অর্থনৈতিক ডি-ডে
গত সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট ঘোষণা করেন। তিনি একে ইরানের বিরুদ্ধে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আর্থিক অভিযান হিসেবে বর্ণনা করেন। এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় ইরানের অবশিষ্ট পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক খাতকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে—ডিজিটাল সম্পদ, প্রযুক্তি, স্বর্ণ, বিমান চলাচল ও জাহাজ শিল্প।
বেসেন্ট সাংবাদিকদের বলেন, ‘মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতার বাইরে কেউ নয়।’ তিনি হুঁশিয়ারি দেন যে ইরানের সঙ্গে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠানগুলোকেও নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে হবে। এর অংশ হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাত, হংকং, চীন, সিঙ্গাপুর ও সুইজারল্যান্ডের ৬০টি প্রতিষ্ঠান, জাহাজ ও ব্যক্তির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর দ্বিধা
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে উপসাগরীয় দেশগুলো বারবার মার্কিন-ইরানি সংঘাতের মাঝখানে পড়েছে। ইরান প্রতিবেশী দেশগুলোতে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও অবকাঠামোতে হামলা চালিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক চাপ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার চেয়ে ভালো বিকল্প মনে হতে পারে। তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন যে এই কৌশলের নিজস্ব ঝুঁকি রয়েছে।
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সেক্রেটারি মোহসেন রেজায়ি গত সপ্তাহে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইরানের আশপাশের কোনো দেশ যদি মার্কিন অর্থনৈতিক যুদ্ধে যোগ দেয়, তাহলে পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালি দিয়ে এক ফোঁটা তেলও বের হতে দেয়া হবে না। শান্তিকালে বিশ্বের মোট তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে যাতায়াত করে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান কার্যত এই প্রণালি বন্ধ করে রেখেছে।
এই পরিস্থিতি ওয়াশিংটনের উপসাগরীয় মিত্রদের এক অস্বস্তিকর দ্বন্দ্বে ফেলেছে। একদিকে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি তাদের ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন থেকে রক্ষা করে, অন্যদিকে এই উপস্থিতিই তাদের ভূখণ্ডকে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের কঠোর পদক্ষেপ
উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত সবচেয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। গত সপ্তাহে আবুধাবি ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দেয়। ইসরাইলপন্থি থিংক ট্যাংক ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিজের ইরান বিশ্লেষক মিয়াদ মালেকির মতে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের এই পদক্ষেপ ইরানের জন্য এই যুদ্ধের সবচেয়ে ক্ষতিকর অর্থনৈতিক পদক্ষেপ হতে পারে—এমনকি মার্কিন নিষেধাজ্ঞার চেয়েও বেশি প্রভাবশালী।
এর কারণ হলো, দীর্ঘদিন ধরে দুবাই ইরানের বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। এমনকি যুদ্ধের সময়েও সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানের সবচেয়ে বড় আমদানি উৎস ছিল।
ল্যাঙ্কাস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক সাইমন ম্যাবন বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতের এই অবস্থানের পেছনে দুটি কারণ রয়েছে—যুদ্ধের সময় ইরানি হামলায় তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ওয়াশিংটন ও ইসরাইলের সঙ্গে তাদের নিরাপত্তা সম্পর্ক ক্রমেই গভীর হচ্ছে। তবে তিনি মনে করেন, সৌদি আরব, কাতার বা ওমান সংযুক্ত আরব আমিরাতের পথ অনুসরণ করবে না।
কাতার ও ওমানের ভিন্ন হিসাব
কাতারের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় এবং কাতারের এলএনজি স্থাপনায় ইরানি হামলার কারণে দোহার অর্থনীতি ইতিমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তেলের কিছু চালান বিকল্প পথে পাঠানো সম্ভব হলেও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস ও পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য বিকল্প পথে পাঠানো অনেক কঠিন। এ ছাড়া কাতার ইরানের সঙ্গে একটি বিশাল গ্যাসক্ষেত্র ভাগ করে নেয় এবং মধ্যস্থতা প্রচেষ্টায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছে। ফলে তেহরানের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখা দোহার জন্য অপরিহার্য।
ওমানের অবস্থানও ভিন্ন। দীর্ঘদিন ধরে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে আসছে মাস্কাট। এই ভূমিকা বজায় রাখতে দুই পক্ষের সঙ্গেই কূটনৈতিক যোগাযোগ অক্ষুণ্ণ রাখা জরুরি। বর্তমানে হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা নিয়ে ওমান ইরানের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করছে।
সৌদি আরবের কৌশলগত দূরত্ব
সৌদি আরব সাম্প্রতিক মধ্যস্থতা প্রচেষ্টা থেকে দূরে রয়েছে এবং ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর ব্যাপারেও তাদের আগ্রহ কম দেখা যাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এক দশক আগে রিয়াদ ওয়াশিংটনের পথে হাঁটত। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলেছে।
সৌদি আরব ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতিকে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পূর্বশর্ত হিসেবে রেখেছে, যা ইসরাইল মানতে রাজি নয়। এ ছাড়া রিয়াদ যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নিরাপত্তা নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করছে। সেই লক্ষ্যেই চলতি মাসের শুরুতে পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করেছে সৌদি আরব।
২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের পর সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান তেহরানের প্রতি আরও বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছেন। বিশ্লেষকরা মনে করেন, রিয়াদ একটি দুর্বল ইরান চাইলেও ইরানি সরকারের পতনের ফলে যে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে, তা তারা চায় না। ওয়াশিংটনের অর্থনৈতিক অভিযানে যোগ দিলে ইরান বা হুথিদের হামলার ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে—বিশেষ করে লোহিত সাগরে সৌদি-সংশ্লিষ্ট জাহাজে হুথি হামলা ইতিমধ্যে চলছে।
ইরানের প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে
বিশ্লেষকদের মতে, অতিরিক্ত অর্থনৈতিক চাপ ওয়াশিংটনের কাঙ্ক্ষিত ফলাফল নাও দিতে পারে। কুইন্সি ইনস্টিটিউটের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ত্রিতা পার্সি বলেন, ‘এ পর্যন্ত আমরা যে ধরন দেখেছি তা হলো—আত্মসমর্পণ নাকি উত্তেজনা বৃদ্ধি, এই দুটি বিকল্পের মুখে পড়লে ইরান সব সময় উত্তেজনা বৃদ্ধির পথ বেছে নেয়।’
পার্সির মতে, নিষেধাজ্ঞা যদি ইরানের অর্থনীতিকে সত্যিই বিপর্যস্ত করে, তাহলে তেহরানের পক্ষ থেকে সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধিই সবচেয়ে সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া হবে। ইরানের হাতে এখনো শক্তিশালী সামরিক বিকল্প রয়েছে।
ওয়াশিংটনের হিসাব
তবে ওয়াশিংটন মনে করছে, অর্থনৈতিক ভারসাম্য তাদের পক্ষে রয়েছে। ত্রিতা পার্সি জানান, ওমানের মাধ্যমে বিকল্প নৌপথ ব্যবহার এবং উপসাগরীয় তেলের ওপর নির্ভরতা কমানোর ফলে হরমুজ প্রণালি বন্ধের প্রভাব কিছুটা কমেছে। অন্যদিকে মার্কিন নৌ-অবরোধ ইরানের তেল বিক্রির সক্ষমতা ব্যাপকভাবে কমিয়ে দিয়েছে।
পার্সি বলেন, ‘ওয়াশিংটনের দৃষ্টিতে বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে বেশি চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।’ এই হিসাব থেকেই ট্রাম্প বিশ্বাস করেন, তিনি তেহরানকে অপেক্ষা করিয়ে পরাস্ত করতে পারবেন এবং যুদ্ধ শুরুর পর এই প্রথম সময় আমেরিকার পক্ষে কাজ করছে।
তবে এই কৌশলের সাফল্য নির্ভর করবে চীন, ভারত ও রাশিয়ার মতো বড় অর্থনীতিগুলো ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য চালিয়ে গেলে ওয়াশিংটন তাদের ওপর বাস্তবে কঠোর শাস্তি আরোপ করতে প্রস্তুত কি না, তার ওপর।
উপসাগরীয় দেশগুলো এখনো সংলাপ ও কূটনীতির পথেই জোর দিচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, কঠোর নিষেধাজ্ঞা বা নতুন করে সামরিক উত্তেজনা—কোনোটিই ইরানের পক্ষ থেকে আরও অস্থিরতা ছাড়া কিছু বয়ে আনবে না।
—আল জাজিরার প্রতিবেদনে অবলম্বনে





