ ধসের কারণে সৃষ্ট কম্পন।
ক্যালগারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-আকৃতিবিদ অধ্যাপক ড্যানিয়েল শুগার বলেন, প্রায় ০.২ বর্গকিলোমিটার বরফ ভেঙে ১ হাজার ২০০ মিটার নিচে পড়েছে, যা ৫.২ মাত্রার কম্পন সৃষ্টি করেছে।
গত বছর সতর্কতা পেলেও এবার পায়নি
গত বছর ৮ জুলাই ভোতে কোসি নদীর বন্যায় ১৮ জন নিহত হয়েছিলেন। তখন চীনা পক্ষ নেপালের স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করেছিল। কিন্তু এবার কোনো সতর্কতা ছিল না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হিমবাহ ধস ও বন্যার উৎপত্তি সীমান্তের এত কাছাকাছি ছিল যে ধ্বংসস্তূপ রাসুয়া চেকপয়েন্টে পৌঁছাতে সময় লেগেছিল মাত্র কয়েক মিনিট।
দ্বিতীয় ও তৃতীয় ঢেউয়ের আশঙ্কা
নেপালের ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক বসন্ত রাজ অধিকারী বিবিসিকে জানিয়েছেন, আজ বা আগামীকাল দ্বিতীয় ও তৃতীয় ঢেউ আঘাত হানতে পারে। তিনি বলেন, ‘পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি। চীনে থাকা সহকর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করছি। সেখানে বেশি বৃষ্টি হচ্ছে না, তবে নতুন করে ভূমিধস হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’
অধিকারী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন এখানে বাস্তবেই ঘটছে। ‘আমরা পর্যবেক্ষণ করছি, কিন্তু জানতাম না যে নির্দিষ্ট কোনো দিনে এমন ঘটনা ঘটবে।’
হিমালয়ান সুনামির ক্রমবর্ধমান ধারা
হিমালয়ে সাম্প্রতিক সময়ে ‘হিমালয়ান সুনামি’ দেখা গেছে, যেখানে হিমবাহ, বরফ, পানি, ভূমিধস ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব একসঙ্গে কাজ করেছে:
২০২১: চামোলি (ভারত)
২০২১: মেলামচি (নেপাল)
২০২৩: সিকিম (ভারত)
২০২৪: থামে (নেপাল)
২০২৫: ভোতে কোসি (নেপাল-চীন)
২০২৬: লাংটাং লিরুং (নেপাল-চীন)
প্রায় সবকটিই ঘটেছে বর্ষা মৌসুমে।
অর্থনৈতিক ক্ষতি বিলিয়ন ডলারের
এই দুর্যোগ নেপালের জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অর্থনৈতিক ক্ষতি (লস অ্যান্ড ড্যামেজ) বিষয়টি আন্তর্জাতিক আলোচনায় তুলে ধরবে। কয়েক মিনিটের মধ্যে ভোতে কোসি ও ত্রিশূলীর উপর কমপক্ষে ৬টি বড় জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, ট্রান্সমিশন লাইন ও বৈদ্যুতিক সাবস্টেশন ধ্বংস বা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নুয়াকোটের ২৫ মেগাওয়াট সোলার প্ল্যান্ট কাদায় চাপা পড়েছে। কমপক্ষে এক ডজন সেতু ভেসে গেছে, যা উত্তরের মহাসড়ক বিচ্ছিন্ন করেছে।
নতুন সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ
গত বছর সেপ্টেম্বরের আন্দোলনের পর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বালেন্দ্র শাহের দল বিপুল ভোটে জয়লাভ করে। তাঁর সরকার ক্ষমতায় এসেছে মাত্র ৬ মাস। এখন এই সরকারের সামনে তাৎক্ষণিক উদ্ধার ও পুনর্বাসনের চ্যালেঞ্জ। দীর্ঘমেয়াদে ভূমিকম্প ও জলবায়ুজনিত দুর্যোগ মোকাবিলায় নেপালকে কার্যকর কৌশল তৈরি করতে হবে, যা ভবিষ্যতে আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।





